সাক্ষাৎকার : এম হুমায়ুন কবির

সমন্বিত সামাজিক শক্তি ছাড়া সরকার টিকতে পারবে না

সারা বিশ্বে একটা টালমাটাল অবস্থা চলছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গত এক বছরে যে ঘটনাপ্রবাহ তাতে কিন্তু এখন কে আপনার বন্ধু, কে আপনার শত্রু বুঝার কোনো উপায় নাই। আমরা একটা ঘূর্ণিপাকের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এটাকে মোকাবেলা করতে যেকোনো সরকারের সক্ষমতা খুবই সীমিত। সর্বোত্তম সরকারের পক্ষেও এটা এককভাবে করা সম্ভব না। আগামীতে একটা সমন্বিত সামাজিক সরকার এবং সমাজের সব শক্তির একটা সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারবে না।

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition
এম হুমায়ুন কবির
এম হুমায়ুন কবির

দেশের বিশিষ্ট কূটনীতিক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেছেন, সারা বিশ্বে একটা টালমাটাল অবস্থা চলছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গত এক বছরে যে ঘটনাপ্রবাহ তাতে কিন্তু এখন কে আপনার বন্ধু, কে আপনার শত্রু বুঝার কোনো উপায় নাই। আমরা একটা ঘূর্ণিপাকের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এটাকে মোকাবেলা করতে যেকোনো সরকারের সক্ষমতা খুবই সীমিত। সর্বোত্তম সরকারের পক্ষেও এটা এককভাবে করা সম্ভব না। আগামীতে একটা সমন্বিত সামাজিক সরকার এবং সমাজের সব শক্তির একটা সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারবে না।

নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই প্রবীণ কূটনীতিবিদ বলেন, নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে সরকার আসলে স্বাভাবিকভাবে একটা অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে হয় কিন্তু এবারের অ্যাডজাস্টমেন্টা একটু বড়ই হবে। আমাদের কয়েক টুইন ট্রানজিশন চলছে সাইমনটেনিয়াসলি। জুলাই উত্তর বাংলাদেশের মানুষের চাহিদার বিস্ফোরণ ঘটেছে, এ চাহিদাকে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে দাঁড়ানোর জন্য যে প্রত্যয়, তা পররাষ্ট্রনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। গত ৫৪ বছর ধরে যে পররাষ্ট্রনীতি, সেটা আর চলছে না। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও বলছে আমরা ইকুয়ালিটি ও ডিগনিটি নিয়ে পররাষ্ট্রনীতি চালাতে চাই। আগামী সরকারকে এই ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের চাহিদাকে বাইরের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে রাখতে হবে। এটা কিন্তু সহজ কাজ নয় কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটা মোডাস অপারেন্ডি বা অ্যাডহক, মোর রিঅ্যাক্টিভ টাইপ পররাষ্ট্রনীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, এ বছরেই আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হচ্ছি। বাইরের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করতে গেলে আমার অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাকে বাড়াতে হবে। এতদিন একপক্ষীয় সুবিধা পেয়ে আসছিলাম বাইরের পৃথিবীর কাছ থেকে। এখন দ্বিপক্ষীয় বা দেয়া নেয়ার মধ্যে যেতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। খোলা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকতে সক্ষমতায় যেতে হবে। জরুরি পরিবর্তন হিসেবে শিক্ষা ও দক্ষতার ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ বাড়ানো এসব কাজগুলো আমাদের করতে হবে। নির্বাচিত যে সরকার আসবে তাকে অভ্যন্তরীণ সমস্যার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। কিন্তু বাইরের পৃথিবীতে চ্যালেঞ্জগুলোর ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নাই। দক্ষতা ও সক্ষমতা দিয়ে সেগুলোকে ম্যানেজ করতে হয়।

নয়া দিগন্ত : কূটনীতিতে দরকষাকষির দক্ষতা অর্জনে সরকারের সাথে বেসরকারি খাতের একটা যৌথ প্রস্ততির ঘাটতি রয়ে গেছে, থিঙ্কট্যাংক বা পরামর্শ দেয়া নেয়া কিভাবে বাড়ানো যায়?

