নিজস্ব প্রতিবেদক
এক বছর আগেও একবার আগুন লেগেছিল কারখানাটিতে। এলাকাবাসী তখনো প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অবৈধ কারখানা সরানো হয়নি। সেই একই কারখানায় এবার আগুনের শিখা কেড়ে নিল পাঁচটি তাজা প্রাণ। শনিবার দুপুরে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আমবাগিচা এলাকায় একটি অবৈধ গ্যাস লাইটার কারখানায় এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিটের দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে পাঁচজন শ্রমিকের পোড়া লাশ।
শনিবার বেলা ১টা ১১ মিনিটে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কদমতলী চৌরাস্তার নিকটবর্তী আমবাগিচা এলাকায় আকরাম মিয়ার বাড়িতে স্থাপিত ‘এসআর গ্যাস লাইটার’ কারখানায় আগুনের সূত্রপাত হয়। কারখানাটি মূলত বাড়ির মালিকের ছেলে আক্তার হোসেনের মালিকানাধীন। দাহ্য রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতির কারণে মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে বেলা ১টা ১৬ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট কাজ শুরু করে, পরে আগুনের তীব্রতা বাড়লে আরো চারটি ইউনিট যোগ দেয়। ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিটের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুপুর আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের পরিদর্শক মো: আনোয়ারুল ইসলাম জানান, আগুনের তীব্রতায় উদ্ধার হওয়া পাঁচটি লাশই এমনভাবে পুড়ে গেছে যে তারা নারী নাকি পুরুষ, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ দিকে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট শামীম হোসেন জানিয়েছেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫ জন আহত হয়েছেন।
কারখানার বাইরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে ওই এলাকার বাতাস। ২৫ বছর বয়সী সাব্বির নামের এক যুবক তার মা মঞ্জু বেগমের খোঁজে কারখানার গেটে প্রহর গুনছেন। ছলছল চোখে সাব্বির জানান, তার মা আজই প্রথম এই কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন। একইভাবে সাগর হোসেন নামের একজন তার বোন শাহিনুর আক্তারের সন্ধান করছিলেন। আগুনের পর থেকেই শাহিনুরের ফোন বন্ধ। স্বজনদের দাবি অনুযায়ী, এখনো অন্তত একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘তালাবদ্ধ গেট’ : এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে করুণ দিক ফুটে উঠেছে কারখানার এক কিশোরী শ্রমিকের বর্ণনায়। ১২ বছর বয়সী ওই কিশোরী গত আট মাস ধরে সেখানে কাজ করছিল। সে জানায়, আগুন লাগার পর সে প্রাণের ভয়ে প্রধান গেটের দিকে দৌড়ে যায়; কিন্তু গেটটি তালাবদ্ধ ছিল। বেশ কিছু সময় পর বাইরে থেকে গেট খোলা হলে সে কোনোমতে বেরিয়ে আসে।
কারখানার পাশের এক দোকানদার জানান, আগুন লাগার পর শ্রমিকরা বাঁচার জন্য গেটের কাছে এসে চিৎকার করলেও দারোয়ান গেট খুলতে রাজি হয়নি। ফলে ভেতরে আটকা পড়া শ্রমিকরা বিকল্প পথ খুঁজতে থাকেন। এই চরম অবহেলাই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
আবাসিক এলাকায় মরণফাঁদ : স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, আবাসিক এলাকায় এমন বিপজ্জনক কারখানা স্থাপন করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এক বছর আগেও এখানে একবার আগুন লেগেছিল; কিন্তু মালিক পক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তদন্ত শেষে আগুন লাগার সঠিক কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
উদ্ধার অভিযান শেষে ঢাকা জোন (দক্ষিণ) ফায়ার সার্ভিসের কমান্ডার ফয়সালুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে, ভেতরটি পুরোপুরি তল্লাশি করে চূড়ান্ত তথ্য জানানো হবে।’


