নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- মধ্যস্থতায় অনীহা কাতারের
- স্থল অভিযানে শীর্ষ জেনারেলদের আপত্তি
- দুই দিন যুদ্ধবিরতির মার্কিন প্রস্তাবের জবাবে তুমুল হামলা ইরানের
ইরানের সাথে ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি চেয়ে গত ২ এপ্রিল তৃতীয় এক দেশের মাধ্যমে প্রস্তাব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু তেহরান তাতে রাজি হয়নি। এ সম্পর্কে অবগত এক সূত্রের বরাত দিয়ে এ খবর দেয় আধা-সরকারি ইরানি বার্তা সংস্থা ফারস। ‘গত ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র এক বন্ধু দেশের মাধ্যমে ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও এই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার পর এ প্রস্তাব আসে,’ বলেছে সূত্রটি।
ইরান ওই প্রস্তাবের কোনো লিখিত জবাব দেয়নি, তার বদলে ভারী আক্রমণ অব্যাহত রেখে ‘মাঠেই’ উত্তর পৌঁছে দিয়েছে, জানায় বার্তা সংস্থাটি। কোন ‘বন্ধু’ দেশ এ প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল, তা জানায়নি তারা। “যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা তীব্রতর হয়েছে, বিশেষ করে কুয়েতের বুবিয়ান দ্বীপে মার্কিন সেনা ডিপোতে হামলার খবরের পর,” বলেছে সূত্রটি।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল আকাশপথে ইরানে হামলা শুরু করার পর তেহরানও উপসাগরের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পাল্টা আক্রমণে নামে। মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা প্রাণ হারালেও তেহরান প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে প্রায় সমান তালেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মুজতাবা খামেনি দেশটির শীর্ষ নেতা হলেও তাকে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
তেহরানের পাল্টা হামলায় ইসরাইল ও তাদের দখলে থাকা এলাকার সামরিক স্থাপনাগুলো এবং উপসাগরের বিভিন্ন দেশের মার্কিন সেনাঘাঁটি ও স্থাপনারও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি খবর পাওয়া যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে এ সংঘাত এরই মধ্যে বিশ্বের জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। দেশে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দামও বাড়ছে।
ইরানে একদিনে দুই মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত, পাইলট নিখোঁজ : এদিকে ইরানের সেনারা জানিয়েছে, তারা তাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের ওপর এবং হরমুজ প্রণালীর আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর দু’টি যুদ্ধবিমানকে ভূপাতিত করেছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর খাতামুল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদরদফতর শুক্রবার জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। পরে ইরানের সামরিক বাহিনী একটি এ-১০ উড়োজাহাজকেও নিশানা করার কথা জানায়, যেটি উপসাগরে বিধ্বস্ত হয়েছে।
বিধ্বস্ত এ-১০ বিমানের পাইলট নিরাপদে অবতরণ করতে পেরেছেন বলে া কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। কিন্তু ভূপাতিত এফ-১৫ বিমানের এক পাইলটের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা অজানা। একাধিক মার্কিন গণমাধ্যম বলেছে, যুদ্ধবিমানটির এক ক্রুকে মার্কিন বাহিনী শনাক্ত ও উদ্ধার করতে পারলেও অন্যজন এখনো নিখোঁজ।
বিশ্লেষকদের মতে, নিখোঁজ মার্কিন পাইলটের বিষয়টি যুদ্ধের একটি সংবেদনশীল মোড় তৈরি করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করতে পারে এবং সংঘাতকে আরো দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেছেন, যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলেও তা তেহরানের সাথে আলোচনার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। “না, একেবারেই না। এটা যুদ্ধ, আমরা যুদ্ধের মধ্যে আছি,” বলেছেন তিনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ এবং প্যারাস্যুট সংযুক্ত একটি ইজেকশন সিটের মতো কিছু একটার ছবি দেখানো হয়েছে।
যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ‘বারবার ইরানে যুদ্ধ জয়ের কৃতিত্ব দাবি করা’ ট্রাম্পকে টিটকারি মেরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেন। “ইরানকে টানা ৩৭ বার হারানোর পর, তাদের শুরু করা কৌশলবিহীন এই অনন্য যুদ্ধ এখন ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ থেকে নেমে ‘কেউ কী আমাদের পাইলটকে পেয়েছেন? প্লিজ?’ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে,” লেখেন তিনি। বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার প্রসঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে পেন্টাগন এবং মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বেশির ভাগ অংশে সামরিক কর্মকাণ্ড দেখভালের দায়িত্বে থাকা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এর আগে ইরানিরা কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি জানালে, সেন্টকম প্রায় সাথে সাথেই সেসব দাবি উড়িয়ে দিয়ে বিবৃতি দিতো, বলছে আলজাজিরা।