এম হুমায়ুন কবির : প্রতিষ্ঠান নেই এমন নয়, মাইন্ডসেটেরও একটা ব্যাপার আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থিঙ্কট্যাংকে চিন্তার কাজটা করা হয়, একটা নীতিগত অবস্থান সৃষ্টি করে সরকারের কাছে দেয়া হয়, সরকার সেটা পর্যালোচনা করে যেটা গ্রহণ করার তা করে। ভারতেও থিঙ্কট্যাংকের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। আমাদের এখানে থিঙ্কট্যাংক ও সরকারের মধ্যে যোগাযোগের জন্যে যে মৌলিক চিন্তার জায়গা দরকার যেটা কনসাল্টেটিভ মেকানিজম বা মাইন্ডসেটটা দরকার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারি ব্যবস্থাপনায়, গভর্ন্যান্স স্ট্রাকচারে কনসাল্টেটিভ মেকানিজমের ওরিয়েন্টশন নাই প্রায়। কাজেই দশটা থিঙ্কট্যাংক থাকলেও সরকারের নীতিগত অবস্থানের ওপর তার প্রভাব পড়বার কোনো সুযোগই নাই। কনসাল্টেটিভ প্র্যাকটিসটা, প্র্যাকটিস অব কনসাল্টেশন উইথ থিঙ্কট্যাংক, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন, ইভেন উইদিন দ্য গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউশন এই কনসাল্টেটিভ মেকানিজমটা অনেক বেশি ইফেক্ট করতে হবে।

একটা দৃষ্টান্ত দেই, বিদেশীনীতি নিয়ে কাজ করার মন্ত্রণালয় কম করে হলেও ১০টা আছে। পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, জনশক্তি, ট্যুরিজম, হোম, ফাইন্যান্স মন্ত্রণালয় বা ইআরডি, বিডা এদের কারো মধ্যে সমন্বয় নাই। কনসাল্টেটিভ মেকানিজমের মধ্যে দিয়ে একটা সমন্বিত জায়গা তৈরি করা সরকারের ভেতরে যেমন দরকার, সরকারের বাইরে থিঙ্কট্যাংক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের সাথেও সরকারের এই সমন্বয় আরো বেশি বাড়ানো দরকার। মাইন্ডসেট ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার প্রয়োজন। ভারতে সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তারা বিভিন্ন ধরনের সংস্থাগুলোকে সাপোর্ট করে ভারতের স্বার্থকে প্রমোট করার জন্য দেশটির সরকার যেটি করতে পারে না, গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, এনজিও, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলোকে দিয়ে সেই লক্ষ্য পূরণে তারা সে কাজ করায়।

নয়া দিগন্ত : বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো একটা ভূমিকা পালন করতে পারে।

এম হুমায়ুন কবির : হ্যাঁ পারে। পুরনো প্রসেসটা আর চলবে না। সরকার যদি মনে করে একা করব, সেটা সম্ভব না। সরকারের সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা আছে। সিভিল সোসাইটি বা দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা এটাতো সরকার করতে পারবে না। এমার্জেন্সি বিষয়ে অ্যাড্রেস করতে করতে তার সময় যায়। থিংকিং প্রসেসটা অন্য জায়গায় দিতে হবে।

নয়া দিগন্ত : রুটিন ওয়ার্কে সরকারকে তো ছক বাঁধা কাজের মধ্যে থাকতে হয়।

এম হুমায়ুন কবির : এক্সেটলি। রুটিনের বাইরে একটু দূরের দৃষ্টিতে দেখতে হয়, গবেষণা করে বুঝতে হয়, মানুষ কী ভাবছে সেগুলোকে যদি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইন্টিগ্রেটেড করতে হয় তাহলে যারা এ কাজ করতে পারে তাদেরকেই এ কাজটা করতে দিতে হবে। তাদের সহায়তা দিতে হবে। তাহলে চিন্তাভাবনা করার জায়গা, মানুষ কী চায় সে নিয়ে গবেষণা এবং নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে সুপারিশমালার ভিত্তিতে সরকারের জন্য কাজটা করা সহজ হবে। একটা সমন্বিত জাতীয় প্রেক্ষাপট আমরা সৃষ্টি করতে পারব।

নয়া দিগন্ত : গত ৫৫ বছরে রাজনীতি, অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়েছে কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কি আমরা অগ্রসর হতে পারছি?

