- থানাগুলোতে নেই আলাদা ইউনিট
- জেলাপর্যায়ে অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তার অভাব
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সাথে পাল্লা দিয়ে অপরাধীচক্র তাদের কৌশল বদলে ফেলছে, যা সাধারণ মানুষকে চরম ব্যক্তিগত ও আর্থিক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তবে রাজধানীসহ সারা দেশে সাইবার অপরাধ মনিটরিং ও প্রতিরোধে পুলিশ এখনো কাক্সিক্ষত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি বলে মনে করছেন সাইবার বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, পর্যাপ্ত জনবল, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের অভাবে অপরাধীরা সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, বিভিন্ন জেলার সদস্যদের ঢাকায় এনে সাইবার অপরাধ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এবং তাদের প্রাথমিকভাবে কাজের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার অপরাধ তদন্তে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও আইনি কাঠামোয় বাংলাদেশ এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তৃণমূল পর্যায়ে আলাদা ইউনিট, ডিজিটাল ল্যাব ও নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় ঢাকার বাইরেও সাইবার অপরাধ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে থানাভিত্তিক সাইবার পুলিশিং চালুর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান জনবল দিয়ে আপাতত কার্যক্রম চালানো সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে জনবল বাড়ানো জরুরি হবে।
সাইবার সক্ষমতা বাড়ানোর কথা জানিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলেছে, অনলাইন প্রতারণা, ডিজিটাল হয়রানি, মানহানি ও জুয়াসহ প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবেলায় সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আধুনিক ল্যাব, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং ২৪ ঘণ্টার রেসপন্স টিমের মাধ্যমে নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নারী ও কিশোরদের অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
ডিএমপির গোয়েন্দা-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হ্যাকিং এবং বিভিন্ন অনলাইন জালিয়াতির তদন্তে তাদের টিম নিয়মিত কাজ করছে। অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে তদন্ত শুরু করা হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরো বাড়ানো গেলে কাজের গতি ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতির কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অপরাধীদের চেয়ে অন্তত এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে। দ্রুত তদন্ত ও সমাধান নিশ্চিত করা গেলে ভুক্তভোগীদের আস্থা বাড়বে এবং অভিযোগ করার প্রবণতাও বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরো বলেন, অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক কারণে অভিযোগ করেন না বা প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে ব্যর্থ হন, যা তদন্তে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পুলিশের আইসিটি কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা জরুরি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ডিকোডস ল্যাব লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, অতীতের তুলনায় সাইবার অপরাধ তদন্তে অগ্রগতি হলেও দক্ষ জনবলের ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সিআইডি, ডিবি ও সিটিসির সাইবার ইউনিটগুলো নতুন প্রযুক্তি ও টুলস ব্যবহার করে কাজ করছে, তবে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষ জনবল সঙ্কটের কারণে দ্রুত প্রতিকার দেয়া সবসময় সম্ভব হয় না। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবেলায় আধুনিক অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল ও কার্যকর কৌশল গ্রহণই হতে পারে টেকসই সমাধান।



