পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে আর কয়েক দিন বাকি। এরই মধ্যে রোজার বাজার করতে শুরু করেছেন ভোক্তারা। কিন্তু রোজা শুরুর আগেই খেজুরসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক সপ্তাহে খেজুরের দাম কেজি প্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সাথে বেড়েছে গরুর গোশত, কিছু মাছ, মুরগি এবং ইফতারে বহুল ব্যবহৃত লেবুর দাম। তবে স্বস্তির খবর হলো- ছোলা, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ ও ডিমের বাজার এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রোজার অন্যতম প্রধান পণ্য খেজুরের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, কাওরান বাজার ও টাউন হল বাজারে বিক্রেতারা জানিয়েছেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের খেজুরের দামই বেড়েছে। বর্তমানে জাহিদী খেজুর কেজিপ্রতি ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ২৫০ টাকার কাছাকাছি। বরই খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকায়, দাবাস ৫০০ টাকা, কালমি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, সুক্কারি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১২০০ টাকা, মরিয়ম ১১০০ থেকে ১৪০০ টাকা এবং মেডজুল খেজুর ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায়।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ফল বিক্রেতা আজহারুল ইসলাম বলেন, পাইকারি বাজার থেকেই আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই খুচরায় দাম না বাড়িয়ে উপায় নেই। তবে আমদানিকারকদের ভাষ্য ভিন্ন। বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে খেজুরের দাম বাড়েনি এবং সরবরাহেও কোনো সঙ্কট নেই। তার ভাষায়, খুচরা বাজারে কেন দাম বাড়ছে, সেটি তাদের বোধগম্য নয়।
তথ্যে দেখা যায়, দেশে বছরে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ খেজুর বিক্রি হয় রমজান মাসে। রোজার বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার গত ডিসেম্বর মাসে খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এরপরও খুচরা বাজারে দাম বাড়ায় ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে।
এ দিকে খেজুরের পাশাপাশি গরুর গোশতের দামও বেড়েছে। বর্তমানে রাজধানীর বাজারে গরুর গোশত কেজিপ্রতি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগে স্থান ও মানভেদে কিছু কম ছিল। মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা গেছে। রুই, কই, শিং, পাবদাসহ কয়েক ধরনের মাছের দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রমজানকে সামনে রেখে ইফতারের অন্যতম উপকরণ লেবুর বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে প্রতি হালি লেবু ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, সেখানে এখন তা বেড়ে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় পৌঁছেছে। ছোট আকারের লেবুর হালি ২০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। বিক্রেতারা জানান, শবেবরাতের আগেই লেবুর দাম বাড়তে শুরু করে। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, রমজানে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া চাহিদা মেটানোর মত পর্যাপ্ত উৎপাদন না থাকায় প্রতি বছরই লেবুর বাজারে চাপ পড়ে।
শসার দামও আগেই বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি শসা ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, কোথাও কোথাও ৮০ টাকাও গুনতে হচ্ছে। বেগুনের দাম মানভেদে ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছে।
এ দিকে কয়েক সপ্তাহ কম দাম থাকার পর ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দামও বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় এবং সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শবেবরাতের আগে সোনালি মুরগির দাম ছিল ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা।
তবে ছোলা, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ ও ডিমের দাম এখনো সহনীয় পর্যায়ে আছে। বর্তমানে ছোলার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় ১৫ থেকে ৩০ টাকা কম। অ্যাংকর ডাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, বড় দানার মসুর ডাল ৯০ থেকে ১০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চিনির দাম প্রায় ১৭ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৯৫ থেকে ১০৫ টাকায়।
পেঁয়াজের বাজারও স্থিতিশীল। নতুন মৌসুমের পেঁয়াজ বাজারে আসায় কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভোজ্যতেলের দামও বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই রয়েছে। বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৯৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দাম আরো কিছুটা কমে ডজনপ্রতি ১১০থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাসিন্দা নিঘাত পারভীন বলেন, রোজা আসার আগেই খেজুর, গোশত, মাছ আর লেবুর দাম বাড়ছে। কিছু পণ্যের দাম কমলেও সার্বিকভাবে আমাদের সংসারের খরচ কমছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোজা সামনে রেখে বাজারে নজরদারি জোরদার না হলে খুচরাপর্যায়ে কৃত্রিম সঙ্কট ও দামের চাপ আরো বাড়তে পারে। ভোক্তারা চান- সরকারি তদারকি ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অন্তত রমজান মাসে নিত্যপণ্যের দাম যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।



