সারা দেশেই শিশুদের হাম হচ্ছে। কেন হচ্ছে এটা নিয়ে একটা বিতর্ক আছে কিন্তু হাম হওয়ার মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে এটা প্রমাণিত বলছেন বাংলাদেশের কয়েকজন শিশু বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, হাম হওয়ার কারণ যাই হোক শিশুদের মধ্যে আরেকটি হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করতে হবে খুবই দ্রুততার সাথে।
হাম হলো রুবেলা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি অতি সংক্রামক রোগ। এটা মূলত শিশুদের রোগ। হামে আক্রান্ত হলে বা শরীরে হাম উঠলে লাল বা গোলাপি রঙের ফুসকুড়ি দেখা দেয়, হালকা জ্বর হয় এবং লসিকাগ্রন্থি ফুলে যায়। কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কণার মাধ্যমে এই রোগ অন্য শিশুর মধ্যে সংক্রমিত হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত মৃদু হলেও গর্ভবতী নারীদের জন্য এটি গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে, যা গর্ভপাত বা জন্মগত রুবেলা সিন্ড্রোমের কারণ হতে পারে। এ রোগের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই; ব্যবস্থাপনা চিকিৎসাই ভরসা। শরীরে যখন যে সমস্যার উদ্ভব ঘটে চিকিৎসকরা সেই সমস্যার চিকিৎসা দিয়ে থাকেন, এটা ব্যবস্থাপনা চিকিৎসা।
বর্তমানে বাংলাদেশে কেন হাম হচ্ছে এটা নিয়ে নানা কথা থাকলেও চিকিৎসকরা বলছেন, একটা ঘাটতি হয়ে গেছে এটা ধরা পড়েছে, চিহ্নিত করে সেটা পূরণ করতে হবে খুবই দ্রুততার সাথে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) বিশিষ্ট শিশু চিকিৎসক মো: আতিয়ার রহমান বলেন, শিশুকে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দেয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। টিকা দেয়া থাকলে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। তখন পুষ্টির ঘাটতি না থাকলে শিশু বেঁচে যেতে পারে হামের আক্রমণ থেকে।
সাধারণত সংক্রমণের দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর লক্ষণ দেখা দেয়, যদিও প্রায় ২৫ থেকে থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো ফুসকুড়ি, লাল বা গোলাপি ছোপযুক্ত দাগ সাধারণত মুখে বা কানের পেছনে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে শরীরের নিচের অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক দিন স্থায়ী হয়। লসিকা গ্রন্থি ফুলে যায় এবং ব্যথা হয়। অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে হালকা জ্বর, মাথাব্যথা, সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ (যেমন নাক দিয়ে পানি পড়া), চোখ লাল হওয়া বা চোখে ব্যথা এবং গাঁটে ব্যথা হয়।
জটিলতার দিক থেকে রুবেলা সাধারণত হালকা হলেও গর্ভাবস্থায় এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। যদি কোনো নারী গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকে সংক্রমিত হন, তবে গর্ভপাতের উচ্চ ঝুঁকি থাকে; এ ছাড়া শিশুর জন্মগত রুবেলা সিন্ড্রোম (সিআরএস) হতে পারে, যার ফলে বধিরতা, ছানি, হৃদপিণ্ডের ত্রুটি এবং বুদ্ধিগত অক্ষমতার মতো গুরুতর জন্মগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে আর্থ্রাইটিস (বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে) এবং খুবই বিরলভাবে মস্তিষ্কের প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস হতে পারে।
টিকা নেয়া হলে রোগটি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে টিকা নেয়া হলেও রোগটি হতে পারে। যেমন বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের যে হাম হচ্ছে এদের অনেকেই টিকা নেয়ার পর আক্রান্ত হয়েছে। আবার মায়ের টিকা নেয়া থাকলে শিশুর ৯ মাস বয়স পর্যন্ত হাম হয় না, কিন্তু এবার সেটাও হচ্ছে।
অধ্যাপক ডা: আবিদ হোসেন মোল্লা বলছেন, ভাইরাসটি শ্বাসনালী দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে এবং আক্রান্তের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এমন হলে আক্রান্তকে ব্যাকটেরিয়াসহ নানা রোগ আক্রান্ত করে। এরপরই শিশুর ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া হতে পারে। যখন যেসব রোগ দেখা দেয় সেই অনুসারে ওষুধ দিতে হয়। ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে নানা কিছু বের হয়ে যায়। শিশুর কানপাকা, মুখে ঘা এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহ হতে পারে। হাম হলে শিশুর ভিটামিন এ’র ঘাটতি হয়ে থাকে সেজন্য শিশুকে উচ্চ পাওয়ারের ভিটামিন এ দিতে হতে পারে। ডায়রিয়া হলে পরিমাণ মতো অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হতে পারে। তিনি বলেন, কোনো ওষুধই নিজে নিজে প্রয়োগ করা ঠিক নয়। চিকিৎসক ঠিক করবেন কোন ওষুধটি কী পরিমাণ এবং কতদিন খাওয়াতে হবে।
কুষ্টিয়ায় ২ শিশুর মৃত্য
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, কুষ্টিয়ায় হামের প্রদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। জেলায় গত এক মাসে হামে মৃত্যু হয়েছে ২ শিশুর। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে শতাধিক। হামে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই তবে সাবধানতা এবং সচেতনতা সেই সাথে চিকিৎসকের মতামতকে গুরুত্ব দিতে বলেছেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা।
জানা যায়- গত তিন মাস ধরে কুষ্টিয়ায় হামের প্রদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে দুইজনের মৃত্যুর খবরে হামে আক্রান্ত রোগীদের স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। ঠাণ্ডা বা জ¦রে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বারে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। তবে হামে আক্রান্তদের সাথে সাথে হাসপাতালে যোগাযোগ করার জন্য বলা হচ্ছে।