দ্য গার্ডিয়ান
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের ভয়াবহতায় বিপন্ন হয়ে পড়েছে লাখ লাখ শিশুর জীবন। এক দিকে চলছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা এবং স্থল অভিযান; অন্য দিকে ইরান ও লেবাননজুড়ে দেখা দিয়েছে চরম মানবিক বিপর্যয়। শিশুদের স্কুলে হামলার মাধ্যমে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে ১২ বছর বয়সী শিশুদের সামরিক কাজে ব্যবহারের মতো ঘটনা এ অঞ্চলকে একটি চরম সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের মতে, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অংশে শুরু হওয়া এই সঙ্ঘাতের ফলে এ পর্যন্ত ৩৪০ জনেরও বেশি শিশু নিহত হয়েছে এবং কয়েক হাজার শিশু আহত হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানে একটি স্কুলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৬০ জন শিশু ও শিক্ষক নিহত হন, যা এই যুদ্ধের এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শোকাবহ ঘটনা।
লেবাননে গণ-উচ্ছেদ ও মানবেতর জীবন
লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসনের ফলে ১১ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যার মধ্যে শিশুর সংখ্যা প্রায় চার লাখ। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, এদের ৯০ শতাংশই কোনো আশ্রয়শিবিরে জায়গা পায়নি; তারা খোলা আকাশের নিচে বা ফুটপাথে রাত কাটাচ্ছে।
৫৫ বছর বয়সী নিদাল আহমেদ তার আট মাস বয়সী মেয়ে জোহরা এবং তিন বছর বয়সী ছেলে আহমদকে নিয়ে বৈরুতের একটি অস্থায়ী তাঁবুতে দিন কাটাচ্ছেন। নিদাল বলেন, ‘বিকেল ৫টা বাজে, কিন্তু আজ আমরা কিছু খাইনি। ছোট শিশুদের শুধু চা আর শক্ত রুটি দিয়ে কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখছি।’ টায়ার শহরে তার বাড়িটি যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেই ধ্বংস হয়ে যায়। এখন এক টুকরো প্লাস্টিকের তাঁবুতে তাদের দিন কাটছে, যেখানে বৃষ্টি হলেই সব কিছু ভিজে যায়। শত শত মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র একটি টয়লেট, যেখানে পানির কোনো ব্যবস্থা নেই।
ইউনিসেফের মারকোলুইগি করসি সতর্ক করে বলেছেন, ‘এই অবিরাম বোমাবর্ষণ শিশুদের মনে গভীর মানসিক ক্ষত তৈরি করছে।’ নিদাল জানান, যুদ্ধবিমানের শব্দ পেলেই তার তিন বছরের ছেলে আতঙ্কে লুকানোর জায়গা খোঁজে।
ফিলিস্তিনে মৃত্যু ও শোকের ছায়া
গাজায় যুদ্ধবিরতি চললেও ইরানের সঙ্ঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানে অন্তত ৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। গত এক বছরে গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু। সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, গাজায় গড়ে প্রতি এক ঘণ্টায় একটি করে শিশু মারা যাচ্ছে।
পশ্চিমতীরের চিত্র আরো ভয়াবহ। গত ১৫ মার্চ তামুন এলাকায় বাজার করে ফেরার পথে একটি পরিবারের ওপর হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এতে পাঁচ বছর বয়সী মোহাম্মদ এবং সাত বছর বয়সী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী উসমান তাদের মা-বাবার সাথে প্রাণ হারায়। প্রাণে বেঁচে যাওয়া ১১ বছর বয়সী খালেদ জানায়, ইসরাইলি পুলিশ তাকে মারধর করে এবং উপহাস করে বলে, ‘আমরা কুকুর মেরেছি’।
ইরানে শিশু সৈনিক নিয়োগের অভিযোগ
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরসিডি) নিরাপত্তা চৌকি পাহারা দেয়ার জন্য ১২ বছর বয়সী শিশুদের ব্যবহার করছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে। ‘স্বদেশ রক্ষা’র নামে একটি প্রচারণার মাধ্যমে শিশুদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে বলে সংস্থাটির ভাষ্য।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিল ভ্যান এসভেল্ড বলেন, ‘১২ বছর বয়সী শিশুদের সামরিক কাজে নামানোর কোনো অজুহাত হতে পারে না। ইরানি কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত জনবলের জন্য শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।’ ইতোমধ্যে আলিরেজা জাফরি নামে ১১ বছরের এক ইরানি শিশু ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছে, যে একটি চেকপোস্টে দায়িত্বরত ছিল।
শিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংসযজ্ঞ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মিনাব শহরে একটি প্রাথমিক স্কুলে মার্কিন বোমা হামলায় প্রাণ হারায় মূলত ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী অসংখ্য স্কুলছাত্রী। ইউনেস্কো একে আন্তর্জাতিক আইনের ‘চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে অন্তত ৫ কোটি ২০ লাখ শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, ৭৬৩টি স্কুল এবং ৩১৬টি চিকিৎসা কেন্দ্র মার্কিন-সমর্থিত ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। লেবাননের ৩৬৪টি পাবলিক স্কুল এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শিশুদের ওপর দীর্ঘমেয়াদী মানসিক প্রভাব
অবিরাম সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের আঞ্চলিক পরিচালক আহমদ আলহেনদাউই বলেন, ‘প্রতিটি যুদ্ধই আসলে শিশুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। শিশুরা এখন বড়দের এই যুদ্ধের ক্রসফায়ারে আটকা পড়েছে।’
ইরানে ইন্টারনেটের সমস্যার মাঝেও বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেল শিশুদের ভীতি ও উদ্বেগ দূর করার জন্য বিশেষ পরামর্শমূলক অনুষ্ঠান প্রচার করছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, যুদ্ধের এই ভয়াবহ স্মৃতি শিশুদের মন থেকে মুছে ফেলা সহজ হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে।



