হাবিবুল বাশার
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজপথের আন্দোলন ও ডিজিটাল স্পেসের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ ১১ দলীয় জোট এখন দেশের প্রচলিত দ্বিমেরু রাজনীতির বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে এই জোট একটি স্থায়ী ‘পলিটিক্যাল ব্লক’-এ রূপ নেয়ার পথে রয়েছে। শরিক দলগুলোর মতে, সরকারি সংস্কারের ধীরগতি এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের জনআকাক্সক্ষাই তাদের এই কৌশলগত ঐক্যকে আরো সুসংহত করছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ১১ দলীয় জোট সাত দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ঘোষিত কর্মসূচির মূল লক্ষ্য- গণভোটে প্রাপ্ত রায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ত্বরান্বিত করা। জোটের নেতারা মনে করছেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে তাদের উত্থান দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংসদে জোটের সুসংগঠিত অবস্থান : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের (১২ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ) কার্যক্রম বিশ্লেষণে বিরোধী দলগুলোর একটি সুসংগঠিত ও সমন্বিত অবস্থান লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে ২৯, ৩০ ও ৩১ মার্চের অধিবেশনগুলোতে ১১ দলীয় জোট একটি নির্বাচনী জোটের সীমা ছাড়িয়ে ‘সংসদীয় ব্লক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের ইঙ্গিত দেয়।
২৯ মার্চ কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ ধারায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের দাবিতে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের রায়প্রাপ্ত এই সনদ বাস্তবায়ন আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। আমরা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য উভয় হিসেবেই দায়বদ্ধ।”
৩১ মার্চ তিনি আরো বলেন, “দীর্ঘ দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে চাই, যেখানে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত হবে।”
অন্য দিকে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের দাবি তুলে বলেন, “আমরা শুধু সংশোধন নয়, পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতিতে এসেছি। আমাদের অবস্থান সম্পূর্ণ সাংবিধানিক।”
কনিষ্ঠ সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ তার বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ তুলে ধরে বলেন, “স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন আমাদের ভোটাধিকারের জন্য রক্ত দিতে হলো- এর জবাব চাই।”
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ বিল ও নোটিশে জামায়াত ও এনসিপির অভিন্ন অবস্থান এবং ‘যৌথ সংসদীয় দল’ গঠনের প্রক্রিয়া এই জোটের স্থায়ী রূপ নেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আদর্শিক মিল ও কৌশলগত সংহতি : ১১ দলীয় জোটের দলগুলোর মধ্যে কিছু আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও মৌলিক বিষয়ে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঐক্য রয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পুলিশ প্রশাসনের বিরাজনীতিকরণ এবং নির্বাচন কমিশনের সংস্কার- এসব ইস্যুতে তাদের অবস্থান প্রায় অভিন্ন।
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নবনির্বাচিত ৭৭ জন সংসদ সদস্যের বিশেষ শপথ গ্রহণের সময় এই যৌথ অঙ্গীকার আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আন্দোলনের সময় জামায়াত-শিবিরের সংগঠিত আইটি নেটওয়ার্ক এবং এনসিপির ‘জেন-জি’ তরুণদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ন্যারেটিভ তৈরি হয়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রভাব ফেলে। এই ডিজিটাল সংহতি নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও জোটের ঐক্য ধরে রাখতে ভূমিকা রাখছে।
একদিকে এনসিপির তরুণ নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা, অন্য দিকে জামায়াতের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি- এই দুইয়ের সমন্বয়ই জোটের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
স্থায়ী ব্লকে রূপান্তরের তিন ভিত্তি : বিশ্লেষকদের মতে, ১১ দলীয় জোটের স্থায়িত্ব মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে-
এক. যৌথ সংসদীয় কৌশল : জোটটি ‘সমন্বিত বিরোধী শক্তি’ হিসেবে সংসদে ভূমিকা রাখতে চায়। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একক অবস্থান গ্রহণ তাদের শক্তিকে আরো বাড়িয়েছে।
দুই. প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় কাঠামো : লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে একটি দ্বি-স্তরীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি শরিক দলের সমান গুরুত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিন. তৃণমূল পর্যায়ে সমন্বয় : জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যৌথ সমন্বয় সেল গঠন করে জোটের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা হচ্ছে।
জোটের সমন্বয়ক ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদের ভাষায়, “১১ দলীয় জোট এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার।”
রাজনৈতিক চাপ ও বিকল্প শক্তি হিসেবে উত্থান : বাংলাদেশের প্রথাগত রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে একটি বিকল্প শক্তির চাহিদা ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট ইতোমধ্যে প্রায় ৩৮ শতাংশের বেশি ভোটারের সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, “এই জোট মূলত একটি নির্বাচনী সমঝোতা হিসেবে শুরু হলেও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রশ্নে একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি স্থায়ী রাজনৈতিক জোটে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকারের নীতি ও পদক্ষেপের ওপর।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালউদ্দীন আহমেদ বলেন, “জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা কোনো একক দলের নয়; এটি একটি জাতীয় চেতনা। এই ঐক্যকে আরো বিস্তৃত করার চেষ্টা চলছে।”
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১১ দলীয় জোট এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তারা যদি অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখতে পারে এবং ‘কমন মিনিমাম প্রোগ্রাম’-এর ওপর অটল থাকে, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী বাজেট অধিবেশনের আগে জোটটি একটি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ এবং বিকল্প বাজেট প্রস্তাব করতে পারে, যা তাদের রাজনৈতিক পরিপক্বতার ইঙ্গিত দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, “সরকার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ইস্যুতে অনাগ্রহ দেখালে বিরোধী জোট আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। জাতীয় সমস্যাগুলোর সমাধানে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
সব মিলিয়ে ১১ দলীয় জোট এখন আর কেবল একটি নির্বাচনী ঐক্য নয় বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সম্ভাবনাময় ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। জুলাই বিপ্লবের স্মৃতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকারই এই জোটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
যদি তারা অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য দূর করে ঐক্য ধরে রাখতে পারে, তবে দেশের প্রচলিত দ্বিমেরু রাজনীতির কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে- এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।



