ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা। এ নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে আগেভাগেই প্রস্তুতি শুরু করেছে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচন তাদের জন্য শুধু ভোটের লড়াই নয়, বরং সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক সক্ষমতা যাচাইয়ের বড় সুযোগ। তারা বলছেন আগামীর নির্বাচন আমাদের জন্য লিটমাস টেস্ট । তৃণমূলকে শক্ত করার জন্য সেভাবেই প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে ।
অন্যান্য রাজনৈতিক দল এখনো দৃশ্যমানভাবে মাঠে সক্রিয় না হলেও এনসিপি ইতোমধ্যে প্রস্তুতিতে এগিয়ে আছে। এরই মধ্যে পাঁচটি সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা উত্তরে আরিফুল ইসলাম আদীবকে মনোনয়ন দিয়ে শুরুতেই চমক দেখিয়েছে তারা। পাশাপাশি কুমিল্লা, রাজশাহী ও সিলেটেও প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি সিটিগুলোতেও দ্রুত প্রার্থী দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা জোটগতভাবে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে লড়ার দিকেই বেশি ঝুঁঁকছে এনসিপি। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এককভাবে নির্বাচন করে তৃণমূলকে শক্তিশালী করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী জোটগত সমঝোতার সুযোগও খোলা রাখা হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এনসিপি গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের হয়ে অংশ নেয়। সেই নির্বাচনে তারা ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছয়টিতে জয় পায়। বর্তমানে দলটি সংসদে বিরোধী জোটের অংশ হিসেবেও ভূমিকা রাখছে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ছয় সদস্যের একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে এনসিপি। কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে সারজিস আলমকে এবং সদস্যসচিব আবদুল হান্নান মাসউদকে। এ কমিটির মাধ্যমেই প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনী প্রস্তুতি এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।
দলটির নেতারা বলছেন, এপ্রিলের মধ্যেই উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হতে পারে। একই সাথে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদনও নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে আগ্রহীদের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতার কথাও জানানো হয়েছে। জনসেবায় সক্রিয়তা, সৎ নেতৃত্ব, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং নগর সমস্যার বিষয়ে ধারণা- এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
এনসিপির নেতাদের অভিযোগ, বর্তমানে স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সাধারণ মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনারও সমালোচনা করেছেন তারা। দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়ে দলটি বলছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে সব স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্ন করা উচিত। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী সময়ে প্রশাসক নিয়োগের কারণে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন। একই সাথে যারা প্রশাসকের দায়িত্বে আছেন, তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকাতে বিধান থাকা দরকার বলেও মনে করেন তিনি।
দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানান, স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী বাছাইয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে সমঝোতার সুযোগ কম। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারাই প্রার্থী নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিটিতে রাজনৈতিক সমঝোতা হতে পারে।
এ দিকে, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, জামায়াতের সাথে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক এখনো রয়েছে। সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ হলে ভবিষ্যৎ জোটগত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে চায় এনসিপি। দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম বলেন, আগের নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই ও জোটের সিদ্ধান্ত অনেক দেরিতে হওয়ায় প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল। এবার সে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আগেভাগেই মাঠে নামা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আপাতত এককভাবে নির্বাচন করার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ মুহূর্তে বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে। তবে দলীয়ভাবে তারা নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির ওপরই ভরসা রাখতে চায়।



