এখন ৯টি দেশের হাতে ৯ হাজার পরমাণু অস্ত্র আছে

যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সর্বশেষ চুক্তির মেয়াদও শেষ বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্র ঘিরে নতুন শঙ্কা

Printed Edition

এএফপি ও আলজাজিরা

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে কার্যকর থাকা সর্বশেষ পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিটির মেয়াদ গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। এর ফলে দুই পরাশক্তি কতটি পরমাণু ওয়ারহেড মোতায়েন করতে পারবে সেই বিষয়ে কয়েক দশকের বিধিনিষেধ হঠাৎ করেই উঠে গেলো। এতে করে বৈশ্বিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরুর আশঙ্কা জোরালো হলো।

দুই দেশের মধ্যে ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তিটি ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখ বদলের সাথে সাথে কার্যকারিতা হারাল। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এক বছরের জন্য চুক্তির সীমাবদ্ধতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে সাড়া দেননি।

জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস একে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ‘ভয়াবহ মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি দুই দেশকেই দ্রুত আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানান। এক বিবৃতিতে গুতেরেস বলেন, গ্রিনিচ মান সময় মধ্যরাত বা নিউইয়র্কে সন্ধ্যা ৭টার সাথে সাথে চুক্তিটি শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর এই প্রথম আমরা এমন এক বিশ্বের মুখোমুখি, যেখানে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর কোনো বাধ্যতামূলক সীমা নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘কয়েক দশকের অর্জনের এই বিলুপ্তি এর চেয়ে খারাপ সময়ে আসতে পারত না- পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।’ ইউক্রেন যুদ্ধে শুরুর দিকে কৌশলগত নয়, এমন পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি।

এ দিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, চুক্তির প্রোপটে উভয় দেশই এখন আর কোনো বাধ্যবাধকতা বা সমান্তরাল ঘোষণার মধ্যে নেই বলে তারা মনে করে। এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রাশিয়া দায়িত্বশীল ও বিচণভাবে কাজ করতে চায়।’ তবে একই সাথে সতর্ক করে বলা হয়, জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে তারা ‘নির্ণায়ক’ পাল্টা ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।

নিউ স্টার্ট বা স্ট্র্যাটেজিক আর্মস রিডাকশন ট্রিটি এমন একটি চুক্তি, যা কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের ওপর সীমা নির্ধারণ করে। এসব অস্ত্র মূলত প্রতিপরে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামরিক ও শিল্পকেন্দ্রে আঘাত হানার জন্য তৈরি। মোতায়েন করা অস্ত্র বা ওয়ারহেড বলতে বোঝায়, যেগুলো সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে এবং ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। এর বিপরীতে যেগুলো গুদামে রাখা বা ধ্বংসের অপোয় রয়েছে, সেগুলো এই হিসাবে ধরা হয় না।

এই চুক্তিটি ছিল ১০ বছরের। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এটি সই করেন। মেদভেদেভ পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং তিনি ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এক মেয়াদে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। চুক্তিটি কার্যকর হয় ২০১১ সালে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব নেয়ার পর চুক্তিটির মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়ানো হয়।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে মস্কো ও ওয়াশিংটন উভয়ই পেণাস্ত্রের সংখ্যা বাড়াতে এবং আরো শত শত কৌশলগত ওয়ারহেড মোতায়েন করতে পারবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি করতে বাস্তব ও প্রযুক্তিগত নানা জটিলতা রয়েছে এবং এতে সময় লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে চুক্তি বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। তিনি বহুবার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের কথা বলেছেন। কিন্তু জানুয়ারিতে তিনি নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বহীন করে দেখান। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘যদি মেয়াদ শেষ হয়, শেষ হোক। আমরা আরো ভালো একটি চুক্তি করব।’ ট্রাম্প ভবিষ্যতের যেকোনো পারমাণবিক আলোচনায় চীনকে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলেছেন।

বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের ৯০ শতাংশেরও বেশি রয়েছে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রাশিয়ার কাছে ছিল চার হাজার ৩০৯টি পারমাণবিক ওয়ারহেড। যুক্তরাষ্ট্রের ছিল তিন হাজার ৭০০টি। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং চুক্তিবদ্ধ দেশ ফ্রান্সের কাছে রয়েছে ২৯০টি এবং যুক্তরাজ্যের কাছে ২২৫টি পারমাণবিক ওয়ারহেড। চীনের কাছে রয়েছে প্রায় ৬০০টি।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিউ স্টার্টের অবসান একটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার পথ খুলে দিতে পারে। এতে চীনের পারমাণবিক শক্তি বাড়ানোর প্রক্রিয়াও ভূমিকা রাখবে। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের নিউকিয়ার ইনফরমেশন প্রজেক্টের সহযোগী পরিচালক ম্যাট কর্ডা রয়টার্সকে বলেন, ‘চুক্তি না থাকলে উভয় পই তাদের মোতায়েন করা পেণাস্ত্র ও ভারী বোমারু বিমানে আরো শত শত ওয়ারহেড যোগ করতে পারবে। সবচেয়ে চরম পরিস্থিতিতে এতে বর্তমানে মোতায়েন করা অস্ত্রের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।’

বৃহস্পতিবার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলে পোপ লিও উভয়পকে এই চুক্তির সীমাবদ্ধতা পরিত্যাগ না করার আহ্বান জানান। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়াকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর মুহূর্ত বলে মন্তব্য করেন। তিনি মস্কো ও ওয়াশিংটনকে দেরি না করে নতুন একটি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান।

নতুন পারমাণবিক আলোচনায় অংশ নেবে না চীন

রয়টার্স জানায়, ওয়াশিংটন ও মস্কোর নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নতুন কোনো পারমাণবিক আলোচনায় যোগ দেবে না বলে জানিয়েছে চীন। বেইজিংয়ের দাবি, বিশ্বব্যাপী অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া দুঃখজনক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানান মস্কোর সাথে আবার সংলাপ শুরু করতে, যাতে ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ বজায় থাকে।

লিন জিয়ান বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক ব্যবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।