এইচআরএসএসের মাসিক প্রতিবেদন

মার্চে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৮, আহত ৯১২

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি বছরের মার্চ মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ৯১২ জনের বেশি বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন।

গতকাল শনিবার গণমাধ্যমে প্রেরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি-এইচআরএসএস’।

বাংলাদেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছরের মার্চ মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ১১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৯১২ জন। মার্চ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা তুলনামূলক কমলেও নিহতের সংখ্যা ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় বেড়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৪৬টি ‘রাজনৈতিক সহিংসতার’ ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১০ জন।

‘মার্চ মাসে সহিংসতার ১১৩টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৪৫টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫০১ জন ও নিহত হন ৯ জন। ১৬টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১০৯ জন ও নিহত পাঁচজন, ২২টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৫৬ জন এবং নিহত হয়েছেন দু’জন। দু’টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১১ জন, ২১ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩৯ জন। এ ছাড়া, বিভিন্ন দলের মধ্যে সাতটি সহিংসতার ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯৬ জন ও নিহত হয়েছেন দু’জন। নিহত ১৮ জনের মধ্যে বিএনপির ১৩ জন, জামায়াতের দু’জন, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলের দু’জন ও একজন সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৮ জনের মধ্যে একজন নারী, একজন কিশোর ও একজন সাধারণ মানুষ রয়েছেন।’

‘আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, নির্বাচনপরবর্তী সহিংসতা, প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটকেন্দ্রিক বেশির ভাগ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলায় বিএনপির পাঁচজন ও আওয়ামী লীগের একজন নিহত হয়েছেন এবং আটজন আহত হয়েছেন। তা ছাড়া সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক অন্তত ২৮টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৩০টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।’

প্রতিবেদনে মার্চে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার তথ্য উল্লেখ আরো বলা হয়, সারা দেশে অন্তত ৯টি সহিংসতার ঘটনায় ১০৯ জন আহত হয়েছেন এবং তিনজন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে একজন আহত ও একজন নিহত এবং অন্যান্য দলের মধ্যে দু’টি সংঘর্ষে দু’জন আহত হয়েছে।

এ ছাড়া, এ মাসে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ২৮টির অধিক মামলা হয়েছে। এ সব মামলায় ৩০৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১২৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ মাসে রাজনৈতিক মামলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ২২৫ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অন্তত ১১০ জন, বিএনপির নেতাকর্মী ৮৫ জন এবং জামায়াতের ২০ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির আটজন। এ ছাড়া সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চ মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতায় সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগি¦তণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ২৫টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৮ জন।

মার্চ মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করা বলা হয়েছে, মার্চ মাসে ৩৪টি হামলার ঘটনায় ৫৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৩ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন তিনজন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ১২ জন সাংবাদিক । এছাড়াও একজন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর অধীনে আটজন সাংবাদিককে আসামি করে পৃথক দু’টি মামলা হয়েছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে আটটি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, এতে ৮১ জনের অধিক ব্যক্তি আহত হন। যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারী ছিলেন।

এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক দু’টি মামলায় আটজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সমালোচনায় একজনকে আটক, ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাতের অভিযোগে দু’জনকে আটক করা হয়েছে। এমনকি পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ফেসবুকে বিএনপি নেতা জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক পোস্ট দেয়ায় মো: ইদ্রিস (৪৫) নামে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে পুলিশি অভিযানের সময়ে নির্যাতনে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া, এ মাসে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ১২ জন আসামি মারা গিয়েছেন। ১২ জনই কয়েদি। এর মধ্যে দু’জন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের এবং ১০ জন্য সাধারণ কয়েদি মারা গেছেন।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ১০টি হামলার ঘটনায় পাঁচজন আহত হয়েছে। এ ছাড়া তিনটি মন্দির, একটি প্রতিমা ও তিনটি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়াও জমি দখলের মতো একটি ঘটনা ঘটেছে।

সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চ মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে চারটি হামলার ঘটনায় চারজন আহত হয়েছেন এবং তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া একজনকে আটক করা হয়েছে। অপর দিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পাঁচটি সহিংসতার ঘটনায় একজন আহত ও ২৭ জনকে আটক করা হয়েছে।

শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ মাসে ৭৭টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন এবং আহত হয়েছেন ১৭৬ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ৩৮ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এ ছাড়া রাজধানীর বনানীতে একটি বহুতল ভবনের তিনতলা থেকে ফেলে পিংকী (১৫) নামে এক গৃহকর্মীকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

এ মাসে ২৭৩ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চ মাসে ৭২ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৬ জন নারী ও কন্যাশিশু। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে পাঁচজনকে যাদের মধ্যে শিশু তিনজন এবং ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন একজন। ৫৩ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ২৩ জন। এ ছাড়া পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৫১ জন, আহত হয়েছেন ৪৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৪৩ জন নারী। এমনকি যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত তিনজন আহত হয়েছেন চারজন নারী।

সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সাথে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ- এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যেতে পারে।