সরকারের এক মাসে পুঁজিবাজারের অবনতি

সরকারের এক মাসে কোটি মানুষের পুঁজি বিনিয়োগের স্থান দেশের শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। মানুষের প্রত্যাশার আলো দেখাতে তো পারেনি, উল্টো সূচক হারানোয় তিন সেঞ্চুরির কাছাকাছি। দৈনিক লেনদেন ৭২৯ কোটি টাকা কমেছে। আর বাজারতারল্যে ১৯ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে বলে ঢাকা স্টকের হালনাগাদ তথ্যে জানা গেছে।

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition
  • সূচক হারিয়েছে ২৮৫ পয়েন্ট
  • লেনদেন কমেছে ৭২৯ কোটি টাকা
  • বাজারমূলধনে ১৯ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা কমেছে

বিএনপি সরকারের এক মাসে কোটি মানুষের পুঁজি বিনিয়োগের স্থান দেশের শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। মানুষের প্রত্যাশার আলো দেখাতে তো পারেনি, উল্টো সূচক হারানোয় তিন সেঞ্চুরির কাছাকাছি। দৈনিক লেনদেন ৭২৯ কোটি টাকা কমেছে। আর বাজারতারল্যে ১৯ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে বলে ঢাকা স্টকের হালনাগাদ তথ্যে জানা গেছে। আর সিডিবিএল বলেছে, পরিচালনযোগ্য বিও হিসাব থেকে শুরু করে বিও নতুন করে সেটআপ গত এক মাসে বাড়লেও ব্যবহার হয় না এবং ব্যালেন্সশূন্য বিওর পরিমাণও বেড়েছে। উল্লেখ্য, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। আর ২০ মার্চ সরকারের এক মাস পূর্তি হয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

ঢাকা স্টকের গত এক মাসের লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিএনপি সরকার গঠনের এক মাসে ডিএসইর মূল সূচক থেকে ২৮৫.৬২ পয়েন্ট হারিয়ে গেছে। গঠনের দিন ডিএসএক্স সূচক ছিল ৫ হাজার ৫৭০.৫৯ পয়েন্ট। উত্থানের চেয়ে পতনের জোরেই প্রায় ৩০০ পয়েন্ট খোয়া গিয়ে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ৫ হাজার ২৮৪.৯৭ পয়েন্টে ছিল। ডিএসই সূচক হারিয়েছে ৪৪.৫৬ পয়েন্ট গত এক মাসে। এক হাজার ১১৭.১৬ পয়েন্ট থেকে কমে এখন সূচকটি এক হাজার ৭২.৬০ পয়েন্টে। বাছাইকৃত কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচকটি হারিয়েছে ১১৪.৭৯ পয়েন্ট। ২ হাজার ১২৬.২৪ পয়েন্ট নিয়ে সরকার গঠনের দিন সূচকটি যাত্রা শুরু। এক মাসে কমে এখন দুই হাজার ১১.৪৫ পয়েন্টে অবস্তান করছে।

বেচাকেনায় খরা : বাজারে বেচাকেনা বা লেনদেন কমে যাওয়ার কারণেই বাজারমূলধনও কমেছে। ক্ষমতা গ্রহণের দিন ডিএসইতে ৪৭ কোটি ৩ লাখ ৪০ হাজার ৯৮টি শেয়ার ও স্টক হাতবদল হয়েছে এক হাজার ২২২ কোটি ৩০ লাখ ৪২ হাজার টাকায়। আর ক্ষমতার এক মাসের মাথায় লেনদেন তিন ভাগ কমে ৪৯২ কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার টাকায় বেচাকেনা হয়েছে ২৭ কোটি ৯৩ লাখ ৮৩ হাজার ২১২টি শেয়ার ও স্টক। ফলে এক মাসে শেয়ার ও স্টক লেনদেন গড়ে দৈনিক কমেছে ১৯ কোটি ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৮৮৬টি। আর টাকায় লেনদেন গড়ে কমেছে ৭২৯ কোটি ৮২ লাখ ৮২ হাজার টাকা। বাজারমূলধন ১৭ ফেব্রুয়ারি ছিল সাত লাখ ১৬ হাজার ৮৪২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এক মাসে চড়াই-উতরাইয়ে ১৯ হাজার ৩৮৬ কোটি ২৮০ লাখ টাকা কমে এখন বাজার মূলধন ছয় লাখ ৯৭ হাজার ৪৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকায় অবস্থান করছে।

