সম্প্রতি করা এক জরিপের ভোটার মনোভাব বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত ভোটযুদ্ধের প্রচারণায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান এগিয়ে থাকলেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে আছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা-১৫ ও ঢাকা-১৭ আসনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সংস্থা সোচ্চার-টর্চার ওয়াচডগ পরিচালিত জরিপের তথ্য গতকাল তারা প্রকাশ করেছে।
রাজধানীর বিডিবিএল ভবনে গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সোচ্চার-টর্চার ওয়াচডগ বাংলাদেশ’ এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। জরিপের ফল উপস্থাপন করেন সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট ও নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. শিব্বির আহমদ।
ঢাকা-১৫ আসনে দুই শফিকের লড়াই : নির্বাচনে প্রচারণায় এই আসনে জমে উঠেছে ‘দুই শফিকের’ লড়াই। তবে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান ও বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের মধ্যে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এখনো স্পষ্ট ফয়সালা হয়নি। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, ভোটারদের বড় অংশ জামায়াত প্রার্থীকে এগিয়ে রাখছেন, যদিও বিএনপিও শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
জরিপে ‘আপনি কী মনে করেন এই আসনে কে জিততে পারে?’ এই প্রশ্নে ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ঢাকা-১৫ আসনে জয়ী হবেন জামায়াত প্রার্থী ডা: শফিকুর রহমান। অপর দিকে ৩০ শতাংশ মনে করেন বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন জিততে পারেন। জরিপ অনুযায়ী, ওই আসনে ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা এখনো নিশ্চিত নন। ১২ দশমিক ১ শতাংশ মতপ্রকাশ করতে চাননি এবং অল্পসংখ্যক উত্তরদাতা অন্য বিকল্পের কথা বলেছেন।
জরিপে পুরুষ ভোটারদের মধ্যে জামায়াত প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা দেখছেন ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ। বিএনপির পক্ষে মত দিয়েছেন ২৬ শতাংশ পুরুষ ভোটার। নারীদের মধ্যেও জামায়াত প্রার্থী এগিয়ে- ৩৮ দশমিক ১ শতাংশের মতো। তবে নারীদের মধ্যে বিএনপির প্রতি সমর্থন তুলনামূলক কম ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ। নারী ভোটারদের মধ্যে ‘জানি না’ ও ‘বলতে চাই না’- এই প্রবণতাও তুলনামূলক বেশি।
আর বয়স অনুযায়ী ভোটারদের পছন্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ২৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ জামায়াত প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। বিপরীতে বিএনপিকে সমর্থন ১৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। এই বয়সীদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীন ভোটারও উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও ২৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে জামায়াত প্রার্থীর সমর্থন ৫৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ, বিএনপির ৫২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এখানে লড়াই সবচেয়ে কাছাকাছি।
এ দিকে ৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যে জামায়াত প্রার্থী সবচেয়ে এগিয়ে। এখানে তারা ৭১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বিএনপির সমর্থন ৫৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। ৪৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সীদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন ২৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ, বিএনপির ২৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। ৫৫ বছরের ঊর্ধ্বে ভোটারদের মধ্যেও জামায়াত প্রার্থী এগিয়ে- ২১ দশমিক ৪১ শতাংশ। তবে এই বয়সী ভোটারদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতার হার তুলনামূলক বেশি।
ঢাকা-১৭ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস : এ দিকে ঢাকা-১৭ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের স্পষ্ট আভাস মিলেছে। এই আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতের প্রার্থী ডা: এস এম খালিদুজ্জামানের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই জরিপে দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ ভোটার তারেক রহমানকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। আর ৩২ শতাংশের সমর্থন ডা: এস এম খালিদুজ্জামানের প্রতি। তবে এখনো প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভোটার সিদ্ধান্তহীন থাকায় শেষ মুহূর্তে ফল বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা-১৭ আসনের ৫১৫ জন ভোটারের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপ অনুযায়ী, ৩ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার অন্যান্য প্রার্থীদের এবং ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার ভোট না দেয়ার কথা বলেছেন। অন্য দিকে ১০ শতাংশ ভোটার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। ১৫ শতাংশ ভোটার তাদের পছন্দের কথা প্রকাশ করতে রাজি হননি। অর্থাৎ প্রায় ২৫ শতাংশ ভোটারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
জরিপে দেখা যায়, পুরুষ ভোটারদের ৩৯ শতাংশ তারেক রহমানকে এবং ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াত প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন। নারীদের মধ্যে এই হার যথাক্রমে ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২৭ দশমিক ২ শতাংশ। তবে নারীদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতার হার বেশি (প্রায় ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ)।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫৫ বছরের বেশি বয়সী ভোটারদের মধ্যে তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি (৪৭ শতাংশ)। অন্য দিকে জামায়াত প্রার্থীর প্রতি সমর্থন ২৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন ভোটারদের ৪৩ শতাংশ বিএনপিকে এবং ২৪ শতাংশ জামায়াতকে সমর্থন জানিয়েছেন। উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে দুই দলের সমর্থনই প্রায় সমান (৩১ শতাংশ)। তবে এইচএসসি বা সমমান শিক্ষিত ভোটারদের ৩৯ শতাংশ জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে মত দিয়েছেন। পেশার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে বিএনপির জনপ্রিয়তা বেশি। তবে বেসরকারি চাকরিজীবী ও গৃহিণীদের পছন্দের তালিকায় সামান্য এগিয়ে আছেন জামায়াত প্রার্থী।
কে জিততে পারেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন তারেক রহমানই জয়ী হবেন। অন্য দিকে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ মনে করেন ডা: এস এম খালিদুজ্জামান জিতবেন।
জরিপ সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের ভূমিকা ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শেষ পর্যন্ত এই অনিশ্চিত ভোটাররা কোন দিকে ঝুঁকবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে ঢাকা-১৭ আসনের চূড়ান্ত ফলাফল।



