সাক্ষাৎকার : এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রতিরক্ষা নিয়ে জাতীয় নীতিমালা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে

প্রতিরক্ষা নিয়ে জাতীয় নীতিমালা করে ফেলা জরুরি। এ ব্যাপারে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সে উদ্যোগ চূড়ান্তভাবে সফল বা পরিণতি লাভ করেনি। একটা সশস্ত্র বাহিনীকে তৈরি করবেন কেন, কোন পরিপ্রেক্ষিতে সে জন্যে প্রতিরক্ষা নিয়ে জাতীয় নীতিমালা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, প্রতিরক্ষা নিয়ে জাতীয় নীতিমালা করে ফেলা জরুরি। এ ব্যাপারে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সে উদ্যোগ চূড়ান্তভাবে সফল বা পরিণতি লাভ করেনি। একটা সশস্ত্র বাহিনীকে তৈরি করবেন কেন, কোন পরিপ্রেক্ষিতে সে জন্যে প্রতিরক্ষা নিয়ে জাতীয় নীতিমালা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর বিস্তৃৃতি, অস্ত্র ক্রয়, অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি, প্রতিরক্ষা যদি ডিফেন্সিভ হয় তাহলে কী ধরনের অস্ত্র প্রয়োজন, লোকবল কেমন লাগবে, কতদিনের জন্যে সে লোকবলকে সক্ষম করে তুলবেন, অস্ত্রের বাইরেও প্রতিরক্ষা উপকরণ মজুদ রাখা, জালানি কতদিনের জন্যে মজুদ রাখবেন, খাদ্য থেকে শুরু করে অনেক বিষয়, যা নির্ভর করছে সশস্ত্র বাহিনীকে আপনি কতদিনের জন্যে ডিফেন্ড করতে বলবেন। পরিবর্তিত বিশ্বে সামরিক শক্তির প্রচলিত ধারণা, ব্যয় কাঠামো, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সবকিছু পাল্টে গেছে।

নয়া দিগন্ত : কিন্তু যুদ্ধতো খুবই ব্যয়বহুল একটা বিষয়

এম সাখাওয়াত হোসেন : হ্যাঁ খুবই এক্সপেন্সিভ। আপনি এক লাখ সেনা তৈরি করে তার হাতে মেশিনগান দিয়ে দিলেন, রকেট লাঞ্চার তুলে দেবেন, দ্যাট ইজ ওভার। টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরির যুদ্ধ আর আগের মতো হচ্ছে না। আমেরিকা যেভাবে যুদ্ধ করছে সেটা টুয়েন্টি সেঞ্চুরির যুদ্ধের আদলে সব কিছু সেট করা। কিন্তু ইরান যেটা দেখাচ্ছে মানে টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরির যুদ্ধ, এগুলো নিয়ে ম্যাসিভ স্টাডি প্রয়োজন ফোর্স লেভেলে এবং ন্যাশনাল লেভেলেও। এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলে কী ধরনের একটা স্ট্রাটেজি প্রয়োজন তা বুঝা যাবে। স্ট্রাটেজি হলে কী ধরনের ডিভিশন গড়ে তোলা প্রয়োজন দেখা যাবে। আর প্রতিরক্ষা নিয়ে জাতীয় নীতিমালা তা নয় যে, নীতিমালা করে দিলাম আর আমার ২০ বছর খবর রইল না। ইউ হ্যাভ টু রিভাইস। এগুলো নিরন্তর আপডেটের বিষয়। কারণ প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পাল্টে যাচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : ভবিষ্যতে যুদ্ধতো তথ্যনির্ভর ও দ্রুতগতির হয়ে পড়ছে

এম সাখাওয়াত : একেবারেই। অ্যাবসুলেইটলি। ইউ হ্যাভ টু ডেভলভ নিউ টেকনিক। নতুন প্রযুক্তি আপনাকে করায়ত্ত করতেই হবে।

নয়া দিগন্ত : প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল বলে আমদানিকৃত অস্ত্র দিয়ে কি যুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভব?

