আইসিটির সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে ২ প্রসিকিউটরের মুখোমুখি অবস্থান

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সিসিটিভি সিস্টেমের হার্ড ড্রাইভ বদলে ফেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ গায়েব হওয়া নিয়ে দুই প্রসিকিউটর সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বক্তব্য প্রদান করেছেন। প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে হার্ড ড্রাইভ কারসাজির অভিযোগ তুললেও অপর প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম একে ভিত্তিহীন ও ব্যক্তিগত মন্তব্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ফলে পুনর্গঠিত প্রসিকিউশন টিমের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সিসিটিভি সিস্টেমের হার্ড ড্রাইভ বদলে ফেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ গায়েব হওয়া নিয়ে দুই প্রসিকিউটর সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বক্তব্য প্রদান করেছেন। প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে হার্ড ড্রাইভ কারসাজির অভিযোগ তুললেও অপর প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম একে ভিত্তিহীন ও ব্যক্তিগত মন্তব্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ফলে পুনর্গঠিত প্রসিকিউশন টিমের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদের একটি বিস্ফোরক ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। সেখানে অভিযোগ করা হয়, ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলার আসামি সাবেক পুলিশ উপ-পরিদর্শক শেখ আফজালুল হকের স্ত্রী একটি ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসাইন তামিমের কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন। সুলতান মাহমুদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে পরবর্তীতে আফজালুলকে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী করা হয় এবং তিনি খালাস পান। সুলতান আরো দাবি করেন, বিষয়টি তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের নজরে আনা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি; বরং তাকেই তিরস্কার করা হয়েছিল। তবে অভিযুক্ত প্রসিকিউটর এবং সাবেক চিফ প্রসিকিউটর উভয়ই এই অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন।

বিতর্কিত এই সিসিটিভি ফুটেজের বিষয়ে প্রসিকিউটর ও কম্পিউটার ফরেনসিক ইনভেস্টিগেটর তানভীর হাসান জোহা জানান, সিসিটিভি সিস্টেম লকার পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হার্ড ড্রাইভ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। রেজিস্ট্রার রেকর্ড অনুযায়ী, চতুর্থ নেটওয়ার্ক ভিডিও রেকর্ডারের (ঘঠজ) হার্ড ড্রাইভটি ‘নষ্ট বা হ্যাকড’ হওয়ার অজুহাতে ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর অফিসিয়াল নির্দেশে পরিবর্তন করা হয়। তবে বেশ কয়েকজন প্রসিকিউটর প্রশ্ন তুলেছেন, হ্যাকিংয়ের সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও কেন ড্রাইভটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ না করে বা থানায় জিডি না করে দ্রুত প্রতিস্থাপন করা হলো। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘বারুণ’ জানিয়েছে, তারা ওয়ারেন্টির অধীনে নতুন ড্রাইভ লাগিয়ে দিয়েছে, যার ফলে পুরনো ফুটেজ উদ্ধারের সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

অন্য দিকে, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম এই অভিযোগগুলোকে ‘অনভিপ্রেত’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেছেন, ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষের মতে কোনো ফুটেজ গায়েব হয়নি। তার মতে, গত ১০ মার্চ গঠিত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি এখনো সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করেনি এবং জোহাকে এ বিষয়ে কোনো দায়িত্বও দেয়া হয়নি। ট্রাইব্যুনাল রেজিস্ট্রার এ এস এম রুহুল ইমরান সিসিটিভি সরঞ্জাম পরিবর্তনকে ‘রুটিন রক্ষণাবেক্ষণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং জানিয়েছেন, সুলতান মাহমুদ ফুটেজ পাওয়ার জন্য কোনো লিখিত আবেদন করেননি।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, হার্ড ড্রাইভ পরিবর্তনের বিষয়টিসহ সকল অভিযোগ তদন্তের আওতায় থাকবে এবং আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ইতোমধ্যে নোটিশ পাঠানো হয়েছে যাতে তারা কমিটির সামনে হাজির হয়ে জবানবন্দী দেন। তদন্ত চলাকালে প্রসিকিউটরদের এমন প্রকাশ্য বিপরীতমুখী অবস্থান ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।

জয়-পলকের মামলা

জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১২ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চ এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদার এবং বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এদিন অনুপস্থিত ছিলেন।

গতকাল এই মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন আতিকুর রহমান। তিনি সিআইডি ঢাকার আইটি ফরেনসিক বিভাগে উপ-পরিদর্শক (পরিদর্শক) হিসেবে কর্মরত। জবানবন্দীতে তিনি জানান, গত ৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা থেকে পাঠানো পাঁচজনের কণ্ঠস্বর (ভয়েস) পরীক্ষা করে তিনি রিপোর্ট প্রদান করেছেন। এ সময় তিনি কোন পদ্ধতিতে পরীক্ষা চালিয়েছেন, কাদের কণ্ঠ পরীক্ষা করেছেন এবং কী ফলাফল পেয়েছেন, তা আদালতের কাছে বিস্তারিত উপস্থাপন করেন। সাক্ষীর জবানবন্দী শেষে তাকে জেরা করেন জুনাইদ আহমেদ পলকের আইনজীবী আমিনুল গনি টিটু।

কামরুল ইসলামের স্বাস্থ্য প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে মানবতাবরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে আগামী ৯ এপ্রিলের প্রতিবেদন দাখিল করতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ দেন।

গত ৩১ মার্চ ক্যান্সার আক্রান্ত দাবি করে উন্নত চিকিৎসার নির্দেশনা চেয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে একটি আবেদন করেন কামরুল ইসলাম। এ নিয়ে শুনানির জন্য ১ এপ্রিল দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আবেদনটির ওপর গতকাল শুনানি হয়। পরে স্বাস্থ্য প্রতিবেদন দিতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর ওই বছরের ১৮ নভেম্বর রাজধানীর উত্তরা থেকে ঢাকা-২ আসনের সাবেক এই সংসদ সদস্যকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার ঘটনায় করা কয়েকটি মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে।

এদিন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার অগ্রগতি জানতে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হন তার পরিবারের সদস্যরা। অন্য দিকে, জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওবায়দুল কাদের, পরশ-নিখিল, সাদ্দাম-ইনানসহ সাতজনের বিরুদ্ধে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ৭ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

এ ছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জেআইসিতে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার সাক্ষী ইকবাল চৌধুরীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

এই মামলার সাক্ষী হিসেবে ইকবাল চৌধুরী দুই দিন জবানবন্দী দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালের ৭ মে তাকে মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়। ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।