বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই অভ্যুত্থান কেবল একটি সরকার পতন বা ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘ দিনের শাসনতান্ত্রিক সঙ্কট, ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধ এবং একটি কার্যকর রাষ্ট্র কাঠামো নির্মাণের আকাক্সক্ষা আজ জনমানসে প্রবল। এই রূপান্তরের আইনি বৈধতা, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির-এর সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন আলমগীর কবির।
নয়া দিগন্ত : অনেক রাজনৈতিক দল ও সমালোচক দাবি করছেন, বর্তমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বা ‘জুলাই জাতীয় সনদে’র মতো কোনো কাঠামোর অস্তিত্ব নেই। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না এবং সংবিধান সংস্কারের জন্য সংসদীয় কার্য-উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনার কথা বলছেন। এই আইনি সীমাবদ্ধতার দাবি কি সঠিক?
শিশির মনির : এই দাবিটি মূলত একটি ‘সংবিধানতান্ত্রিক গোঁড়ামি’ বা আইনি ফাঁকি। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে আইনের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত ব্যাপক। তাতে ‘ল’ বা আইন বলতে শুধু সংসদ কর্তৃক পাস করা অ্যাক্ট নয়; বরং অর্ডিন্যান্স, অর্ডার, রুল, রেগুলেশন, বাই-ল এবং এমন যেকোনো আইনগত দলিলকে বোঝানো হয়েছে যা বাংলাদেশে আইন হিসেবে বলবৎ থাকার ক্ষমতা রাখে। রাষ্ট্রপতির জারি করা ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক নির্দেশ নয়; বরং এটি সংবিধান স্বীকৃত একটি আইনি দলিল। যেমন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডার ১৯৭৩’ বা ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২’ আইন হতে পারলে, রাষ্ট্রপতির এই আদেশ কেন আইন হবে না?
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল একটি সাংবিধানিক রদবদল। রাষ্ট্র যখন ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়, তখন প্রথাগত আইনগুলো নতুন বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ থাকে না। এই শূন্যতা পূরণের জন্যই ‘জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা’ কাজ করে। রাষ্ট্রপতি যখন এই আদেশ জারি করেছেন, তখন তিনি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিনিধি হিসেবে এটি করেছেন। যারা এখন ‘সংবিধানে নেই’ বলে অজুহাত দিচ্ছেন, তারা মূলত গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত এই ‘ বৈপ্লবিক বৈধতা’কেই অস্বীকার করতে চাইছেন।
এ ছাড়া যারা পার্লামেন্টের কার্য-উপদেষ্টা কমিটির কথা বলে কালক্ষেপণ করছেন, তারা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করার সময় অঙ্গীকার করেছিলেন- ১) তারা কোনো আদালতে একে চ্যালেঞ্জ করবেন না, ২) এটি সংবিধানে তফসিল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করবেন এবং ৩) তারা এর আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন। এখন পার্লামেন্টে গিয়ে অন্য কথা বলা কেবল রাজনৈতিক সুবিধাবাদ নয়, এটি জনগণের সাথে ‘ধোঁকাবাজি’। আইনশাস্ত্রের ‘এস্টোপেল’ নীতি অনুযায়ী, আপনি একবার স্বাক্ষর দিয়ে অঙ্গীকার করলে পরবর্তী সময়ে তার বিপরীতে গিয়ে নিজের কথা ফেরাতে পারেন না। সংবিধান জনগণের জন্য তৈরি, জনগণ সংবিধানের জন্য নয়।
নয়া দিগন্ত : জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমান অবস্থানকে কিভাবে দেখছেন?
শিশির মনির : এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং রাজনৈতিক দ্বিচারিতার শামিল। যেসব রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে, আজ তারাই বলছে যে এটি পার্লামেন্টের কার্যপ্রণালীতে প্রস্তাব আকারে আনতে হবে। এটি জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। স্বাক্ষরকারী দলগুলো যখন প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা কোনো আদালতে এই সনদের বিরোধিতা করবে না, অথচ পরবর্তী সময়ে সরকার ও অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের মাধ্যমে কৌশলে রিট পিটিশন করানোর চেষ্টা করে, তখন তা তাদের চারিত্রিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করে। এটি কেবল মানুষের আস্থা নষ্ট করছে না; বরং ভবিষ্যতে বড় ধরনের অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে।
নয়া দিগন্ত : জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে সরকার গঠিত হয়েছে, তার আইনি ভিত্তি নিয়ে নানামুখী বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে সংবিধানে ‘প্রধান উপদেষ্টা’ পদের অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও এই কাঠামো কিভাবে বৈধতা পাচ্ছে?