এম সাখাওয়াত : অস্ত্র আমদানি করে আপনি কিভাবে টিকে থাকবেন। ইরান ছাড়াও ইউক্রেনকে দেখেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে অস্ত্র সহায়তার জন্যে বিভিন্ন দেশ ও দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। তবুও পশ্চিমা দেশগুলো তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিচ্ছে। তারা নিজেরাও সস্তায় ড্রোন তৈরি করে রুশ ড্রোনকে ঘায়েল করতে পেরেছে। তাদের সাপ্লাই লাইন ওপেন। আমাদেরও সবকিছু নিজস্ব প্রযুক্তি ছাড়া হবে না। টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরিতে আপনি কিভাবে যুদ্ধ মোকাবেলা করবেন; ইউক্রেন এবং ইরান যুদ্ধ আমাদের জন্যে লেসেন। শেখার আছে অনেক কিছু। ইরান জানে সেন্টার অব গ্রাভিটিটা কী। মোস্ট স্ট্রাটেজিক প্লেস হরমুজ সম্পর্কে ইরান আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। হরমুজ আটকে দিলে ইকোনমিক ব্যাটলে তারা জিতবে তা জানত। আমেরিকা ইনভেড করতে চাইলেও ইনভেশন এত সোজা না। হরমুজের মতো এতটুকু জায়গার ভেতরে হোস্টাইল একটা অবস্থায় ট্রুপ নামানো এক ভিন্ন কঠিন পরিস্থিতি। তা ছাড়া ইরান জানে এটা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ, আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নাই। আইদার দে উইল ডু ইট অর ডাই। ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড ভেবেছিল ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ হবে, রেজিম চেঞ্জ হবে কিন্তু এত মানুষ মারা যাচ্ছে, এত ডিসটরশন হচ্ছে; বরং ইরানিরা আরো ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়ছে। ইরানের ইতিহাস, ঐতিহ্য জাতিটিকে অনেক বেশি ন্যাশনালিস্ট করে রেখেছে।

নয়া দিগন্ত : ইরানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে আমরা তো অনেক পিছিয়ে?

এম সাখাওয়াত : জ্বি, এটা হল আফসোসের কথা। অনেক পিছিয়ে আছি। আমিও যখন অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে ছিলাম, যদিও অন্য মন্ত্রণালয়, অনেক কথাবার্তা হয়েছে আমাদের কিন্তু অল্প সময়ে তো বেশি কিছু করা যায় না। বাংলাদেশে প্লানিং করতে করতে চলে যায় একটা রেজিম। সেটাকে বাস্তবায়ন করতে আরো সময় লাগবে। আমরাতো শুরুই করিনি। টেকনোলজির দিকে আমরা যাইনি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জেনারেল মাস্টার্স করছি। আমরা ওই দিকে যাইনি।

নয়া দিগন্ত : কোত্থেকে শুরু করতে পারি? যেমন প্রতিরক্ষা নীতিমালা নিয়ে কথা হচ্ছে

এম সাখাওয়াত : উই হ্যাভ টু রিভাইজ এভরিথিঙ্ক। গতানুগতিক যেভাবে চলছি সেখান থেকে আমাদের তাৎক্ষণিক উন্নতি করতে হবে। এনটায়ার সিস্টেম পরিবর্তন তো আর একদিনে হবে না। দুই, চার, পঁাঁচ বছরে হবে না। পরিকল্পনা নিতে হবে। অ্যাজ সুন অ্যাজ উই ক্যান স্টার্ট, এটুকু বলতে পারি।

নয়া দিগন্ত : আপনি তো ইরান সফর করেছেন। ওরা নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিভাবে গড়ে তুলেছে তার কিছুটা আভাস দেয়া যায়।

এম সাখাওয়াত : দেখুন, সিভিলাইজেশন ম্যাটারস। সভ্যতা একটা জাতিকে অনেকখানি উদ্বুদ্ধ করে। গর্ব এনে দেয়। ৫-৭ বছর আগে ইরানে যখন গিয়েছিলাম, তখন দেশটিকে চারদিক থেকে নিষেধাজ্ঞা চেপে বসেছিল। মোল্লাতন্ত্রের ইমপ্রেশন ছিল। কিন্তু ইরানে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম দেখে যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি লেখাপড়া করে। প্রায় ৫২ শতাংশ। চিকিৎসাবিদ্যা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মেয়েরা বেশি পারদর্শী। ৯২ শতাংশ নারী হাইলি এডুকেটেড। পুরুষদের ৯০ শতাংশ উচ্চ শিক্ষিত। পিএইচডি, মাস্টার্সে এমনভাবে পড়াশুনা হচ্ছে; যাতে তারা তাদের নিজেদের বিজ্ঞানী তৈরি করতে পেরেছে। নিজস্ব প্রযুক্তি আয়ত্তে এনেছে। যে বাসে চড়ে যাচ্ছিলাম সেটা মার্সিডিজবেঞ্জ ব্রান্ডের। শাহের আমলের সে ফ্যাক্টরি আপগ্রেড করা হয়েছে। অ্যাবসুলেউটলি নলেজ বেসড সোসাইটি এবং অর্থনীতি আরো ফ্লারিশ করতে পারত স্যাংশন না থাকলে। আফগানিস্তানে তালেবানরা বামিয়ান হেরিটেজকে নষ্ট করেছে; কিন্তু ইরানে তেমন ঘটেনি। সাইরাস, পার্সোপলিস থেকে শুরু করে ইস্পাহানে ইসলামী সভ্যতার স্মারকগুলো বিউটিফুলি প্রিজার্ভ করেছে। প্রাসাদে পারস্যে সে সময় বাদশা আব্বাসের সাথে মোঘল বাদশাহ হুমায়ুনের পেইন্টিংগুলো এখনো রয়েছে। ঐতিহ্য ধরে ইরানিরা বসে থাকেনি, আগামী দিনের প্রযুক্তিও রপ্ত করেছে।