এম হুমায়ুন কবির : সক্ষমতা একটা ডায়নামিক প্রসেস। সুযোগ দিলে সক্ষমতা বাড়বে। সক্ষমতার সর্বোত্তম ব্যবহারের পাশাপাশি যেখানে সেটা নেই প্রয়োজনে বাইরে থেকে তা আনা জরুরি। শিক্ষা ও দক্ষতা কাঠামো পরিবর্তনে প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ সম্পদে ঘাটতি আছে।

নয়া দিগন্ত : প্রযুক্তিতো আনছি।

এম হুমায়ুন কবির : সবই তো আনি। বাইরের পৃথিবীর সহযোগিতা যদি চাই বা পাওয়া যায় তা নিতে আপত্তি কিসের। ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি মানেই হচ্ছে আমার স্পেস বড় হওয়া।

নয়া দিগন্ত : দু’টি প্রতিবেশী দেশের একটি মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা সঙ্কট আর ভারতের সাথে তো আমাদের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক কিন্তু দু’টি প্রতিবেশী দেশের সাথে আমাদের বোঝাপড়া খুব একটা স্মুথ না।

এম হুমায়ুন কবির : জটিলতা আছে। দু’টি দেশের সাথেই বহুমাত্রিক সম্পর্ক। প্রতিবেশী যেহেতু একটা পারস্পরিকতা আছে। দু’জনের স্বার্থ দু’জনকে অ্যাফেক্ট করে। এ বিষয়গুলো উপলব্ধির মধ্যে রাখতে হবে। ভারতও আমাকে ছাড়া এগিয়ে যেতে পারবে না, আমিও না। আত্মমর্যাদা ও সমতার সাথে বিষয়গুলো দেখতে হবে। প্রফেসর ইউনূসও তাই বলেছেন। এটাকে বেইজলাইন হিসেবে রেখে আমার প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটটা মনে রেখে ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে সাজাতে পারি। ভারতের সাথে বহুমাত্রিক বা নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে। চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত বা অভিন্ন নদী, মানুষে মানুষে যোগাযোগ আছে, সহজ ব্যবসাবাণিজ্যের একটা জায়গা তো ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক যেটা করা যায় সে চেষ্টা করে যেতে হবে। রাজনীতি বা কূটনীতির দিক থেকে গত দেড় বছর ধরে ভারতের সাথে টেনশন আছে। তারপরও ব্যবসা বাড়ছে কারণে এর নিজস্ব একটা গতি আছে। মানুষের চাহিদা ও সরবরাহের ওপর এটা চলে।

মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা সঙ্কটের পাশাপাশি কৌশলগত সুযোগও আছে। মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কে আরো যেন গতিশীলতা আনা যায় সে চেষ্টা করতে হবে। মিয়ানমারের পেছনে আসিয়ান রয়েছে। আসিয়ানের সদস্য হতে চাইলে মিয়ানমারের সমর্থন লাগবে। মিয়ানমারের পাশাপাশি চীন মানে একটা ভূকৌশলগত জায়গা আছে যেখনে গভীর চিন্তার দরকার। নির্বাচিত সরকার এসব বিষয় ঠাণ্ডা মাথায় রেখেই আগাবে। প্রজ অ্যান্ড কজের দিকে খেয়াল রেখে। ভারত চীনের সম্পর্ক দেখুন, ২০০০ সালে গালওয়ানে যুদ্ধে মৃত্যুর ঘটনার পর তারা এটাকে পাশ কাটিয়ে অন্যান্য জায়গায় সম্পর্ক প্রসারিত করে যাচ্ছে। মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কের চিন্তা আরেকটু ডায়নামিক কিভাবে করতে পারি, রোহিঙ্গা সঙ্কটের বাইরে অন্য কৌশলগত জায়গা কিভাবে এক্সপ্লোর করা যায় সে চিন্তার সুযোগ আছে।

নয়া দিগন্ত : বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে রাজনাথ সিং শোক বইতে স্বাক্ষর করেছেন। ঢাকায় এসে এস জয়শঙ্কর পাকিস্তানের স্পিকারের সাথে করমর্দন করলেন। আমরা আশান্বিত হয়ে উঠলাম উপমহাদেশে দেশগুলো পাশাপাশি চলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে, এর মধ্যে ক্রিকেটের মতো একটা বিষয় নিয়ে বিরোধিতা, খটকা লাগে যে দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত পুনর্বিন্যাসে ভারত কি তার কূটনৈতিক উদ্যোগ হারিয়ে ফেলেছে?

