বিশেষ সংবাদদাতা
আগের দুই পর্বের বিশ্লেষণে আমরা দেখেছি- মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি রাজনীতি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার কৌশল কীভাবে একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক চিত্র তৈরি করছে। শেষ পর্বে প্রশ্নটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে : এই সব কিছুর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী? আলোচিত চীনা বংশোদ্ভূত কানাডীয় অধ্যাপক জিয়াং তৃতীয় ও শেষ পর্বে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন যে- বিশ্বকে রক্ষা করা, নাকি ভেঙে নতুনভাবে গড়ে তোলা এর লক্ষ্য?
‘প্যাক্স আমেরিকানা’ থেকে ‘মাগা’: নীতিগত মোড়
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিল- যাকে বলা হয় ‘প্যাক্স আমেরিকানা’। এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র- বিশ্ব বাণিজ্য রক্ষা করেছে; সামরিক নিরাপত্তা দিয়েছে; ডলারকে বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর রাজনৈতিক দর্শন এই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে।
‘মাগা’ বা মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন- মূলত একটি পুনর্গঠন প্রকল্প- যেখানে বৈশ্বিক দায়িত্ব কমানো; অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করা; সম্পদ ও শিল্পকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয় রয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রশ্নটি সরাসরি: ‘বিশ্বকে রক্ষা করার জন্য আমেরিকা কেন খরচ করবে?’
পতন অনিবার্য- এই ধারণার উৎস কোথায়?
এই বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো-বিশ্বব্যবস্থা নিজেই ভঙ্গুর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র একটি উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হয়। প্রথমে ইউরোপ ও জাপানকে ঋণ দিয়ে উৎপাদন বাড়ানো; পরে উৎপাদন আউটসোর্স করে নিজে ভোক্তা হয়ে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত চীনের উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি- এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছে: উচ্চ ঋণ; বৈষম্য ও রাজনৈতিক মেরুকরণ।
ফলে অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
‘নিয়ন্ত্রিত পতন’ তত্ত্ব : এই জায়গা থেকেই একটি বিতর্কিত ধারণা উঠে আসে- পতন যদি অনিবার্য হয়, তা হলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করে লাভবান হওয়া যায় কি?
এই তত্ত্ব অনুযায়ী : বিশ্ব অর্থনীতি একসময় ভেঙে পড়বেই, কিন্তু যে রাষ্ট্র প্রস্তুত থাকবে, সে-ই টিকে থাকবে। বরং পতনকে ত্বরান্বিত করলে প্রতিদ্বন্দ্বীরা আগে দুর্বল হয়ে পড়বে। এই যুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে দেখা হয় একটি ‘ক্যাটালিস্ট’ হিসেবে- যা বৈশ্বিক নির্ভরতা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি : কেন ট্রাম্প জনপ্রিয়?
এই বিশ্লেষণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ। অর্থনৈতিক বৈষম্য, চাকরির সঙ্কট এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির ধারণা অনেক আমেরিকানকে ক্ষুব্ধ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বার্তা- ‘ব্যবস্থাটি ভেঙে গেছে’ এবং ‘এটি আমেরিকার বিরুদ্ধে কাজ করছে’।
এই বক্তব্য অনেক ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
‘এলিট প্রতিযোগিতা’ ও নতুন শক্তি : সমাজবিজ্ঞানে একটি ধারণা আছে- এলিট ওভার প্রোডাকশন। অর্থাৎ, যখন একটি ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী তৈরি হয়, তারা নিজেদের মধ্যেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে : পুরনো এলিট : ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং এবং নতুন এলিট : প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা- এই দ্বন্দ্বও বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।
ধর্ম, ইতিহাস ও ভূরাজনীতি : তিন স্তরের ব্যাখ্যা
যুদ্ধকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। এই বিশ্লেষণে তিনটি স্তর গুরুত্বপূর্ণ: ১. ভূরাজনীতি : শক্তি, সম্পদ ও ক্ষমতার লড়াই; ২. অর্থনীতি : সরবরাহ, ঋণ ও উৎপাদন কাঠামো এবং ৩. ধর্ম ও ইতিহাস : পরিচয়, বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক স্মৃতি।
অনেক সময় এই তিনটি এক সাথে মিলেই বড় সঙ্ঘাত তৈরি করে।
বাস্তবতা বনাম তত্ত্ব : এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। এই বিশ্লেষণের কিছু অংশ অত্যন্ত বিতর্কিত এবং অনুমাননির্ভর- যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ভেঙে দিচ্ছে- এমন সরাসরি প্রমাণ নেই; যুদ্ধের ফলাফল অনিশ্চিত এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে আর বৈশ্বিক শক্তিগুলো এত সহজে নির্ভরশীল হয়ে পড়বে- এটিও নিশ্চিত নয়।
এ ছাড়া, কিছু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মতামত (যেমন পরিচয়ভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা) বাস্তব নীতিনির্ধারণের তুলনায় অনেক বেশি মতাদর্শিক এবং বিতর্কিত।
চূড়ান্ত প্রশ্ন : ট্রাম্প-নির্বোধ নাকি কৌশলী?
এই পুরো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি দ্বৈত মূল্যায়ন : এক দিকে- ট্রাম্পের নীতিকে অনেকেই বিশৃঙ্খল, অপ্রস্তুত ও ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। অন্য দিকে- কেউ কেউ এটিকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে দেখেন।
গেম থিওরির ভাষায়, কখনো ‘অপ্রত্যাশিত’ আচরণই প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার কার্যকর কৌশল হতে পারে।
পরিবর্তনের দোরগোড়ায় বিশ্ব : শেষ পর্যন্ত, এই বিশ্লেষণ আমাদের একটি বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়- বিশ্ব এখন একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; পুরনো বিশ্বব্যবস্থা দুর্বল হচ্ছে; নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে এবং আঞ্চলিক ব্লক ও সম্পদভিত্তিক রাজনীতি গুরুত্ব পাচ্ছে। ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হতে পারে, কিন্তু এটি একমাত্র কারণ নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো খোলা : এই পরিবর্তন কি নিয়ন্ত্রিত রূপান্তর, নাকি অনিয়ন্ত্রিত পতন? এর উত্তর নির্ভর করবে- কৌশল, সময় এবং সবচেয়ে বেশি মানুষের সিদ্ধান্তের উপর।



