জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট প্রশ্নে বিভাজন

সরকার ও বিরোধী জোটে টানাপড়েন ক্রমেই তীব্র

ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং বিরোধী জোট জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন শক্তিগুলোর মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে বিল আকারে পাস না করা, পাস হওয়া বিলগুলোতে সংশোধনী এনে বিরোধীদের মতামত উপেক্ষা করা এবং গণভোটের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান- এসব ইস্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক অচলাবস্থার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মাথায় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং বিরোধী জোট জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন শক্তিগুলোর মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে বিল আকারে পাস না করা, পাস হওয়া বিলগুলোতে সংশোধনী এনে বিরোধীদের মতামত উপেক্ষা করা এবং গণভোটের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান- এসব ইস্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক অচলাবস্থার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ক্ষমতাসীন বিএনপির বক্তব্য, যেসব অধ্যাদেশ এখনো পাস হয়নি, সেগুলো নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী জোটের অভিযোগ, জুলাই সনদ ও গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সরকার কার্যত জনরায়কে অস্বীকার করছে। তাদের মতে, অতীতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে দলীয়করণের অভিযোগ ছিল, বিএনপিও একই পথে হাঁটছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সরকার গঠনের সূচনালগ্নেই এমন মতবিরোধ রাজনীতির জন্য অশনিসঙ্কেত হতে পারে এবং তা ভবিষ্যতে সঙ্ঘাতের দিকে গড়াতে পারে।

গণভোট প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা আদালতে বিচারাধীন এবং আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেছেন, সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলো পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করা হবে। সরকারি দলের নেতারা দাবি করছেন, রহিত হওয়া সাতটি অধ্যাদেশের মধ্যে মানবাধিকার কমিশন আইন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ আইন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আরো বিস্তৃত পরামর্শ ও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

বিরোধী শিবিরের অবস্থান আরো কঠোর। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এটি কোনো একক দল বা জোটের বিষয় নয়- এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও শহীদদের রক্ত যেন বৃথা না যায়, সেজন্য আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব। যেকোনো অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক শক্তির বিরুদ্ধেই আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’

রোববার ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিএনপি একতরফা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের মাধ্যমে বিএনপি নিজেদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও লঙ্ঘন করছে। একই সাথে তিনি ভবিষ্যতে ‘ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত পরাজয়’ এবং ‘জনগণের বিজয়’ নিশ্চিত করতে দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, দেশে আবার কোনো স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। তার দাবি, জনগণের বড় অংশের রায় উপেক্ষা করলে সরকারকে গ্রহণযোগ্যতা সঙ্কটে পড়তে হবে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সময়ের সাথে সাথে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভাজনরেখা আরো স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, বিবৃতি এবং রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই সঙ্খাতমুখী হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দুই পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ও প্রচারযুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কের টানাপড়েন নতুন নয়; এর সূত্রপাত কয়েক বছর আগে থেকেই। তবে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই সম্পর্কের টানাপড়েন নতুন মাত্রা পায়। গণভোটের সময়সূচি এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে তখন থেকেই দুই দলের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠপর্যায়েও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতায় বিএনপি এবং বিরোধী অবস্থানে জামায়াতে ইসলামী- এই নতুন বাস্তবতায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অনিবার্যভাবে তীব্র হচ্ছে। তবে তারা মনে করেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে টেকসই করতে হলে উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, পূর্বের রাজনৈতিক সমীকরণ- যেখানে বিএনপি ও জামায়াত একসাথে বৃহত্তর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিত- বর্তমানে আর কার্যকর নেই। ফলে অভ্যন্তরীণভাবে নতুন ক্ষমতার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ায় মতবিরোধ আরো বাড়তে পারে, এমনকি সহিংসতার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে জুলাই সনদসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশ পাস না করা বা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ- সবখানেই এই ইস্যু নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। ফলে বিএনপির সাথে জামায়াত-এনসিপিসহ বিরোধী দলগুলোর দূরত্ব আরো বাড়ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মন্তব্য করেন, বিএনপি অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়নি। তিনি মনে করেন, সরকারের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে পুনর্বিবেচনা জরুরি।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বিএনপির সাথে তাদের কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা এবং গণভোটের প্রশ্নে অস্বীকৃতির কারণেই দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তার অভিযোগ, বিএনপি আওয়ামী লীগের পথ অনুসরণ করছে এবং দেশকে আবার এককেন্দ্রিক শাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক। তবে এই পার্থক্য যেন কোনোভাবেই সঙ্ঘাতে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমেই সব রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

সার্বিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, জুলাই সনদ ও গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা কেবল নীতিগত মতপার্থক্যে সীমাবদ্ধ নেই- বরং এটি ক্রমেই ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, আস্থার সঙ্কট এবং সম্ভাব্য সঙ্ঘাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই সঙ্কট সংলাপের মাধ্যমে নিরসন হবে, নাকি আরো গভীর রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকে দেশকে ঠেলে দেবে।