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা: ফিরোজ আহমেদ জানান, হামে আক্রান্ত ডিসেম্বরে শুরু হয়। জানুয়ারিতে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয় ১৫ জন এর মধ্যে দুইজনের অবস্থা খারাপ হলে তাদের রেফার্ড করা হয় অন্যত্র। ফেব্রুয়ারিতে ভর্তি হয় ২০জন এদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা খারাপ হওয়াতে রেফার্ড করা হয়। তাদের মধ্যে একজনের মুত্যু হয়েছে। মার্চ মাসে আকর্ষিক দেড় শতাধিক হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ৪০জন শিশু ভর্তি ছিল এই হাসপাতালে। তিনি জানান, হামে আক্রান্ত শিশুদের বেশির ভাগেরই বয়স এক বছরের নিচে। হামের প্রদুর্ভাব সাধারণত শিশুর জ¦র, ঠাণ্ডা এবং পাতলা পায়খানার আলামত দেখা যায় কিন্তু এবার শিশুরা নিউমোনিয়া থেকে হামে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে শিশুর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় এবং ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। হামের প্রদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় এই হাসপাতালে বিশেষ খেয়াল রাখা হচ্ছে।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা: শেখ মোহাম্মদ কামাল জানান, হামের বিষয়ে মঙ্গলবার জরুরি সভা করেছি। সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছি। সব উপজেলা হাসপাতালে কমপক্ষে পাঁচটি বেড রেডি রাখা হয়েছে। নমুনা সংগ্রহ করার জন্য বলা হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রিপোর্ট করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তিনি জানান, ভেক্সিনের জন্য অধিদফতরে বলা হয়েছে। ভেক্সিন পৌঁছলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ফরিদপুরে একদিনে হাসপাতালে ভর্তি ১০ শিশু
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, ফরিদপুরে শিশুদের হামে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার একদিনে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ১০টি শিশুকে। এ অবস্থায় অভিভাবকদের চিকিৎসা বিধি মেনে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্নস্থান থেকে এ সময় বিশেষ করে নিউমোনিয়া ও হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য নিয়ে আসা হচ্ছে। ওয়ার্ডগুলোতে স্থান সঙ্কুুলান না হওয়ায় তাদের মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হামে আক্রান্ত হয়ে মঙ্গলবার একদিনে ফরিদপুরের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে ১০ শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে।
ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা: গণেশ কুমার আগারওয়াল জানান, হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ছয়টি শিশুকে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের একজনের শ্বাসকষ্ট বেশি হওয়ায় তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা: মাহমুদুল হাসান জানান, এ বছর এ পর্যন্ত ৪২ শিশুকে হামে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তবে কারো মৃত্যুর রেকর্ড নেই।
জীবনরক্ষাকারী টিকার তীব্র সঙ্কট
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, দেশে হামসহ ১০ ধরনের জীবনরক্ষাকারী টিকার তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। তবে এই সঙ্কট কাটাতে ইতোমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে ইউনিসেফকে ৬০৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। দ্রুতই এসব টিকা দেশে পৌঁছাবে এবং পৌঁছানোর পরপরই দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। গতকাল রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, দেশের যেসব এলাকায় হামের প্রকোপ বেশি, সেসব এলাকা (হটস্পট) চিহ্নিত করে শিশুদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি বৃদ্ধির বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, হামের এই আপদকালীন সময়ে আক্রান্ত শিশুদের বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করতে এবং অন্য শিশু রোগীদের সুচিকিৎসায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি হাসপাতালের সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে। হামের কোনো নতুন ভ্যারিয়েন্ট শিশুদের আক্রান্ত করছে কি না, তা নিশ্চিত হতে উচ্চপর্যায়ের তিনজন বিশেষজ্ঞ নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করেছেন।
এদিন বেলা সাড়ে ১১টায় সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস রামেক হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) নতুন তিনটি ভেন্টিলেটর হস্তান্তর করেন। এর আগে তারা হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধানদের সাথে মতবিনিময় এবং হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।
উল্লেখ্য, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সম্প্রতি আইসিইউ ভেন্টিলেটরের অভাবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার বিষয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন। মন্ত্রীর সেই বার্তার পরপরই স্বাস্থ্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মঙ্গলবার হাসপাতালটি পরিদর্শন করলেন।
রাজশাহীতে দুই শিশুর মৃত্যু
রাজশাহী ব্যুরো জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (৩০ মার্চ) সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকাল ৮টার মধ্যে তারা মারা গেছে। এ সময়ে আরো ১৬ শিশু হামের উপর্সগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
গতকাল দুপুরে ক্ষুদে বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছেন রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা: শঙ্কর কুমার বিশ্বাস। এতে তিনি জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৯৮ জন শিশু ভর্তি আছে। গত দুই দিনে মোট তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে।
রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা: সাহিদা ইয়াসমিন গণমাধ্যমকে জানান, হামে আক্রান্ত বেশির ভাগ শিশুর বয়স ছয় মাসের নিচে। ছয় মাসের নিচে শিশু আক্রান্তের হার ৭০ শতাংশের কাছাকাছি। যা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। এক বছরের ওপরে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা খুবই কম।
রামেক হাসপাতালে এ বছর হামের উপসর্গ নিয়ে ৩২ শিশু মারা গেল। এর মধ্যে পরীক্ষায় মাত্র একজনের শরীরে হাম পজিটিভ পাওয়া গেছে। বাকি ২৯ জনের নমুনা পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়নি, যদিও তারা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিল।



