ফারাক্কা চুক্তি নবায়ন আপাতত অনিশ্চিত

নির্বাচন কূটনৈতিক টানাপড়েনে ঝুলে আছে গঙ্গার পানিবণ্টন আলোচনা

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে পানি চুক্তি দীর্ঘদিন ধরেই কেবল কারিগরি বা পরিবেশগত ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বড় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েন, আস্থার ঘাটতি এবং সামনে অত্যন্ত স্বল্প সময় থাকায় ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

আবুল কালাম
Printed Edition

ফারাক্কা চুক্তি নবায়ন আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আগামী ডিসেম্বরেই ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এর নবায়নে সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেনি। ফলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে এই চুক্তি নবায়নের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, আসন্ন ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে পানি চুক্তি দীর্ঘদিন ধরেই কেবল কারিগরি বা পরিবেশগত ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বড় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েন, আস্থার ঘাটতি এবং সামনে অত্যন্ত স্বল্প সময় থাকায় ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পানি ও সীমান্ত ইস্যুতে ভারতের সাথে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয়নি। তিস্তা, ফেনী, মুহুরীসহ অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর মতো গঙ্গার পানিবণ্টনও রাজনৈতিক সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে এই সংবেদনশীল বিষয়ে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকি সরকার নিতে চাইছে না।

বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) ও সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, ফারাক্কা চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি নবায়নের আগে বিস্তৃত আলোচনা, কারিগরি পর্যালোচনা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। অথচ নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যস্ততা এতটাই বেড়েছে যে এ বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, আসন্ন নির্বাচনের আগে ফারাক্কা চুক্তি নবায়ন একেবারেই অনিশ্চিত।

এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য যে, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গত বছর পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘২০২৬ সালের পয়লা জানুয়ারি আমরা তিস্তা প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারব।’ তবে বাস্তবে তিস্তা প্রকল্প যেমন অগ্রগতি পায়নি, তেমনি ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন নিয়েও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। গতকাল এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও পানিসম্পদ উপদেষ্টার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

বিরাজমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাঈদ গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো নিয়ে যোগাযোগ রক্ষার জন্যই যৌথ নদী কমিশন গঠিত। অন্যান্য বিষয়ে যোগাযোগ থাকলেও ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। এ বছরের ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন করে নবায়নের জন্য এখনো কোনো ফরমাল কার্যক্রম শুরু হয়নি। নির্বাচনের আগে এটি সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। কারণ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়সাপেক্ষ।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই ধরনের চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনা প্রয়োজন। যখন এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হবে, তখন তা জনসমক্ষে জানানো হবে।’

পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়মতো উদ্যোগ না নেয়ায় বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে পড়ছে। ইমেরিটাস অধ্যাপক ও টেকসই উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ড. আইনুন নিশাত দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ভারতের সাথে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের প্রস্তুতি অনেক আগেই শুরু করা উচিত ছিল। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবুও বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর। সম্পর্ক যদি ইতিবাচক থাকে, তাহলে দেরিতে শুরু হলেও চুক্তি নবায়নে খুব বেশি সময় নাও লাগতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘সামনে যে সরকারই আসুক, তাদের উচিত হবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া। রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নত হলে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন জটিল হবে না।’

বিশ্লেষকদের মতে, ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন শুধু পানিবণ্টনের প্রশ্ন নয়; এটি উত্তরবঙ্গের কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং নদীভাঙন সমস্যার সাথেও সরাসরি যুক্ত। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গায় পানিপ্রবাহ কমে গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা ও কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচসঙ্কট, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পতন এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ৬ মার্চ ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন নিয়ে কলকাতায় বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে চুক্তি নবায়নে একমত হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাস্তবায়নের পথে আর এগোয়নি।

ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রায় ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ প্রতি ১০ দিনে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার কিউসেক এবং ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পানি পাবে। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন বিলম্বিত হলে ভবিষ্যতে এটি শুধু পানি নয়, বরং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এ বিষয়ে কত দ্রুত এবং কতটা দৃঢ় অবস্থান নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।