শিশির মনির : এটি বুঝতে হলে আমাদের প্রচলিত আইনের বাইরে ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বা প্রয়োজনীয়তার নীতি বুঝতে হবে। সংবিধানে অনেক কিছুই লেখা থাকে না, যা বাস্তব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এই সরকার গঠিত হয়। সংবিধানে বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান নেই (পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিলকৃত)। তাই তিন মাসের সময়সীমার বাধ্যবাধকতা এড়াতে এর নাম দেয়া হয়েছে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’। প্রধান উপদেষ্টার পদটি সংবিধানে না থাকলেও বাস্তব প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর শপথকেই প্রধান উপদেষ্টার শপথ হিসেবে প্রয়োগ করে এই সিস্টেমটি দাঁড় করানো হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ ‘কনসেনসাস’ বা জাতীয় সম্মতির ভিত্তিতে হয়েছে।
নয়া দিগন্ত : সরকারের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে যে রিট হয়েছিল এবং ১০৬ অনুচ্ছেদের যে ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
শিশির মনির : সরকারের বৈধতার উৎস এখন দু’টি। প্রথমটি হলো সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ (সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক এখতিয়ার) এবং দ্বিতীয়টি হলো ‘জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ’। হাইকোর্ট এবং পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টও এই রায় বহাল রেখেছে। যারা শুধু ১০৬ অনুচ্ছেদের কথা বলেন, তারা ভুল করছেন। কারণ ৮ আগস্ট শপথের আগে ৫ বা ৬ আগস্ট যখন মানুষ রাজপথে ছিল, তখন ১০৬ অনুচ্ছেদ কার্যকর ছিল না। তখন কার্যকর ছিল জনগণের ইচ্ছা। সুতরাং, যারা আদালত এবং আইন মানেন, তাদের স্বীকার করতেই হবে যে, জনগণের ইচ্ছাই এই সরকারের মূল শেকড়।
নয়া দিগন্ত : গণভোটের প্রশ্নগুলো নিয়ে তো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বিমত দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে বিএনপির প্রস্তাবের সাথে এর পার্থক্য কোথায়?
শিশির মনির : বিরোধের মূল জায়গাটি হলো উচ্চকক্ষ গঠনের ভিত্তি। প্রস্তাবে বলা হয়েছে- ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ হবে, যা গঠিত হবে নির্বাচনের ‘ভোটের আনুপাতিক হারে’। কিন্তু বিএনপি চেয়েছিল সংসদের ‘সিটের আনুপাতিক হারে’। যখন কমিশনে এই বিষয়ে কোনো ঐকমত্য হয়নি, তখনই বিষয়টি জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পাঁচ কোটি মানুষ এর পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। এখন যদি কেউ বলেন যে জনগণ ‘না বুঝে’ ভোট দিয়েছে, তবে সেটি হবে জনগণের রায়ের প্রতি চূড়ান্ত অশ্রদ্ধা। কোনো রাজনৈতিক দলের মেনিফেস্টো কয়জন মানুষ পড়ে ভোট দেয়? অথচ সেখানে তারা ম্যান্ডেট দাবি করে। গণভোটে চারটি স্পষ্ট প্রশ্ন ছিল এবং মানুষ তার পক্ষেই রায় দিয়েছে।
নয়া দিগন্ত : রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘ইমোশন’ বা আবেগের চেয়ে ‘আইন’ বড় এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শিশির মনির : এটি একটি খণ্ডিত ব্যাখ্যা। আইন কখনো শূন্যতায় জন্ম নেয় না। প্রতিটি আইনের পেছনে একটি ‘শানে নুজুল’ বা প্রেক্ষাপট থাকে। আপনি যদি আইনকে তার প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করেন, তবে তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যাবে। জুলাই অভ্যুত্থানে এক হাজার ৪০০ মানুষের জীবনদান, হেলিকপ্টারের গুলির সামনে বুক পেতে দেওয়া- এগুলো কি কেবল বিশৃঙ্খল আবেগ ছিল? অবশ্যই না। একে বলা হয় ‘ইমোশনাল এক্সিউবারেন্স’ , যা মূলত একটি জাতির মুক্তি কামনার বহিঃপ্রকাশ। এই আবেগের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। আপনি যদি জুলাইয়ের প্রেক্ষাপট মাথা থেকে সরিয়ে আইন ব্যাখ্যা করতে চান, তবে আপনি বর্তমান সরকার, বর্তমান পার্লামেন্ট এমনকি খালেদা জিয়ার মুক্তি- কোনো কিছুরই সঠিক ব্যাখ্যা পাবেন না।
নয়া দিগন্ত : জিয়াউর রহমানের শাসনামল এবং বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে কোনো আইনি সামঞ্জস্য বা বৈপরীত্য দেখছেন কি?
