গঙ্গা চুক্তি নবায়ন ও তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর মূল চ্যালেঞ্জ

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফারাক্কা চুক্তি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা- এসব পুরনো ইস্যু নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরো সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • ভারতের সাথে নতুন চুক্তি হলে ভালো, না হলে বিপদ : আইনুন নিশাত
  • আলোচনার ভিত্তিতেই চুক্তি নবায়ন করতে হবে : মাশফিকুস সালেহীন
  • চুক্তি নবায়ন ইস্যুতে ২ দেশের আলোচনা এখনো শুরু হয়নি : যৌথ নদী কমিশন
  • আলোচনায় থাকবে সীমান্ত হত্যা, তিস্তা চুক্তি, টিপাইমুখ বাঁধ, ফেনীর মুহুরিচর

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফারাক্কা চুক্তি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা- এসব পুরনো ইস্যু নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরো সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। একই সাথে চলতি বছরের শুষ্ক মৌসুমে পানিবণ্টনের কার্যকারিতাও শেষ হবে মে মাসে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো দিল্লির সাথে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, জ্বালানি সহযোগিতা এবং পারস্পরিক আস্থার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানান, ভারত থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আমদানি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় থাকলে জটিল অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে অংশ নিতে তিনি সফরে যাচ্ছেন এবং সেখানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সাথে বৈঠক হতে পারে। সীমান্ত হত্যা থেকে শুরু করে পানিবণ্টন- সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই আলোচনায় থাকবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই বৈঠকে মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু প্রাধান্য পাবে- ফারাক্কা চুক্তি নবায়নে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ নিশ্চিত করা, তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা কমানো, ভিসাকার্যক্রম স্বাভাবিক করা এবং জ্বালানি সহযোগিতা বৃদ্ধি। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি ও নিশ্চয়তাপূর্ণ চুক্তির দিকে জোর দিচ্ছে।

তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো শুষ্ক মৌসুমে প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ছে। ফলে কৃষি, নৌপরিবহন এবং পরিবেশগত ভারসাম্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ নতুন কাঠামোতে চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছে। প্রয়োজনে বিকল্প কৌশলের কথাও ভাবা হচ্ছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গীকারেও প্রতিফলিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে এবং এটি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান বণ্টন (৫০-৫০) চাইলেও এ নিয়ে অগ্রগতি সীমিত। পানিবিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, গঙ্গা চুক্তির আওতায় পানি পাওয়া যাবে ৩১ মে পর্যন্ত। এরপর শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। তার মতে, ‘নতুন করে নিরাপদ ও কার্যকর চুক্তি করতে পারলে ভালো, না হলে বাংলাদেশ সঙ্কটে পড়তে পারে।’ তিনি আরো বলেন, এ ধরনের চুক্তি একতরফাভাবে সম্ভব নয়; উভয় দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

তিনি অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। একই সাথে জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, কতটুকু পানি অ্যাভেলেবল আছে তা ভারত ও বাংলাদেশের মিলে নেগোসিয়েশন করে এই চুক্তিটা নবায়ন হবে। ৩০ বছর আগে একটা তথ্য আছে পানি কতটুকু অ্যাভেলেবল। কার কতটুকু প্রয়োজন। সেগুলোর ওপর ভিত্তি করেই আগে চুক্তিগুলো করা হয়েছিল। এখন রিনিউ করতে একইভাবে দুই দেশের দুটো দল মিলে বসে বাইল্যাটারালি নিয়ে আলাপ করবে। তারা তথ্য বিনিময় করবে, আলাপ করবে। তারপর পানিবণ্টনের রুল তৈরি করবে। এটাই প্রত্যাশা আমার।

আমরা যদি আশানুরূপ পানি না পাই তা হলে কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সেগুলো তো আগে থেকে বলে বলা ঠিক না, কারণ আমাদের তো এই পানির প্রয়োজন আছে অনেক। আমাদের লবণাক্ততার জন্য প্রয়োজন আছে, আমাদের ওখানে যে নদীগুলো যেসব ভরা মানে পলি পড়ে ভরা উঁচু হয়ে যাচ্ছে। বেশি পানি পেলে হয়তো ওগুলো অনেক কমে যেত। আমাদের অনেক ধরনের প্রয়োজন আছে। এই প্রয়োজনগুলো তো আমরা আগেও বলেছি তো এখন দুই দেশ মিলে আলোচনা করে বের করতে হবে। তিনি বলেন, পানিটাকে এটা তো একদম স্ট্রেট ফরওয়ার্ড না আলোচনা করেইতো বণ্টন করতে হবে। আমাদের তো সবসময় পজিটিভ মাইন্ডসেট। এটা কিভাবে আমরা একটা শেয়ারিং অ্যাগ্রিমেন্টে আসতে পারি, এই বিষয়টাই দুই দেশের আলোচনার ভিত্তিতে চুক্তিটা নবায়ন করতে হবে। এখন দুই পক্ষ মিলে বসতে হবে। বসে ডাটা তথ্য এগুলো আদান প্রদান করে তারপর দুই পক্ষ মিলে নেগোশিয়েট করে আমাদেরকে চুক্তিতে আসতে হবে। চুক্তিতে কী হচ্ছে আগাম কিন্তু বলা যাচ্ছে না।

যৌথ নদী কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত কারিগরি বৈঠকে পানি পরিমাপ ও তথ্য বিনিময় অব্যাহত থাকলেও চুক্তি নবায়ন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। তবে চলতি বছরের শুরুতে যৌথ দল ফারাক্কা এলাকা পরিদর্শন করেছে এবং পানিপ্রবাহ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি কমে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, মৎস্য, বনজ ও নৌপরিবহনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এর অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার বলে ধারণা করা হয়।

যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মো: আনোয়ার কাদির নয়া দিগন্তকে বলেন, গঙ্গা চুক্তি অনুসারে প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশের চার সদস্যের দল এবং ভারতের চার সদস্যের দলের উপস্থিতিতে প্রতিদিন চারবার গঙ্গার পানি মাপা হয়, এবারো এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। এ চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর শেষ হচ্ছে। চুক্তি নবায়ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এখনো শুরু হয়নি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন বলেন- বাংলাদেশ ভারতের জন্য শুধুমাত্র আরেকটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়। এটি ভারতের সাথে দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত ভাগ করে, গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সংযোগ বহন করে এবং নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রিক বৈধতা ভারতের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থানের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পৃক্ত। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রতিক্রিয়া মূল্যায়িত হবে কৌশলগত সুবিধা বা স্বল্পমেয়াদি লাভের নিরিখে নয়; বরং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, আইনের শাসন এবং প্রতিবেশী হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণের আলোকে।