পিলখানা হত্যা তদন্তের নামে যেন আর দীর্ঘসূত্রতা না হয়

পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ দেড় দশক কেটে গেলেও বিচার ও তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন, সংশয় ও বিতর্ক থামেনি। অভিযোগ আছে- প্রকৃত কারণ, পটভূমি ও সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের পূর্ণ চিত্র জাতির সামনে কখনোই পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়নি। ফলে ‘বিচার হয়েছে’- এই সরকারি বক্তব্যের বিপরীতে ‘সত্য উন্মোচিত হয়নি’- এমন জনধারণাই বেশি জোরালো।

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • বিডিআর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কমিশন গঠনের বিধান কোনো আইনে নেই : শাহদীন মালিক
  • বিডিআর নামে ফিরে যাওয়াটাকে আমি সম্পূর্ণ সমর্থন করি : ইশফাক ইলাহী
  • দীর্ঘ ১৫ বছর সন্দেহ ও বিভ্রান্তি দূর করার একমাত্র পথ পূর্ণাঙ্গ তথ্য উন্মুক্ত করা : রোকন উদ্দিন

ঢাকার পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর হত্যাকাণ্ড ঘটনার পর দীর্ঘ দেড় দশক কেটে গেলেও বিচার ও তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন, সংশয় ও বিতর্ক থামেনি। অভিযোগ আছে- প্রকৃত কারণ, পটভূমি ও সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের পূর্ণ চিত্র জাতির সামনে কখনোই পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়নি। ফলে ‘বিচার হয়েছে’- এই সরকারি বক্তব্যের বিপরীতে ‘সত্য উন্মোচিত হয়নি’- এমন জনধারণাই বেশি জোরালো।

পিলখানার বিডিআর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও নিরাপত্তা ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির সেই রক্তাক্ত দিনে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদর দফতরে ঘটে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ- যার অভিঘাত আজও রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী ও নিহতদের পরিবার বহন করছে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং নতুন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় পিলখানা ইস্যু আবার আলোচনার কেন্দ্রে আসে। জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে ১১ মাস ধরে অনুসন্ধান শেষে প্রতিবেদন জমা দেয়া হলেও তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বরং আবার নতুন করে কমিশন গঠনের আভাস- এতে অনেকের আশঙ্কা, তদন্তের নামে আবার দীর্ঘসূত্রিতা শুরু হতে পারে। অবশ্য গতকাল এই কমিশন গঠন না করার কথা জানানো হয়েছে।

আইনি কাঠামো ও কমিশনের সীমা : জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কমিশন গঠনের কোনো সরাসরি আইনি বিধান নেই। তার মতে, অপরাধ তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কমিশনের কাজ মূলত ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ ও সরকারের জন্য সুপারিশ দেয়া- ফৌজদারি তদন্ত পরিচালনা নয়। তিনি মনে করেন, কে জড়িত ছিল, কীভাবে ঘটলো এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে কী করা দরকার- এসব প্রশ্নের নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতে পারে কমিশন; কিন্তু বিচারিক তদন্তের বিকল্প নয়।

তদন্ত হোক, কিন্তু হোক পেশাদার ও স্বচ্ছ : নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক ইলাহী চৌধুরীর বক্তব্য আরো বাস্তববাদী। তার মতে, এর আগে একাধিক তদন্ত হয়েছে- বেসামরিক ও সামরিক উভয়পর্যায়ে। এখন নতুন করে তদন্ত হলে তা কেবল তখনই অর্থবহ হবে, যখন পুরনো তদন্তের ত্রুটি সংশোধন, অসমাপ্ত অংশ পূরণ এবং তথ্য যাচাই করা হবে।

তিনি সতর্ক করেন, ‘প্রতি সরকার এসে নতুন কমিশন করলে সত্য উদঘাটনের বদলে সময়ই নষ্ট হবে।’

একই সাথে তার জোরালো দাবি- প্রতিবেদন অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে। কারণ এই মামলার সাথে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবার জড়িয়ে আছে। অপরাধী যেন না ছাড় পায়, আবার নিরপরাধ যেন শাস্তি না ভোগ করে- আইনের এই মৌলিক নীতিই বজায় রাখতে হবে।

বাহিনীর নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিডিআর নাম পুনর্বহালের পক্ষে মত দেন। তার ভাষায়, নাম বদলে চরিত্র বদলায় না; বরং ঐতিহাসিক পরিচয় রক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত।

‘সত্য প্রকাশই একমাত্র সমাধান’ : সাবেক মেজর জেনারেল ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক রোকন উদ্দিনের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা স্বচ্ছতার ঘাটতি। তার মতে, গত ১৫ বছরে অসংখ্য গুঞ্জন, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও বিভ্রান্তি সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো দূর করার একমাত্র উপায়- পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ।

তিনি বলেন, পিলখানার ঘটনায় কেবল বেতন-বৈষম্য বা প্রশাসনিক ক্ষোভ নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে সিনিয়র সামরিক নেতৃত্বকে টার্গেট করার বিষয়টি অনেককে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়। সাম্প্রতিক তদন্তেও নাকি বহিরাগত যোগাযোগ বা অর্থায়নের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে- কিন্তু সরকার তা প্রকাশ না করায় সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

তার মতে, নিহত ৫৭ সেনা কর্মকর্তার পরিবারের কাছে এটি রাজনৈতিক ইস্যু নয়- এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। সত্য গোপন থাকলে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা আরো ঝুঁকির মুখে পড়বে।

আলামত হারানো, সময়ের ক্ষয় : জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান জানান, ১৬ বছর পর তদন্ত শুরু করায় অনেক আলামত নষ্ট হয়েছে, অনেকে বিদেশে চলে গেছেন। তবু পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করা হয়েছে বলে দাবি তার।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে- বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ, প্রশাসনিক অসামঞ্জস্য, দায়িত্বের চাপ, নেতৃত্ব সঙ্কটসহ নানা কারণের সমন্বয়ে পরিস্থিতি বিস্ফোরক হয়েছিল। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নও উড়িয়ে দেয়া হয়নি।

কিন্তু এসব বিশ্লেষণ জনসমক্ষে না এলে তা মূল্যহীনই থেকে যাবে।

বারবার কমিশন, নাকি একবারেই সত্য?

প্রশ্নটা এখন সোজা : নতুন কমিশন গঠনের আগে পুরনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে কি না? বিশেষজ্ঞদের অভিন্ন মত- প্রথমে প্রকাশ, তারপর প্রয়োজন হলে সংশোধন। কারণ গোপন তদন্ত জনআস্থা বাড়ায় না; বরং সন্দেহ বাড়ায়।

পিলখানার হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিদ্রোহ নয়, এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত। তাই এর বিচারও হতে হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার মানদণ্ডে।

১৭ বছর পরও যদি সত্য চাপা থাকে, তবে সেটি বিচার নয়- ইতিহাসের প্রতি অবিচার।

তদন্ত হোক- কিন্তু আর বিলম্ব নয়। কমিশন হোক- কিন্তু তথ্য গোপন রেখে নয়। জাতি এখন কেবল একটি জবাব চায় : পুরো সত্য।