নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গাজায় চলমান যুদ্ধ পুরো শ্রমবাজার বদলে দিয়েছে, যেখানে পেশাজীবীরা এখন টিকে থাকার জন্য বাধ্য হয়ে নতুন ও অস্থায়ী কাজে যুক্ত হচ্ছেন। খবর আলজাজিরার। গাজা সিটির রেমাল বাজারে ২৫ বছর বয়সী আবদুর রহমান আল-আওয়াদি, যিনি একসময় চারুকলার শিক্ষার্থী ছিলেন, এখন ছোট একটি সোলার-চালিত মোবাইল চার্জিং স্টেশন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। যুদ্ধের আগে তিনি গ্রাফিক ডিজাইন ও শিল্পচর্চায় যুক্ত ছিলেন; কিন্তু বোমা হামলায় তার কাজ, সরঞ্জাম ও স্বপ্ন সবই ধ্বংস হয়ে গেছে।
এমন চিত্র এখন গাজার সর্বত্র। ব্যবসা প্রশাসনে পড়াশোনা করা মুস্তাফা বুলবুলও এখন ভুট্টা বিক্রি করছেন। যুদ্ধের কারণে তার কর্মস্থল ও বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে তাঁবুতে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘বাঁচার জন্য যে কাজ পাওয়া যায়, সেটিই করতে হচ্ছে।’ অর্থনীতিবিদদের মতে, গাজায় এখন একটি ‘সারভাইভাল ইকোনমি’ গড়ে উঠেছে, যেখানে মানুষ অল্প আয় হলেও মৌলিক চাহিদা মেটাতে ছোটখাটো কাজ করছে। যুদ্ধের ফলে গাজার জিডিপি প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে গেছে এবং বেকারত্ব বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষসহ প্রায় সব শ্রেণীর মানুষই এ অস্থায়ী কাজের সাথে যুক্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কাজগুলো স্থায়ী নয় এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হচ্ছে। তবে স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত এ টিকে থাকার অর্থনীতি অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাজায় শরণার্থী ক্যাম্পে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় নিহত দুই
গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতির তোয়াক্কা না করেই ফের হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। বুধবার ভোরে মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় অন্তত দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া পৃথক এক হামলায় তিন শিশুসহ আরো চারজন আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি চিকিৎসা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা আনাদোলু এ তথ্য জানিয়েছে। চিকিৎসা সূত্রগুলো জানায়, নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ভোরের আলো ফোটার আগেই একটি ইসরাইলি ড্রোন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। দিনের অন্য এক ঘটনায় দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরাইল। এতে চারজন গুরুতর আহত হন, যাদের মধ্যে তিনটি শিশু রয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ইসরাইলি বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই লঙ্ঘন করছে। ১৮ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতি চলাকালীন ইসরাইলি হামলায় ৬৭৭ জন নিহত এবং এক হাজার ৮১৩ জন আহত হয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসনে এ পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় এক লাখ ৭২ হাজার মানুষ। দীর্ঘস্থায়ী এ হামলায় গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে, যা উপত্যকাটিকে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান এবং শান্তিপ্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ইসরাইলি বাহিনীর এমন ধারাবাহিক হামলা গাজায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।
যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় মানবিক সঙ্কট ‘অত্যন্ত ভয়াবহ’
যুদ্ধবিরতির আংশিক অগ্রগতি সত্ত্বেও গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন বলে সতর্ক করেছেন ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ। খবর আনাদোলু এজেন্সির। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে তিনি বলেন, গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে এবং অর্থনীতি কার্যত অচল। জরুরি সেবা আগের তুলনায় অনেক কম সক্ষমতায় চলছে। তিনি জানান, রাফাহ সীমান্ত খোলা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বন্ধ হলে যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া মানবিক সহায়তাপ্রবাহ বর্তমান চাহিদার তুলনায় অনেক কম বলে উল্লেখ করেন তিনি। গাজায় দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ এখনো অমানবিক পরিবেশে বসবাস করছেন। তিনি দ্রুত অস্থায়ী আবাসনব্যবস্থা ও সহায়তা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। ম্লাদেনভ বলেন, এ সঙ্কট কাটাতে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নই একমাত্র কার্যকর পথ।
গাজায় ত্রাণ সহায়তা এখনো অপর্যাপ্ত : যুক্তরাষ্ট্র
গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন দূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, পরিস্থিতির উন্নতির জন্য এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। তিনি জানান, গত ১৬ সপ্তাহে প্রতি সপ্তাহে চার হাজারের বেশি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা কমে গেছে। ওয়াল্টজ বলেন, গাজার মানুষের জন্য উন্নত আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবা জরুরি। একই সাথে তিনি দীর্ঘমেয়াদে গাজাকে ত্রাণনির্ভরতা থেকে বের করে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে নেয়ার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক দেশ সাত বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
ফিলিস্তিনি শিশুর ওপর নির্যাতনে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ
গাজায় এক ফিলিস্তিনি শিশুর ওপর নির্মম নির্যাতনের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। খবর টিআরটি ওয়াল্ডের্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় বাবার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য এক বছরের শিশুকে নির্যাতন করা হয়। শিশুটির শরীরে সিগারেট দিয়ে পোড়ানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পরে রেড ক্রসের সহায়তায় তাকে মুক্ত করা হয়। এ ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন কেয়ার এই ঘটনাকে ‘নৈতিক বর্বরতা’ আখ্যা দিয়ে দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলেও এ ঘটনায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
ফিলিস্তিনি বন্দীদের মৃত্যুদণ্ডের বিল এগিয়ে নিচ্ছে ইসরাইল
ফিলিস্তিনি বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আইনি ভিত্তি তৈরির পথে এগোচ্ছে ইসরাইল। দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি একটি খসড়া বিল অনুমোদন করেছে, যা শিগগিরই কনেসেটে চূড়ান্ত ভোটে তোলা হবে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। বিল অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি বন্দীদের ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যেতে পারে এবং এই সিদ্ধান্ত নিতে সর্বসম্মতির প্রয়োজন হবে না। এমনকি প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক আবেদন ছাড়াও আদালত মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে। দণ্ডপ্রাপ্তদের জন্য আলাদা কারাগার নির্ধারণ এবং সাক্ষাৎ সীমিত করার কথাও বলা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, এই আইন কার্যকর হলে দখলকৃত পশ্চিমতীরে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের ওপর এর বড় প্রভাব পড়বে এবং বিচারপ্রক্রিয়া আরো কঠোর হয়ে উঠবে।



