অধ্যাদেশ বাতিল নিয়ে টিআইবি

বাতিলের চাপ রাজনৈতিক অঙ্গনের, যুক্তি আমলাতন্ত্রের

সরকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেই পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে

বর্তমানে অধ্যাদেশ নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা মূলত অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের ফল। যার উৎস রাজনৈতিক অঙ্গন। একই সাথে এ প্রক্রিয়ায় আমলাতন্ত্রের ওপরও নির্ভরতা রয়েছে। অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে, তার অনেকটাই আমলাতন্ত্র থেকেই এসেছে। এতে প্রমাণ হয়, এখনো দেশের নীতিনির্ধারণে আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। টিআইবি বলছে, সরকার মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেই পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, অধ্যাদেশ আইন হিসেবে কার্যকর না হওয়ার পেছনে মূলত দু’টি কারণ কাজ করছে। একটি আমলাতন্ত্র ও আরেকটি রাজনৈতিক প্রভাব। তিনি বলেন, বর্তমানে অধ্যাদেশ নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা মূলত অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের ফল। যার উৎস রাজনৈতিক অঙ্গন। একই সাথে এ প্রক্রিয়ায় আমলাতন্ত্রের ওপরও নির্ভরতা রয়েছে। অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে, তার অনেকটাই আমলাতন্ত্র থেকেই এসেছে। এতে প্রমাণ হয়, এখনো দেশের নীতিনির্ধারণে আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। টিআইবি বলছে, সরকার মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেই পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজধানীর ধানমণ্ডিস্থ মাইডাস ভবনে টিআইবি কার্যালয়ে সোমবার রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত কিছু অধ্যাদেশ বাতিল ও পরিবর্তন বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।

উপস্থাপনায় টিআইবি বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ২ এপ্রিল ২০২৬- বৃহস্পতিবার ‘মোট ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু আইনে পরিণত করার জন্য সুপারিশ করেছে। যা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫, বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন (সংশোধন) আইন ২০২৫, জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে করা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ)’ অধ্যাদেশও রয়েছে। তবে আইনে পরিণত হতে যাওয়া সব অধ্যাদেশের সবই দুর্বলতাহীন নয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল করা হয়েছে। যেমন- সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫, স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত চারটি সংশোধনী অধ্যাদেশও এর মধ্যে রয়েছে।

সিএজি সাংবিধানিক মর্যাদা ও স্বাধীনতার পরিপন্থী : টিআইবি বলছে, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশটিতে এখনো যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে, তা মহা হিসাব-নিরীক্ষকের (সিএজি) সাংবিধানিক মর্যাদা ও স্বাধীনতার পরিপন্থী। কেননা, সরকারি হিসেবে প্রাপ্য সব রাজস্ব ও প্রাপ্তি প্রচলিত আইন, বিধি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিরূপণ ও সঠিকভাবে জমা ও হিসাবভুক্ত হয়েছে কি না তা নিরীক্ষার সুযোগ বর্তমান অধ্যাদেশে রাখা হয়নি (ধারা-৬)। যা সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থায় জবাবদিহি কমাবে- রাজস্ব নিরূপণ ও আদায়ে অনিয়ম ও করফাঁকি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ হারাবে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি। এটিকে রাজস্ব আদায় ও নিরূপণ কার্যক্রমে যোগসাজশমূলক অনিয়ম ও কারসাজির দায়মুক্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে।

