জিলানী মিলটন ও এস এম মিন্টু
- থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্রের অনেক এখনো উদ্ধার হয়নি
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও চট্টগ্রাম সীমান্ত দিয়ে অস্ত্রের চোরাচালান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর অংশ হিসেবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বৈধ অস্ত্র সংশ্লিষ্ট থানায় জমা দেয়ার শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ৩১ জানুয়ারি পার হলেও বৈধ অস্ত্র জমা দেয়ার বিষয়ে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে এখনো সারা দেশে জমা দেয়া অস্ত্রের কোনো তথ্য বা হিসাব নেই বলে তারা জানিয়েছেন।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্র জমা না দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা। গত ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বৈধ অস্ত্র জমা দেয়ার বিষয়ে এই নির্দেশনা দেয়া হয়। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল অনুসরণে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারীদের অস্ত্র বহন ও প্রদর্শন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে। তবে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী বরাদ্দকৃত বৈধ অস্ত্রের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ আদেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। নির্দেশনা বাস্তবায়নে দেশের সব পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের বাকি আর মাত্র চার দিন, এর মধ্যে অস্ত্রগুলো জমা না দেয়ার কারণে নির্বাচনে একটা বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনের আগে-পরে ও নির্বাচনের দিন বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে।
এ দিকে সীমান্তের ওপার থেকে অবাধে অস্ত্র চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় প্রতিনিয়তই অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে নির্বাচনকে সামনে রেখে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং চট্টগ্রাম সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের পর থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র এবং গোলাবারুদ এখনো পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। এতে ভোটের মাঠে অবৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি থানার লুট হওয়া ও বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন গোয়েন্দারা।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক-২ অধিশাখা) ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র জমা কী পরিমাণ হয়েছে সেই ডাটা এখনো আমাদের কাছে আসেনি। সারা দেশের জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) এখনো জমা হওয়া অস্ত্রের সংখ্যা জানাননি। তাই আমাদের কাছে সঠিক তথ্য নেই।
নির্বাচনের আগে অস্ত্রগুলো জমা না হলে অবৈধ ব্যবহার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হয়তো অস্ত্রগুলো জমা হয়েছে। ডিসিরা নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ব্যস্ততার কারণে হয়তো তথ্যগুলো পাঠাতে দেরি হচ্ছে। অস্ত্র জমা দেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি অ্যাপস ব্যবহার করা হয়। ওই অ্যাপের ডাটা থেকেও অস্ত্র জমার একটা আপডেট ডাটা থাকার কথা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই অ্যাপসটি নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চব্বিশের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র লুট হয়। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন ধরনের ১০ হাজার ৫০৬টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ৬৫৭টি অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি। ধারণা করা হচ্ছে, এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ আগামী নির্বাচনে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স সূত্র জানায়, পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্রের সংখ্যা ৫ হাজার ৭৬৩টি। এরমধ্যে এখনো উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩৩১টি। গোলাবারুদ খোয়া গেছে ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি। এখনো উদ্ধার হয়নি ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪টি।
সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার সেনাবাহিনীর পৃথক অভিযানে রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে একটি রাইফেল, সাতটি পিস্তল ও তিনটি রিভলবারসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও সরঞ্জামাদি উদ্ধারসহ এক জন আটক এবং যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে দুইটি বিদেশী পিস্তল, একটি রিভলবার, তিন রাউন্ড গুলি, বিপুল পরিমাণ মাদক ও নগদ অর্থসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি মাসুমসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়াও গতকাল বিজিবির অভিযানে দুইটি বিদেশী পিস্তল, চারটি ম্যাগজিন ও আট রাউন্ড গুলিসহ মাদক ও ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী জব্দ করা হয়।