এফ-১৫ ভূপাতিত করার পর ইরানি কর্মকর্তারা বিমানটির বেঁচে থাকা ক্রু’কে খুঁজে বের করতে বেসামরিক নাগরিকদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে। কোহগিলুয়ে ও বোয়ের-আহমদ প্রদেশের গভর্নর বলেছেন, যারাই ওই ক্রু’কে ধরতে পারবে, তাদেরকে ‘বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হবে’। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক রাজনীতিকও যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন এবং মার্কিন বাহিনীর প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
“বিপজ্জনক এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমানের সব ক্রু এবং তাদের উদ্ধারে যারা কাজ করছেন তাদের সবার নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রার্থনা করছি,” এক্সে দেয়া পোস্টে লিখেছেন সেনেটের সংখ্যালঘু অংশের নেতা ডেমোক্র্যাট চাক শুমার। যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতে তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। এগুলো ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ারে’ ভূপাতিত হয়েছে বলে পরে দাবি করেছে তারা। গত মাসে ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট ভূপাতিত হয়ে সেখানে থাকা ছয় ক্রু’র সবাই নিহতও হয়।
এর বাইরেও ইরান তাদের আকাশে ওড়া ডজনের বেশি মার্কিন ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে। শুক্রবার মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার খবরের পর সেটির অনুসন্ধানে নামা হেলিকপ্টারও ভূপাতিত করার দাবি করেছে তেহরান। পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাংক নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো, মার্কিন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মাইলস ক্যাগিনস বলেছেন, যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়া মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য খুবই ‘গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা’। “যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে বিমান হামলা কিংবা সাইবার হামলায় আকাশ প্রতিরক্ষায় থাকা ইরানের মূল অস্ত্রশস্ত্রগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো বহনযোগ্য মানবচালিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অটুট আছে, সম্ভবত কেউ ওই ধরনের ব্যবস্থাপনার সাহায্যেই এই এফ-১৫টি ভূপাতিত করেছে,” বলেছেন তিনি।
মধ্যস্থতায় অনীহা কাতারের : তুরস্ক, মিসর এবং কাতার দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে এলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কাতার এই মুহূর্তে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করছে। মার্কিন ও অন্যান্য আঞ্চলিক দেশগুলো কাতারকে চাপ দিলেও তারা এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানের সক্ষমতা ধুলোয় মিশিয়ে দেয়ার দাবি করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। গোয়েন্দা মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চার এবং কামিকাজে ড্রোনের প্রায় অর্ধেকই এখনো অক্ষত এবং ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং অনড় অবস্থান থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইরান বর্তমানে আলোচনার চেয়ে মাঠের লড়াইকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার হুমকির মুখেও ইরানের এই অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থল অভিযানে শীর্ষ জেনারেলদের আপত্তি : ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের স্থল অভিযান চালাতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া নির্দেশ দেশটির এক ডজন জ্যেষ্ঠ জেনারেল অমান্য করায় যুক্তরাষ্ট্রে নজিরবিহীন সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউজ এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে ইরানে অভিযান ঘিরে বিভাজন তৈরি হওয়ায় ওই সঙ্কট তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যানসহ ১২ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে; যা আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসে সামরিক নেতৃত্বে সবচেয়ে বড় চাকরিচ্যুতির ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে। জেনারেলদের এই অস্বীকৃতি কি কোরনা ‘অবৈধ নির্দেশ’ প্রত্যাখ্যানের আইনি পদক্ষেপ, নাকি এটি সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণকে হুমকিতে ফেলার এক অবাধ্যতা, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন।
এই নির্দেশের বিরোধীরা মনে করছেন, বিশ্বজুড়ে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে; পেন্টাগনের এমন নীতির ক্ষেত্রে দেশটির শীর্ষ সেনা জেনারেলরা প্রয়োজনীয় বাধা হিসেবে কাজ করছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, অভিজ্ঞ সমরকৌশলীদের সরিয়ে রাজনৈতিক অনুগতদের নিয়োগ দিলে মধ্যপ্রাচ্যে এক বিশৃঙ্খল এবং অপ্রয়োজনীয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হতে পারে।



