দেশের ব্যাংকিং খাতে আর্থিক দুর্বলতা ও সুশাসনের সঙ্কট আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ১৭টি ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, আর ২০২৫ সালে ১১টি ব্যাংক কোনো ধরনের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) ব্যয় করেনি। এই চিত্র দেশের ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থার বড় একটি সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি, দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমেও।
১১টি ব্যাংকে সিএসআর ব্যয় শূন্য : সিএসআর কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যে ১১টি ব্যাংক কোনো সিএসআর ব্যয় করেনি। ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। সিএসআর কার্যক্রম সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পে ব্যয় করা হয়। কিন্তু এসব ব্যাংকের শূন্য ব্যয় দেখাচ্ছে যে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সঙ্কট কাটাতে এতটাই ব্যস্ত যে সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিএসআর ব্যয়ের অনুপস্থিতি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার দুর্বলতার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিও অনীহা প্রকাশ করে।
২০২৪ সালে ১৭টি ব্যাংক মুনাফা করতে পারেনি : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ১৭টি ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জন করতে পারেনি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও দুর্বল বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো- জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। মুনাফাহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে- উচ্চ খেলাপি ঋণ, অনাদায়ী সুদ আয়, পরিচালন ব্যয়ের বৃদ্ধি, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ঋণ বিতরণে অনিয়ম এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত ঋণ বিতরণ এবং পুনঃতফসিলের কারণে চাপে রয়েছে। অনেক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এতটাই বেড়েছে যে তারা নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে।
৬টি ব্যাংক মুনাফা না থাকলেও সিএসআর ব্যয় করেছে : প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ২০২৪ সালে মুনাফা না থাকলেও ২০২৫ সালে ছয়টি ব্যাংক সিএসআর ব্যয় করেছে। এটি একদিকে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হলেও অন্য দিকে প্রশ্নও তুলছে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো কিভাবে সিএসআর তহবিল পরিচালনা করছে? বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ব্যাংক পূর্ববর্তী বছরের রিজার্ভ বা অবশিষ্ট সিএসআর ফান্ড ব্যবহার করে এ ব্যয় করেছে। তবে মুনাফা না থাকা অবস্থায় সিএসআর ব্যয় অব্যাহত রাখা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
ব্যাংক খাতের গভীর সঙ্কট : বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতের আরো বড় সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করছে। দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। বড় ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করেও নতুন সুবিধা পাচ্ছেন। ফলে ব্যাংকের আয় কমে যাচ্ছে এবং মুনাফা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণগুলো হলো- খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি। অনেক ব্যাংকের মোট ঋণের বড় অংশই খেলাপি। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দুর্বল করপোরেট সুশাসন। পরিচালনা পর্ষদে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রযুক্তিগত দুর্বলতা। কিছু ব্যাংকে এখনো পুরনো সফটওয়্যার ও ম্যানুয়াল সিস্টেম ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মূলধন ঘাটতি। মুনাফা না থাকায় অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা হার কমে যাচ্ছে।
সিএসআর ব্যয়ে বৈষম্য : ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিছু ব্যাংক উল্লেখযোগ্য সিএসআর ব্যয় করলেও অনেক ব্যাংক একেবারেই নিষ্ক্রিয়। মোট সিএসআর ব্যয় হয়েছে ৩৪৫.০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে-শিক্ষা খাতে ৯৮.৪৪ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৮৫.৬৪ কোটি টাকা, পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে ৩৪.৫০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১২৬.৪৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ, কিছু শক্তিশালী ব্যাংকই মোট সিএসআর ব্যয়ের বড় অংশ বহন করছে। এতে ব্যাংক খাতের মধ্যে আর্থিক সক্ষমতার বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব : ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা সরাসরি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। ব্যাংকগুলো দুর্বল হলে- শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, কর্মসংস্থান কমে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়। বিশেষ করে সিএসআর, কৃষি ও রফতানি খাত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর প্রভাব আরো বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করা। এ জন্য পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। প্রযুক্তি আধুনিকীকরণের জন্য ব্যাংকিং সফটওয়্যার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে হবে। সিএসআর নীতিমালা কঠোর করতে মুনাফাভিত্তিক সিএসআর ব্যয় বাধ্যতামূলক পর্যবেক্ষণে আনতে হবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে ১১টি ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় শূন্য এবং ২০২৪ সালে ১৭টি ব্যাংকের মুনাফাহীনতা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য উদ্বেগজনক সঙ্কেত। এটি শুধু আর্থিক দুর্বলতার নয় বরং দীর্ঘদিনের সুশাসন সঙ্কট, খেলাপি ঋণ সমস্যা এবং ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যদি দ্রুত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে ব্যাংক খাতের এই দুর্বলতা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।