এ দিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজারে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের আলীখালীতে ধানের শীষের প্রার্থীর প্রচারণার গাড়িকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটেছে। আলীখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ২৫ নম্বর ক্যাম্পে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শিশুসহ পাঁচজন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে দুইজন রোহিঙ্গা ও তিনজন বাংলাদেশী নাগরিক। স্থানীয়রা জানায়, রাতে ধানের শীষের প্রার্থীর প্রচারণার গাড়ি আলীখালীতে পৌঁছলে গুলির ঘটনা ঘটে। তবে ওই গুলি কে বা কারা করেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত বৃহস্পতিবার সেনাসদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদফতরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ২০ জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৪ দিনে আমরা দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করেছি। যার বেশির ভাগই বিদেশী পিস্তল। সেনাবাহিনী এ পর্যন্ত ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র, ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে এবং ২২ হাজার ২৮২ জন এবং দুষ্কৃতিকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।
র্যাব সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত র্যাবের অভিযানে পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ২৩৬টি এবং র্যাবের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ৯৩টি। অন্যান্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ৯৬০টি।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র জানায়, সারা দেশে সীমান্ত এলাকাসহ বিজিবির অভিযানে গত ৫ আগস্ট থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত অস্ত্র ও আসামি আটক করা হয়েছে। তার মধ্যে এসএমজি-দুইটি, রাইফেল ১৬টি, রিভলবার পাঁচটি, পিস্তল ৯০টি, অন্যান্য ক্যাটাগরীর অস্ত্র ১০২টি, গোলাবারুদ ২ হাজার ৩১১টি, ম্যাগাজিন ৮১টি, মর্টার শেল ১৩টি, গান পাউডার ২০ কেজি, গ্রেনেড ২৩টি, ককটেল ১৯৫টি, মাইন চারটি এবং আসামি আটক রয়েছে ৩২ জন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব:) এমদাদুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে দুই ধরনের শঙ্কা রয়েছে। প্রথমত. এটা ইনক্লুসিভ নির্বাচন হচ্ছে না। এখানে যাদের বাদ দেয়া হয়েছে তারা তো ঝামেলা করতেই পারে। দ্বিতীয়ত. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র এখনো অপরাধীদের হাতে রয়েছে। সেই অস্ত্রগুলোতো সাধারণ মানুষের কাছে নেই। যাদের কাছে আছে তারা তো ভালো মানুষ না। ফলে এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা না গেলে তো আরো বেশি বিশৃঙ্খলা ঘটতে পারে।
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: ওমর ফারুক বলেন, নির্বাচনের আগে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় জননিরাপত্তার জন্য শঙ্কা বা ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে। এই অস্ত্রগুলো নির্বাচনের শঙ্কা বাড়িয়ে তুলবে। এগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব অস্ত্র দিয়ে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে বিভিন্ন জায়গায় ভয়ানক চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না। নির্বাচনের পরও এসব আগ্নেয়াস্ত্রের বেশ ঝুঁকি থাকবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠুর পেছনে বড় ভূমিকায় থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এবারের নির্বাচনে সম্মিলিতভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেভাবে নিরাপত্তার কথা ভাবছেন সেখানে নির্বাচন নির্বিঘেœ হওয়ার কথা কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ও প্রচারণার পর দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি না কমলে এর প্রভাব নির্বাচনের মাঠে পড়বে। তিনি বলেন, লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র বা অবৈধ অস্ত্র এগুলো সমাজে চরম ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করছে। নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য এগুলো মারাত্মক হুমকি। সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে পুরোপুরি সফলতা দেখাতে পারেনি। পাশাপাশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় রয়ে গেছে। এসব অস্ত্র যারা নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছে, নিশ্চয়ই তাদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, সরকারের নির্দেশনায় আমরা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। এরই মধ্যে যৌথবাহিনীর অভিযানে গত কয়েক দিনে বিপুল অস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনে যেন কোনো অবৈধ বা লুণ্ঠিত অস্ত্র ব্যবহার না বারে সেজন্য যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য এবং আনসার সদস্য মোতায়েন রয়েছে। আশা করি নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের দিন বা পরে অস্ত্রের ব্যবহার কমবে। আসামিরাও গ্রেফতার হয়ে যাবে।