এ দিকে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ বা সিডিবিএলের পরিসংখ্যানের তথ্য থেকে জানা গেছে, সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের দিন পরিচালনযোগ্য বেনিফিশিয়ারি ওনার হিসাব (বিও) হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ৯১৬টি। যেখানে পুরুষদের ১২ লাখ ৩৯ হাজার ৮৬৯টি এবং মহিলাদের তিন লাখ ৯০ হাজার ১১৩টি বিও। অন্য দিকে একক বিও ছিল ১১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৪৪টি এবং যৌথ বিও ৪ লাখ ৪০ হাজার ৩৩৮টি। আর স্থানীয় বিনিয়োগকারীর বিও ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ৮৮১টি এবং প্রবাসীদের বিও ছিল ৪৩ হাজার ১০১টি। ওই সময় ১২ লাখ ৩৪৪টি বিও হিসাবে শেয়ার ছিল। তবে ব্যবহার হয় না এমন বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৭৫৬টি। কোনো ধরনের ব্যালেন্স বা স্থিতি ছিল নাই এমন বিও হিসাবের সংখ্যা তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১৬টি। সেই সময় বিও হিসাব সেটআপ হয় ৮০ লাখ ১৮ হাজার ৬২টি।

ক্ষমতার এক মাসে ব্যবহার না হওয়া বিও হিসাব এবং ব্যালেন্স শূন্য বিও হিসাবের পরিমাণ বেড়েছে। অর্থাৎ গড়ে দেড় হাজার হবে। এক হাজার ৪৬৬টি বিও হিসাব নতুন করে অব্যবহারের তালিকায় যুক্ত হয়েছে এক মাসে। ক্ষমতা গ্রহণের দিন ছিল ৬৯ হাজার ৫৫৬টি বিও এবং গত ২৪ মার্চ বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার ২২টি। আর শেয়ার বিক্রি করে ব্যালেন্স শূন্য হয়েছে নতুন করে এক হাজার ৭১৫টি বিও। ক্ষমতা গ্রহণের সময় এমন সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১৬টি এবং গত ২৪ মার্চ তিন লাখ ৭৯ হাজার ৫৩১টিতে উন্নীত হয়।

সর্বশেষ হিসাব বলছে, ক্ষমতার এক মাসে পরিচালনযোগ্য বিও হিসাবের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ৪৮৭টি। যেখানে পুরুষদের ১২ রাখ ৪৪ হাজার ৪২৩টি এবং মহিলাদের তিন লাখ ৯১ হাজার ৩৯টি। ব্যক্তিগত ও যৌথ বিও হিসাবের সংখ্যারও বেড়েছে। ব্যক্তিগত বিও ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৪৪৩টি এবং যৌথ ৪ লাখ ৪১ হাজার ১৯টি। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ১৭ ফেব্রুয়ারীর ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ৮৮১টি থেকে বেড়ে একন ১৫ লাখ ৯২ হাজার ২৬৫টি এবং প্রবাসীদের বিও ৪৩ হাজার ১০১টি থেকে বেড়ে ৪৩ হাজার ১৯৭টিতে উন্নীত হয়েছে। বিও হিসাব সেটআপের সংখ্যা বেড়ে এখন ৮০ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৩টিতে উন্নীত হয়েছে।

সাধারণ ও ক্ষুদ্রবিনিয়োগকারীরা বলছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণে শেয়ারবাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। তবে এখনো সার্বিকভাবে বিনিয়োগকারীরা এখনো বড় লোকসানের মধ্যে রয়েছেন। দীর্ঘ মন্দার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী এখনো ৭০ শতাংশ লোকসান বহন করছেন। এসব বিনিয়োগকারী হয়তো এই লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন না। তবে বাজার টানা কিছুদিন ইতিবাচক থাকলে এবং নতুন করে প্রাইমারি শেয়ার আসলে সেখানে বিনিয়োগের মাধ্যমে লোকসান কিছুটা কমে আসবে।

বাজারবিশ্লেষকরা যা বলছেন : ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলামের কাছে মার্কেটের এই পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ইরান-ইসরাইল এই অনাকাক্সিক্ষত যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের পুঁজিবাজারকে থমকে দিয়েছে। তবে অন্যান্য দেশের মতো আমরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হইনি। তিনি বলেন, নতুন সরকার আসার পরে একটা ভালোর দিকে যেতে শুরু হয়েছিল। কিন্তু আনফরচুনেটলি গত তিন সপ্তাহে ইরান যুদ্ধ কিন্তু ব্যাডলি এফেক্টেড আমাদের। আমরা বেঁচে গেছি, যেহেতু ঈদ ছিল প্রচুর রেমিট্যান্স এসেছে।

তিনি বলেন, পাকিস্তানের মতো দেশে স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, যদিও রিকভারি স্টেজে কিন্তু ইনিশিয়াল তাদের ফলটা অনেক বেশি ছিল। ইন্ডিয়াতে তো কারেন্সি প্রায় ১০ শতাংশ পতন করে গেছে। আমরা এখনো কোনোভাবে টিকে আছি। তিনি বলেন, আমরা আশা করব যে এই পরিস্থিতি থেকে আমরা হয়তো সপ্তাখানেকের মধ্যে কিছুটা রেজাল্ট দেখতে পাবো। যদি দেখতে পাই তাহলে আমরা মার্কেটের একটা মোমেন্টাম আশা করতে পারি।