হাসিনা আমলের মতো দলীয় প্রভাব ইসলামী ব্যাংকে আর হবে না

মতবিনিময়ে গভর্নর

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের আলোচিত প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ (আইবিবিএল) ঘিরে অতীতের বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সরকারের আমলে ইসলামী ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর প্রতি অনুগত হয়ে পড়েছিল। তবে এখন থেকে ব্যাংকটি কোনো দল, গোষ্ঠী বা পরিবারের স্বার্থে পরিচালিত হবে না বলে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের আলোচিত প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ (আইবিবিএল) ঘিরে অতীতের বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সরকারের আমলে ইসলামী ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর প্রতি অনুগত হয়ে পড়েছিল। তবে এখন থেকে ব্যাংকটি কোনো দল, গোষ্ঠী বা পরিবারের স্বার্থে পরিচালিত হবে না বলে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, চারজন বোর্ড সদস্য এবং ব্যাংকের শীর্ষ ১০ কর্মকর্তার সাথে মতবিনিময়কালে গভর্নর এসব কথা বলেন। বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

অতীতের সুশাসনের ঘাটতির কথা উল্লেখ : বৈঠকে গভর্নর বলেন, এক সময় ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম শক্তিশালী ও সুশাসিত ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে মাঝখানে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের গুরুতর ঘাটতি তৈরি হয়, যার কারণে ব্যাংকটির ভাবমূর্তি ও আর্থিক অবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংককে আবার একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ধরনের সহযোগিতা দেবে। তবে কোনোভাবেই এটি আর কোনো গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে যেতে দেয়া হবে না।’ গভর্নর আরো বলেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখবে।

চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন

সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কয়েক হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ চট্টগ্রামের একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে নিয়োগ পেয়েছিলেন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে তৎকালীন ব্যাংকের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের বন্দুকের নল বুকে ঠেকিয়ে ব্যাংকটি দখল করেছিল এস আলম। এর পর থেকেই পানির মতো নিয়মবহির্ভূতভাবে ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুসারে এস আলম নামে বেনামে ইসলামী ব্যাংক থেকে এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা বের করে নেয়, যা আজও ফেরত দেয়া হয়নি। একই সাথে তার এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে কয়েক হাজার ব্যক্তিকে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শুধু টাকা লুট ও জনবলই নিয়োগ দেয়া হয়নি, এস আলম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে বিদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে, যাতে লুটের টাকা ফেরত দেয়া না লাগে। এ বিষয়ে গভর্নরের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং বিষয়টি আইন ও নীতিমালার আলোকে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

এস আলম গ্রুপের ঋণ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দুদকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এস আলম শিল্পগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আটটি ব্যাংকের মধ্যে চারটি ব্যাংক থেকে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্য মতে, এসব ঋণের একটি বড় অংশ ভুয়া বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ইসলামী ব্যাংক থেকেই নেয়া হয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদ ও তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলো থেকে প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের নামে অথবা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে। এসব ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, নানা বিতর্ক ও সঙ্কটের মধ্যেও গত এক বছরে ইসলামী ব্যাংকের বেশ কিছু সূচকে উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ব্যাংকটির মোট আমানত দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। শুধু গত বছরেই আমানত বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এজেন্ট ব্যাংকিং খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে এই খাতে আমানতের পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বেশি। প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি বড় ভূমিকা রাখছে। গত এক বছরে ইসলামী ব্যাংক প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে। একই সময়ে ব্যাংকটির আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা এবং ৩২ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকের গ্রাহকসংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় তিন কোটি। এর মধ্যে গত এক বছরেই নতুন করে যুক্ত হয়েছেন প্রায় ৫০ লাখ গ্রাহক।

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের বিতর্ক, বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে ইসলামী ব্যাংক বড় সঙ্কটে পড়েছিল। তবে শক্তিশালী তদারকি, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং স্বচ্ছতা বাড়াতে পারলে ব্যাংকটি আবারো দেশের ব্যাংকিং খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।