প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতায় দুষ্ট এলজিআরডি অধ্যাদেশ : সংস্থাটি বলছে, স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত চারটি সংশোধনী অধ্যাদেশও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতায় দুষ্ট। মূলত জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার যেমন- সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বরখাস্ত করা এবং প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা পায় সরকার। যেখানে বিশেষ পরিস্থিতি ও জনস্বার্থে সরকার এই ক্ষমতা প্রয়োগ করার কথা বলা হয়। কিন্তু নির্বাচিত সরকারও নিজের ইচ্ছেমতো সরিয়ে দেয়ার ক্ষমতাকে স্বাভাবিকতায় পরিণত করেছে। যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়ার ঝুঁকি : টিআইবি বলছে, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশকে রহিত করার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি একেবারেই বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। তিনটি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি কোনো টাইমলাইনও ঠিক করেনি বা ভবিষ্যতে করা হবে তার ইঙ্গিতও দেয়নি। দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার কমিশন ও দুদকসহ ১৬টি অধ্যাদেশ পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী করে আনার কথা বলা হয়েছে। যদিও সেই সময়কাল সুনির্দিষ্ট নয়। তৃতীয় ধাপে থাকা পুলিশ কমিশনসহ ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে এনে পাসের কথা বলা হয়েছে। যদিও এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে সেটি স্পষ্ট করা হয়নি। এখানে লক্ষণীয় হচ্ছে, সরকার মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেই পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যা দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি দূরীকরণে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কাজ করত। অন্য দিকে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, যা চরম দুর্বলতার কারণে সম্পূর্ণ বাতিলযোগ্য সেটিতে প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনকে অধিকতর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার বিধানসংযুক্ত করে বিল আকারে পাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা হতাশাজনক।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা : উপস্থাপনায় টিআইবি জানায়, দেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে এবং দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় যে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করে তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য অপরিহার্য। মূলত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে এবং মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে ও বিশেষ করে বিচারক নিয়োগে দলীয় রাজনৈতিক ও সরকারি প্রভাব দূর করার লক্ষ্যে ‘সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়। যেখানে বিচারক নিয়োগের জন্য একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাইয়ে দায়িত্ব অর্পণ করা হয় ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’-এর কাছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করে। এর মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগে একদফা নিয়োগও সম্পন্ন হয়েছে। অধ্যাদেশটি রহিত করায় বিচারক নিয়োগের বিষয়টি আবারো পুরনো ধারায় ফিরে যাবে বা সরকার প্রধানের ইচ্ছানুমাফিক হয়ে পড়বে, যা এক পা এগিয়ে দুই পা পেছনে হাঁটার শামিল।

ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫

টিআইবি বলছে, এই আইনটি বাস্তবায়নের পূর্বে এটির মানবাধিকারবিষয়ক প্রভাব বিশ্লেষণ জরুরি। একই সাথে আইনটি বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষকে একই আইনের আওতাভুক্ত করতে হবে এবং এটি হতে হবে স্বাধীন। বিশ্বজুড়ে অনুসৃত উপাত্ত সুরক্ষা মূলনীতি (উধঃধ চৎড়ঃবপঃরড়হ চৎরহপরঢ়ষবং) যেমন আইনসম্মত, মানবাধিকার প্রাধান্য, ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা, উদ্দেশ্য সীমাবদ্ধতা, তথ্য ন্যূনতমীকরণ, নির্ভুলতাসহ সততা ও গোপনীয়তা এবং জবাবদিহির বিষয়গুলো বাদ দেয়া বা ছুড়ে ফেলা হয়েছে।

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ বাতিলের দাবি : সংস্থাটি বলছে, পুলিশকে একটি জনবান্ধব এবং একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমশিন গঠন প্রয়োজন তার কোনো প্রতিফলনই অধ্যাদেশটিতে হয়নি। যা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবিত বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশ ও সিদ্ধান্তের সাথে সাংঘর্ষিক। পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশনের প্রত্যাশা পদদলিত করে এমনকি ‘স্বাধীন’ বা ‘নিরপেক্ষ’ শব্দগুলো ব্যবহার না করে শুধু একটি ‘সংবিধিবদ্ধ সংস্থা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। একই সাথে এর গঠন, কার্যপরিধি ও প্রক্রিয়াসংক্রান্ত বিধানগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে। যা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবিত বিএনপি ও সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিসহ জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশ ও সিদ্ধান্তের সাথে সাংঘর্ষিক। অন্য দিকে এ অধ্যাদেশের বলে যদি পুলিশ কমিশন গঠিত হয় তবে তা হবে সম্পূর্ণভাবে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশি ও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান, যা এ ধরনের কমিশনের মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হবে। পুলিশ কমিশনের চেয়ারপার্সন ও সদস্য নিয়োগের বাছাই কমিটির গঠন ও কর্মপদ্ধতি পরিপূর্ণভাবে আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে, যার ফলে কমিশন গঠন ও কাজে ক্ষমতাসীন সরকারের পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব ও স্বার্থের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দুদকে নেতৃত্বের অভাব : নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখার বলেন, বর্তমান সময়টা দুদকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুদক কখনোই পুরোপুরি কার্যকর ছিল না, তবে বর্তমানে নেতৃত্বের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি আরো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কমিশন না থাকায় নতুন কোনো সিদ্ধান্তও নেয়া যাচ্ছে না, যা উদ্বেগজনক। তিনি দ্রুত দুদকের নতুন অধ্যাদেশ সংশোধন ও নতুন কমিশন গঠনের দাবি জানান।