এম হুমায়ুন কবির : ভারতেও রাজনীতির একটা নতুন বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের এখানেও নতুন বাতাবরণ সৃষ্টি হচ্ছে না তাও না। ইউনূসের সাথে মোদির ব্যাংকক মিটিংয়ের পরে আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম, তারপর কিন্তু ভারত ট্রান্সশিপমেন্টা বন্ধ করে দিলো। জয়শঙ্কর ঢাকায় এলেন, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং আমাদের দূতাবাসে গেলেন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর। তারপর কিন্তু নতুন একটা ঝাপটা এসে গেল। দুই দিকেই এ ধরনের সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না এমনটা হচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : তার মানে কি রাজনৈতিক সম্পর্ক যখন খারাপ হয় তখন ক্রিকেট আর বিচ্ছিন্ন থাকে না।

এম হুমায়ুন কবির : মাস্টার আর্ট হিসেবে রাজনীতি সব কিছুর মধ্যেই প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু এসব জায়গায় আরো একটু সৃজনশীল হতে হবে, যদি এক বছর আগেও ধরেন তাহলে ভারতের যে মুড ছিল আজকে ভারতের সে মুড একটু একটু করে পরিবর্তন হচ্ছে তার কারণ ভারতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, ভারতের সাথে চীনের সম্পর্ক এই যে পরিবর্তনগুলো হচ্ছে তার একটা পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর থাকবে এবং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তা আসবে। এখন এমন একটা বিশ্বে যাচ্ছি যেখনো মুক্ত বিশ্বের ধারণা থেকে একেবারেই নিজের ঘরে আমরা নিজের পাড়ায় ঢুকে যাচ্ছি। চীনের জন্য হলো এশিয়া অঞ্চল, ভারতের জন্যে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হলে আমেরিকা, ইউরোপের জন্য হলে ইউরোপ, এই যে স্পিলিন্টার বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে রূপান্তরিত হচ্ছি, সে জায়গায় কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় এক বিলিয়ন মানুষের বাজার আছে। ইচ্ছে করলেই সহযোগিতার কাঠামো সার্ককে পুনর্জীবিত করতে পারি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান প্রফেসর ইউনূস বারবার এটা অনুরোধ করছেন। বাংলাদেশের জনগণও তা চায়। ভারত যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে পারে সার্ক এগিয়ে নেয়া বা এক্সাট কাঠামো না হলেও অনেক ইস্যু নিয়ে আঞ্চলিক ভিত্তিতে কাজ করার সুযোগ আছে।

নয়া দিগন্ত : ভারতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও আমলা, জেনারেল, পুলিশ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আশ্রয় নিয়েছে, তারা ফিরে আসার চেষ্টা করছে, এমন এক পরিস্থিতিতে বহুত্ববাদী বাংলাদেশকে কি ভারত চ্যালেঞ্জ মনে করছে? সার্কের মতো আঞ্চলিক প্রচেষ্টা শুরু হলে এ ধরনের রাজনৈতিক ভুল বুঝাবুঝি কি নিরসন হতে পারে?