নয়া দিগন্ত : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আক্রমণের পর যুদ্ধের ব্যয় কাঠামো ও ধারণা কি ইরান পাল্টে দিচ্ছে?

এম সাখাওয়াত : একটা এডুকেটেড সোসাইটিতে সামরিক বাহিনীতে যারা কাজ করছে তারাও তো হাইলি এডুকেটেড ও পারদর্শী। গত ৫০ বছরে পুরো পরিবর্তন হয়ে গেছে। দে হ্যাভ লার্ন লেসেন। ইরানের আশপাশে ইরাক, সিরিয়ায় যে ঘটনা ঘটেছে, তারা জানত ইরানের ওপর পশ্চিমা হামলা হবেই। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো ব্যবহার হবে। এখনো যে ট্র্যাকটিসটা নিয়েছে তা বহুবছর ধরে তারা রপ্ত করেছে। ইরানি সেনাবাহিনীতে কোনো সেক্টর কমান্ডার নাই। সেন্ট্রাল কমান্ড নাই। বিকেন্দ্রীকরণ করে প্রত্যেকটা প্রদেশে বিকল্প কমান্ড করেছে। প্রত্যেকটা প্রদেশের যুদ্ধ কৌশলও আলাদা। দে ডোন্ট নিড সেন্ট্রাল কমান্ড। আক্রমণে আঘাতে নেতৃত্ব হারালেও বিকল্প নেতৃত্ব দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : পশ্চিমা ব্যয়বহুল মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র, জঙ্গি বিমান, যুদ্ধজাহাজের হামলার বিপরীতে সস্তা ড্রোন, পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কিভাবে ইরানের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে?

এম সাখাওয়াত : এটা সম্ভব হয়েছে বিকজ দে হ্যাভ লট অব সাইন্টিস্ট। বাইরে থেকে লোক, উপকরণ, অস্ত্র আনতে হয়নি, নিজেরাই সক্ষমতা তৈরি করেছে। তাকে কোনো কনসালটেন্ট আনতে হয়নি। ড্রোন থেকে শুরু করে ব্যালেস্টিক মিসাইল সবকিছু তৈরি করেছে নিজস্ব ক্ষমতায়। সন্দেহ করা হয় উত্তর কোরিয়া, চীন, রাশিয়া থেকে ফর্মুলা পেয়েছে, হতে পারে। কিন্তু ইরানকে এক ঘরে রাখার যে পশ্চিমা কৌশল তারা তা টপকে অন্যান্য দেশের সাথে কার্যকর বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। কিন্তু ইরানে কোনো চীনা বা রুশ লোকবল কাজ করছে না। তারা নিজেরা সমরাস্ত্র তৈরি করছে। এবং তাদের এ প্রিপারেশনও হচ্ছে ভূগর্ভস্থ ডিফেন্স সিটি থেকে। ইরানে সফরের সময় নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রের ওপরে সড়ক দিয়ে গিয়েছি, নো রেস্ট্রিকশন, ওখানকার স্থানীয় লোকেরা আমাকে বলল যে, বারো থেকে কুড়িতলা নিচে পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলো তৈরি করতে সময় লাগলেও নিজস্ব প্রযুক্তি, স্থানীয় প্রকৌশলী, স্থানীয় বিজ্ঞানী হওয়ায় সস্তায় তারা করতে পেরেছে।