নিজস্ব প্রতিবেদক
বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের সব স্পিনিং মিল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে সব স্পিনিং মিল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মিল মালিকরা। তারা জানিয়েছেন, পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ কার্যকর না হলে এই কঠোর কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধ্য হবেন তারা।
গতকাল রাজধানীতে বিটিএমএ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। এতে সংগঠনের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় মিল মালিকরা বলেন, দেশীয় স্পিনিং শিল্প দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যমূলক নীতি, অবাধ সুতা আমদানি এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের কারণে চরম সঙ্কটে রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের যে সুপারিশ করেছে, সেটি বাস্তবায়নই এখন শিল্প বাঁচানোর একমাত্র পথ। অথচ সুপারিশ দেয়ার পরও তা কার্যকর না হওয়ায় শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। তারা জানান, সুপারিশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে, আরো বহু মিল উৎপাদন সীমিত করে পরিচালিত হচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সব স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে কয়েক লাখ শ্রমিকের জীবনে।
মিল মালিকরা স্পষ্ট করে বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে যদি শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়, তাহলে তার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। কারণ বারবার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্ত্বেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় শিল্প আজ এই সঙ্কটের মুখে পড়েছে। শ্রমিকদের বেতন, ভাতা ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উদ্যোক্তাদের পক্ষে আর সম্ভব হবে না বলেও তারা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, স্পিনিং শিল্প বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব শুধু টেক্সটাইল খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর যে ঋণ ও দায়-দেনা রয়েছে, তা ভবিষ্যতে আর পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। এতে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তার সম্পূর্ণ দায়ও সরকারকেই নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন মিল মালিকরা।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “সম্প্রতি ক্রিকেট খেলা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের মধ্যে যে দেশপ্রেমের প্রকাশ আমরা দেখেছি, দেশীয় টেক্সটাইল শিল্প রক্ষায় তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলনও দেখতে পাচ্ছি না। বিষয়টি আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।” তিনি বলেন, দেশীয় শিল্প ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকলেও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, এই পরিস্থিতির পেছনে অন্য কোনো বৃহৎ ষড়যন্ত্র কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ পরিকল্পিতভাবে যদি দেশীয় স্পিনিং শিল্প দুর্বল করা হয়, তাহলে তার সুবিধা পাবে বিদেশী সুতা সরবরাহকারীরা। বিষয়টি জাতীয় স্বার্থের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত উল্লেখ করে তিনি সরকারের প্রতি অবিলম্বে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, দেশীয় স্পিনিং শিল্প তৈরি পোশাক খাতের মেরুদণ্ড। এই শিল্প ধ্বংস হয়ে গেলে কাঁচামালের জন্য পোশাক খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।
বিটিএমএ নেতারা সরকারের উদ্দেশে বলেন, সময় খুবই সীমিত। পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে শিল্প রক্ষার স্বার্থে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন তারা। একই সাথে তারা দেশীয় টেক্সটাইল শিল্প রক্ষায় নীতিগত সমর্থন ও দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে সংগঠনের নেতারা বলেন, এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে নয়; এটি দেশের শিল্প, শ্রমিক এবং সামগ্রিক অর্থনীতির স্বার্থে। সরকার যদি সময়মতো উদ্যোগ না নেয়, তাহলে তার দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ থাকবে না বলেও তারা সতর্ক করে দেন।



