গুম অধ্যাদেশ বাতিল ও আইনি সঙ্কট : ৩ বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ

‘গুম অধ্যাদেশ’ আসলে প্রয়োজনীয় ছিল না : চিফ প্রসিকিউটর

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গুমের অভিযোগ বিচারের যথেষ্ট এখতিয়ার আগে থেকেই ছিল। সেখানে আরেকটি আলাদা আইন করে বা আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করার প্রয়োজনীয়তা ছিল বলে আমার মনে হয়নি। বরং মূল ট্রাইব্যুনাল আইনের সাথে এটি যুক্ত হওয়ায় বিচারিক প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ ও শক্তিশালী হবে। এখন বিষয়টি স্থায়ী আইনি কাঠামো পেল, যা ন্যায়বিচারের পথ প্রশস্ত করবে।

আলমগীর কবির
Printed Edition
চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম
চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংগঠিত গুমের ঘটনাবলি তদন্ত ও প্রতিকারের লক্ষ্যে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক জারি করা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বাতিল করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনীর মাধ্যমেই গুমের বিচার সম্ভব, তাই পৃথক অধ্যাদেশের প্রয়োজন নেই। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে এবং আইনি মহলে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অধ্যাদেশটি কি সত্যিই অপ্রয়োজনীয় ছিল, নাকি এর বাতিলের ফলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলো নতুন কোনো আইনি অনিশ্চয়তায় পড়ল? এই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেদের আইনি বিশ্লেষণ ও ভিন্নধর্মী মতামত তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম এবং সুপ্রিম কোর্টের দুই বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া ও শিশির মনির। নিচে তাদের বিস্তারিত সাক্ষাৎকারগুলো তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন : মঙ্গলবার (গতকাল) জাতীয় সংসদে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস (সংশোধন) বিল-২০২৬’ পাস হয়েছে। সেখানে গুমের বিষয়টি ট্রাইব্যুনাল আইনের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

মো: আমিনুল ইসলাম : আমি এখনো আইনের চূড়ান্ত কপির বিস্তারিত দেখিনি, তবে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় গুমের অংশটি ট্রাইব্যুনাল আইনের সাথে একীভূত করা হয়েছে-এটি অত্যন্ত ইতিবাচক। আইনমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, এর মাধ্যমে গুমের বিচার করার ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি প্রমাণিত হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আলাদা একটি ‘গুম অধ্যাদেশ’ আসলে অপ্রয়োজনীয় ছিল। কারণ, গুমের অপরাধগুলো আমাদের বিদ্যমান ট্রাইব্যুনাল আইনেই আগে থেকে সংবিধিবদ্ধ ছিল। আলাদা ট্রাইব্যুনাল না করে মূল আইনের সংশোধনী এনে একে একীভূত করাটা সঠিক, যৌক্তিক ও যথার্থ হয়েছে। এ জন্য আমি মাননীয় আইনমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

প্রশ্ন : আপনি গুম অধ্যাদেশকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলছেন কেন?

মো: আমিনুল ইসলাম : দেখুন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গুমের অভিযোগ বিচারের যথেষ্ট এখতিয়ার আগে থেকেই ছিল। সেখানে আরেকটি আলাদা আইন করে বা আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করার প্রয়োজনীয়তা ছিল বলে আমার মনে হয়নি। বরং মূল ট্রাইব্যুনাল আইনের সাথে এটি যুক্ত হওয়ায় বিচারিক প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ ও শক্তিশালী হবে। এখন বিষয়টি স্থায়ী আইনি কাঠামো পেল, যা ন্যায়বিচারের পথ প্রশস্ত করবে।

প্রশ্ন : ‘মায়ের ডাক’-এর পক্ষ থেকে শতাধিক গুমের অভিযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এক বছরেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ উঠছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

মো: আমিনুল ইসলাম : বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ৭১টি আবেদন পেলেও ‘মায়ের ডাক’-এর দাবি অনুযায়ী অভিযোগের সংখ্যা ১০১টি। অর্থাৎ এখানে কমপক্ষে ১০১ জন ভিকটিম আছেন। এই বিপুল সংখ্যক অভিযোগের তদন্ত করা বেশ সময়সাপেক্ষ। কারণ, এই অপরাধগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সংঘটিত হয়েছে। এটি কোনো সহজসাধ্য ইনভেস্টিগেশন না; অনেক গোপন তথ্য আমাদের বের করে আনতে হচ্ছে। তবে হ্যাঁ, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, গত এক বছরে আরো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হওয়া প্রয়োজন ছিল। আমি প্রসিকিউশনে যোগ দেয়ার আগেই প্রত্যাশা করেছিলাম যে মায়ের ডাকের অভিযোগগুলো অগ্রাধিকার পাবে।

প্রশ্ন : ভিকটিম পরিবারগুলোকে কি আপনারা কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিতে পারছেন?

মো: আমিনুল ইসলাম : গতকালই (সোমবার) মায়ের ডাকের ভিকটিম পরিবারগুলো আমার সাথে দেখা করেছেন। আমি তাদের আশ্বস্ত করেছি যে, আমরা প্রতিটি ইনভেস্টিগেশন ইন্ডিভিজুয়ালি (ব্যক্তিগতভাবে) শুরু করেছি। দৃশ্যমান কার্যক্রম সোমবার থেকেই শুরু হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, আগামী এক মাসের মধ্যে আমরা একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে পারব।

প্রশ্ন : গুমের বিচারের জন্য কি আলাদা কোনো সেল বা বিশেষ তদন্ত কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে?

মো: আমিনুল ইসলাম : এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা এখন সমীচীন হবে না। আমাদের ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট ১৯৭৩ এবং রুলস অফ প্রসিডিউর অনুযায়ী অনেক বিষয় আমরা জনসমক্ষে বলতে পারি না। তদন্তের কিছু কৌশল গোপন রাখতে হয়, যাতে অপরাধীরা বা পারপেট্রেটররা আগেভাগে সতর্ক হয়ে তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে। তাই তদন্ত বা বিচারের স্বার্থে আমরা যা প্রকাশ করছি না, আশা করি আপনারা আমাদের ওপর আস্থা রাখবেন। যা প্রকাশযোগ্য, তা অবশ্যই সময়মতো জানানো হবে।

প্রশ্ন : সারা দেশে গুমের অভিযোগের যে সংখ্যা, তা সামলানোর মতো পর্যাপ্ত লোকবল বা লজিস্টিক সাপোর্ট কি আপনাদের আছে?

মো: আমিনুল ইসলাম : এটা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের এখতিয়ার এখন পুরো বাংলাদেশ। যদি সব অভিযোগ আমরা গ্রহণ করি, তবে মামলার সংখ্যা কয়েক হাজারে গিয়ে ঠেকতে পারে। বর্তমান লোকবল ও সেটআপ নিয়ে আমরা ইতোমধ্যেই প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছি। তদন্ত সংস্থাকে আমাদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করতে হচ্ছে। তবে এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি যাতে ভিকটিম পরিবারগুলো দ্রুত ন্যায়বিচার পায়।