এম হুমায়ুন কবির : সেটা পারে। তার জন্য ভারতের তরফ থেকে স্ট্রংপলিটিক্যাল উইল লাগবে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বড় শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের পক্ষ থেকে চাওয়ার পরও তা পাওয়া যায় না বলেই কিন্তু সার্ক আটকে গেছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে ভারতের উদ্যোগ লাগবে। বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার অবকাশ আগামী নির্বাচনের মধ্যে দিয়েই যেটা হবে তা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন মাত্রায় বিন্যস্ত হওয়া অসম্ভব বলে মনে করি না। সেখানে যেসব প্রতিবন্ধকতা বড় বিষয় হিসেবে আমরা ভাবছি সেগুলো হয়তো নাও থাকতে পারি। এখানে ভারত বাংলাদেশ বিষয়। এখানে একজন ব্যক্তি, দু’জন ব্যক্তির চেয়েও এটা গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার মনে হয় এবং ভারতের দিক থেকে সেইরকম ইঙ্গিতটাই পাওয়া যাচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করতে চায় এরকম একটা ভারতভীতি দেখি, বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার নিরাপত্তায় চীন, তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরবের সাথে কথাবার্তা বলতেই পারে, কিন্তু এইটা অনেক সময় ভারতের তরফ থেকে দেশটির নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে মনে করা হয়।

এম হুমায়ুন কবির : এটা নির্ধারিত হয় মূলত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। আমি যদি আপনার সম্পর্কে না জানি তাহলে আমার ভয়টা বেশি থাকবে। রাজনৈতিক আস্থার অভাব থাকলে সমস্যাটা জটিল হয়। একটা স্বাধীন জাতি হিসেবে আমার আত্মমর্যাদা রক্ষায় যেটুকু আমার প্রয়োজন সেটুকু অর্জন করি সেখানে ভারতের শঙ্কিত হবার কোনো কারণ দেখি না। ভারতকে আশ্বস্ত রাখতে তারও একটা ভূমিকা আছে, আমারও আছে। সম্পর্ককে মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে রেখে পারস্পরিক নিরাপত্তার জন্য আমরা আমাদের যেটুকু করার সেটা করতে পারি। ভারতের জন্য হুমকি নই, আত্মরক্ষার জন্যেই কাজটা করছি এই অবস্থাটা ভারতের কাছে তুলে ধরাটা খুব কঠিন বলে মনে করছি না। এটা সম্ভব।

নয়া দিগন্ত : দুই দেশের জনগণের মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি, কোনো একটা সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্কের চেয়ে।

এম হুমায়ুন কবির : আমাদের অভ্যন্তরীণ সংহতিও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিকভাবে সংহতি না থাকার ফলে আমরাইতো সুযোগ করে দেই বাইরের শক্তিকে এখানে ঢুকানোর জন্য। আমাদের অভ্যন্তরীণ সহমত বা সংহতি এটাকে বাড়াতে হবে। এটা বাড়ালে আপনি যে কারো সাথে দাঁড়াতে পারবেন। আর যদি এটা না থাকে তাহলে কারো সাথে দাঁড়াতে পারবেন না। কারণ আপনি তো নিজে ডেকে আনছেন। কিছু মৌলিক বিষয়ে সহমত থাকতে হবে। বিভাজন সৃষ্টি করলে হবে না। নেপালে কাজ করেছি, সহমতে থাকার কারণে নেপালের মতো দেশেও তাদের ওপর কোনো বড় প্রতিবেশী প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। নেপাল পারলে আমি কেন পারব না। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আমাদের ঐকমত্য থাকতে হবে। তাহলে ভারত বলেন চীন বলেন, এখানে এই নয় যে কেউ ধোয়া তুলসি পাতা, এখানে জাতীয় স্বার্থের বিষয়। পারস্পরিক স্বার্থ নিয়ে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা করব সেক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ শক্তিটাই হবে আমার জাতীয় স্বার্থের শক্তির জায়গা।

নয়া দিগন্ত : তরুণদের একটা বিশাল স্বপ্ন কাজ করছে আর আপনাদের অভিজ্ঞতা মিলে বাংলাদেশ কতদূর আগাবে?

এম হুমায়ুন কবির : নিশ্চয়ই, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস আছে, উদ্যম আছে, শক্তি আছে, এটা আমাদের ইঞ্জিন, শক্তির জায়গা, ডিরেকশনটা আসতে হবে, এজন্য প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা আর অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নাই। এখানে প্রবীণদের অংশগ্রহণের একটা সুযোগ আছে। নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়টা করতে পারলে অন্তত আত্মসম্মানসম্পন্ন বাংলাদেশ, একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, সবাইকে নিয়ে একটা বাংলাদেশে চলনোর স্বপ্ন পূরণ করা খুব অসম্ভব বলে মনে হয় না।