শিশির মনির : এটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক যে, যারা আজ নিয়মের কথা বলছেন, তারাই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম সংবিধানকে পদদলিত করেছেন। জিয়াউর রহমান একজন সামরিক অফিসার থেকে কিভাবে প্রেসিডেন্ট হলেন? তিনি ‘ফার্স্ট প্রোক্লেমেশন অর্ডার, ১৯৭৭’ জারির মাধ্যমে সংবিধানের আমূল পরিবর্তন করেছিলেন। তখন কোনো সংসদ ছিল না। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালে সংসদে গিয়ে তিনি সংশোধনী পাস করে নিজের সব কাজকে আদালতের আওতার বাইরে রাখার ব্যবস্থা (ইন্ডেমনিটি) করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার তাকে পরবর্তী সময়ে ‘ইউজারপার’ বা অবৈধ ক্ষমতা দখলদার বলেছিল। আমরা সেই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ‘প্রোটেক্টিভ সিস্টেম’ তৈরি করেছি। আমরা চাইনি কেবল একজন ব্যক্তির আদেশে সব চলুক; বরং গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে একটি ‘সংস্কার পরিষদ’ গঠন করতে চেয়েছি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আদালত একে অবৈধ বলতে না পারে।
নয়া দিগন্ত : সংবিধান ‘সংশোধন’ এবং ‘সংস্কার’ এই দু’টি শব্দের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটি কোথায়?
শিশির মনির : এটি আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। ‘সংশোধন’ হলো ক্ষুদ্র পরিসরে পরিবর্তন। আর ‘সংস্কার’ হলো আইডিয়া বা দর্শনের পরিবর্তন। অতীতে আমরা দেখেছি, শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক মেজরিটি দিয়ে সংবিধান সংশোধন করলে তা পরবর্তী সময়ে আদালত বাতিল করে দেয়। আমরা চাচ্ছি ‘সংস্কার পরিষদে’র মাধ্যমে এমন পরিবর্তন আনতে যা আদালত বা পরবর্তী সরকার সহজে পরিবর্তন করতে পারবে না।
আমরা যেসব সংস্কার প্রস্তাব করেছি, তার উদ্দেশ্য হলো : ১. ক্ষমতার ভারসাম্য : প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা।
২. পরিবারতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের বিলোপ : প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর (দুই মেয়াদ) সীমাবদ্ধ করা।
৩. বিচার বিভাগ : প্রধান বিচারপতি নিয়োগে জ্যেষ্ঠতার নীতি বাধ্যতামূলক করা।
৪. উচ্চকক্ষ : নিম্নকক্ষের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে এটি একটি চেক-অ্যান্ড-ব্যালেন্স। ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে ক্ষুদ্র দলগুলোরও কণ্ঠস্বর থাকবে।
নয়া দিগন্ত : জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং বর্তমান রোডম্যাপ নিয়ে আপনার চূড়ান্ত বিশ্লেষণ কী?
শিশির মনির : বর্তমান সরকার একটি ‘আপৎকালীন সময়ের’ রোডম্যাপ ডিক্লেয়ার করেছিল। এই সনদে স্বাক্ষর করার মানেই হলো আমরা একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে একমত হয়েছি। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন যদি রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধানের দোহাই দিয়ে এই সংস্কার পরিষদ বা গণভোটের ফলাফলকে পাশ কাটিয়ে রেগুলার পার্লামেন্টে সব করতে চায়, তবে তা ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনের পথ প্রশস্ত করবে। জুলাই সনদ কোনো নির্দিষ্ট দলের জন্য নয়, এটি সমগ্র জাতির মুক্তির দলিল। এই সংস্কারের মাধ্যমে রাজমিস্ত্রির ছেলেও একদিন রাষ্ট্র পরিচালনার স্বপ্ন দেখতে পারবে। এই বিতর্ক জিইয়ে রাখা মানেই ফ্যাসিবাদের দোসরদের সুযোগ করে দেয়া।



