গুলিস্তান দিয়ে ফ্লাইওভারে ওঠার পড়ে মনে হলো সামনে কুয়াশাচ্ছন্ন। যতো সামনে আগাচ্ছি ততোই যেনো ধোঁয়াটে ভাবটা বাড়ছে। নাকে আসছে উৎকট পোড়া গন্ধ। আশপাশে তাকালাম। না কোথাও আগুন জ্বলার দৃশ্য নেই। আশপাশে কোথাও আগুন লাগলে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের ওপরে বসে ঠিক দেখা যাবে। সামনে যতো দূর চোখ যায় শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। মনে হলো রাজধানীর অর্ধেকটা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। আর দিনের বেলায় আরো ভয়ানক দৃশ্য। ডেমরা-যাত্রাবাড়িসহ আশপাশের এলাকার মানুষ চার দিন ধরে আবছা আবছা সূর্যের আলো পাচ্ছে। ধোঁয়ার কারণে মনে হয় মেঘে ঢেকে গেছে আকাশ। কথাগুলো বলছিলেন, রাজধানীর কোনাপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম। রাত দিন ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হয় ওই এলাকার। বাইরে নামলে ধোঁয়ায় দম আটকে যায়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, রাজধানীর মাতুয়াইলে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় ল্যান্ডফিলটি (বর্জ্যরে ভাগাড়) পাঁচ-ছয়দিন ধরে জ্বলছে। ডিএসসিসির আওতাধীন এ ল্যান্ডফিল থেকে বর্জ্য পোড়া ধোঁয়া ডেমরা, কোনাপাড়া, যাত্রাবাড়ি-কদমতলী, জুরাইনসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মতিঝিল পর্যন্ত ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্টে ভুগছে ওইসব এলাকার বাসিন্দারা। এই ল্যান্ডফিলের বিষাক্ত ধোঁয়ায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর নগরের আকাশ একেবারেই অন্ধকারাচ্ছ হয়ে পড়ে। এতে স্টাফ কোয়ার্টার-সারুলিয়া, ডেমরা, পাইটি, ধার্মিকপাড়া, কোনাপাড়া-মাতুয়াইল, মৃধাবাড়ি-কাজলা, শনির আখড়া ও জুরাইন এলাকায় বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বিষাক্ত এই ধোঁয়া রামপুরা, মুগদা, মান্ডা এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় খামখেয়ালি আর অব্যবস্থাপনার কারণেই বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ল্যান্ডফিলে কর্মরত শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে অল্প অল্প করে ল্যান্ডফিলের বর্জ্যে আগুন লাগা শুরু হয়। গত শুক্রবার থেকে আগুনের তীব্রতা বাড়ে। এতে ধোঁয়ার পরিমাণও বেড়ে যায়। আশপাশ এলাকাগুলোতে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল বুধবার মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে গিয়ে দেখা যায় ময়লার স্তূপে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। এর মধ্যেই অল্প অল্প করে আগুন জ্বলছে। ল্যান্ডফিলের ভেতর কথা হয় মনিরা আক্তার নামে একজনের সাথে। তিনি বলেন, আমরা এখানে ময়লা টোকাই। তিন দিন ধরে কাজে আসতে পারিনি। চোখ প্রচণ্ড জ্বালা করে। আজকে বাধ্য হয়ে কাজে এসেছি। এক দিন কাজে না এলেই তো খাওয়ার মতো পয়সা জোগাড় হয় না। তিনি বলেন, এখানে ময়লা পোড়ানোর জন্য আগুন লাগানো হয়েছে। প্রথম কয়েক দিন অল্প অল্প আগুন জ্বলেছে। এখন তীব্রতা বেড়েছে।
ল্যান্ডফিলে আগুন ও ধোঁয়ার বিষয়ে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। ল্যান্ডফিলে আগুন অটো লেগে গিয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ওই এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, রোববার রাতে জুরাইন থেকে পাইটি পর্যন্ত পুরো এলাকায় মানুষজন শ্বাস নিতে পারছিল না। নাকে ঝাঁঝালো গন্ধ আসতে থাকে। গতকাল বুধবার সকালে যাত্রাবাড়িতে ওয়াসার মডস জোন-১ ও ৭ কার্যালয়ে গেলে দেখা যায়, কার্যালয়টির উপরতলার কক্ষগুলোতেও পোড়া ধোঁয়ার গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে এ ধোঁয়ার ভোগান্তি নিয়ে কথা বলছিলেন। এ ছাড়া বুধবার দুপুর থেকে জুরাইন, যাত্রাবাড়ি, মানিকনগর, মাতুয়াইল, ডেমরা ঘুরে দেখা যায়, পুরো এলাকার আকাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। ওই এলাকায় দুপুরের পর কিছুটা রোদের দেখা মিললেও বেশির ভাগ সময় রোদের আলো ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছেনি।
স্থানীয়রা বলেন, এটা তো গেলো ল্যান্ডফিলের আগুন লাগার কাহিনী। ওই এলাকায় ঘরে ঘরে এখন কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় লোহা গলিয়ে রড তৈরি করা হয়। আবার কোনো কোনো কারখানায় প্লাস্টিক গলিয়ে তামা লোহা বের করা হয়। আবার গড়ে উঠেছে প্লাস্টিক কারখানা। ডেমরা রোডের পাশে কয়েকটি নামকরা আয়রন মিলের ধোঁয়ায় মাঝে মাঝে পুরো এলাকা ঢেকে যায়। প্রায়ই ওই এলাকায় দিনের বেলায় সূর্যের আলো পাওয়া যায় আবছা আবছা। এ নিয়ে ওই সব কারখানার সাথে স্থানীয় বাসিন্দারা যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও ওই সব কারখানার বিরুদ্ধে কোনোই পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
এলাকার একাধিক বাসিন্দা বলেছেন, গোটা এলাকা আস্তে আস্তে বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়ছে।



