সিআইপিজির সেমিনারে বক্তারা

গণভোটের রায় উপেক্ষা করা জাতির সাথে চরম প্রতারণা

যদি এই সংসদ ও সরকার সংস্কারের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে একনায়কত্বের পথে হাঁটে, তবে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে ‘দ্বিতীয় জুলাই’ বিপ্লবের মাধ্যমে রাজপথেই এর চূড়ান্ত ফয়সালা করা হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
জাতীয় প্রেস ক্লাবে সিআইপিজির সেমিনারে অতিথিরা  : নয়া দিগন্ত
জাতীয় প্রেস ক্লাবে সিআইপিজির সেমিনারে অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবের আকাক্ষা বাস্তবায়ন এবং চলমান সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও আইনজ্ঞরা। গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের একটি মিলনায়তনে সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (সিআইপিজি) আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার ও সংসদ জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং ‘জুলাই সনদে’র প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে নতুন ধরনের স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী নীতি কায়েমের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে প্রতিফলিত জনমত ও গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা জাতির সাথে ‘চরম প্রতারণা’ উল্লেখ করে তারা বলেন, যদি এই সংসদ ও সরকার সংস্কারের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে একনায়কত্বের পথে হাঁটে, তবে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে ‘দ্বিতীয় জুলাই’ বিপ্লবের মাধ্যমে রাজপথেই এর চূড়ান্ত ফয়সালা করা হবে।

সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর সম্পাদিত ‘জুলাই সনদ’ এবং এর ওপর ভিত্তি করে হওয়া গণভোটের রায় উপেক্ষা করা জাতির সাথে চরম প্রতারণা। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে অস্বীকার করে কোনো সংসদ বা সরকার টিকে থাকতে পারে না। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে জনগণ সংস্কারের পক্ষে যে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা বর্তমান সংসদের নৈতিক ও আইনগত বাধ্যবাধকতা। কিন্তু এখন সংসদে দাঁড়িয়ে যারা একে অস্বীকার করছেন, তারা ইতিহাসের সেরা মিথ্যাচার ও জনগণের ম্যান্ডেটের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।

সিআইপিজির এই সেমিনারে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন সাধারণ কোনো অভ্যুত্থান ছিল না, এটি ছিল একটি ‘ইনক্লুসিভ রেভুলেশন’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক বিপ্লব। শিশু, বৃদ্ধ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব পেশার মানুষ এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। অথচ দুঃখজনকভাবে ৫ ও ৬ আগস্ট যখন ক্যান্টনমেন্ট ও বঙ্গভবনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছিল, তখন মূল স্টেকহোল্ডার জুলাই যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন না। রাজনৈতিক দলগুলোর তৎকালীন দলীয় এজেন্ডা ও নেত্রীকেন্দ্রিক অবস্থানের কারণে সেদিন বিপ্লবী সরকার গঠন করা সম্ভব হয়নি, যাকে তিনি ‘ট্রেন মিস করা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি জানান, জামায়াতে ইসলামীর জোরালো দাবির কারণেই পরবর্তীকালে ছাত্র প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়া হয়েছিল।

বর্তমান সংসদের কার্যক্রমের তীব্র সমালোচনা করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আগের ফ্যাসিবাদী সংসদ যে নীতিতে চলত, বর্তমান সংসদের আচরণে জনগণ তার কোনো পার্থক্য দেখছে না। পার্লামেন্টের ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে না এবং বিরোধী দলকে আস্থায় না নিয়ে রাজপথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, যা নতুন রাজনৈতিক সঙ্কটের জন্ম দিচ্ছে। এমনকি সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘন করে তিন দিন আগে বিলের কপি দেয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হচ্ছে মাত্র তিন মিনিট আগে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি ল্যাপস করা হয়েছে এবং বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের অধীনে রাখার অপচেষ্টা চলছে। তার মতে, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন ও মানবাধিকার কমিশনের মতো মৌলিক অধ্যাদেশগুলো বাতিল করা এবং বিচার বিভাগকে প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে নেয়া মানেই হলো রাষ্ট্র কাঠামোকে পুনরায় দলীয়করণ ও ফ্যাসিবাদের দিকে ঠেলে দেয়া।

দেশের বর্তমান সঙ্কট নিয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে মন্ত্রীরা সংসদে দাঁড়িয়ে তামাশা করছেন। মন্ত্রী ১০২ ধারায় বিবৃতি দিয়ে বলেন তেলের সঙ্কট নেই, অথচ পেট্রল পাম্পের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তখন খিল খিল করে হাসে। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির নেতাদের মজুদদারি ও লুটপাট না থামার কারণে সঙ্কট আরো বেড়েছে। অর্থমন্ত্রীর অসহায়ত্ব প্রকাশ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সঙ্কট নিরসনের জন্যই জনগণ আপনাদের ক্ষমতায় পাঠিয়েছে, অজুহাত দেয়ার জন্য নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। যদি মালিকের অর্পিত দায়িত্ব পালনে এই সংসদ ব্যর্থ হয়, তবে জনগণ যেকোনো সময় তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও চেতনা রক্ষা করতে প্রয়োজনে ‘দ্বিতীয় জুলাই’ বিপ্লবের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য তিনি দেশপ্রেমিক জনতাকে উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, গায়ের জোরে রাষ্ট্র চালানোর চেষ্টা করলে অতীতের একনায়কদের মতো করুণ পরিণতি বরণ করতে হবে।

নাপিত যখন সার্জারি করে, তখন রাষ্ট্র সঙ্কটে পড়ে : ফুয়াদ

সেমিনারে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ তার বক্তব্যে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মুক্তির লড়াই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি শত বছরের এক চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু দুঃখজনকভাবে একটি নির্দিষ্ট ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন যে আমাদের ইতিহাস কেবল ১৯৭১ সালের ৯ মাস। এই ইতিহাসের ট্র্যাপ বা ফাঁদ ভাঙার একটি সুপ্রিম এক্সপ্রেশন ছিল ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান।’

তিনি বর্তমান সংসদের বিতর্কিত ভূমিকার সমালোচনা করতে গিয়ে একটি রূপক উদাহরণ টেনে বলেন, ‘ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে নাপিত যখন সার্জারি করতে যায়, তখন রোগীর যা দশা হয়, বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের আজ সেই দশা হয়েছে। আমাদের কিছু ‘নাপিত সংবিধান বিশেষজ্ঞ’ তৈরি হয়েছে যারা প্রতিদিন গুম প্রতিরোধ আইন, মানবাধিকার কমিশন আইন ও জুলাই জাদুঘরের অধ্যাদেশসহ জনগুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো বাতিল বা পরিবর্তন করছেন। তারা জনগণের আকাক্সক্ষা না বুঝে শুধু ক্ষমতার জোরে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।’

ব্যারিস্টার ফুয়াদ বিএনপির বর্তমান অবস্থানের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমরা আপনাদের গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি বলে জানতাম। কিন্তু বর্তমানে আপনাদের আচরণে আপনাদেরই চেনা দায় হয়ে পড়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘জনগণই ঠিক করে রাষ্ট্র থাকবে কি থাকবে না। পাকিস্তান রাষ্ট্র আমাদের পূর্বপুরুষরাই বানিয়েছিলেন, আবার যখন দেখা গেছে সেই রাষ্ট্র জনগণের আকাক্সক্ষার সাথে বেইমানি করছে, তখন তারাই সেই রাষ্ট্র ভেঙে বাংলাদেশ গড়েছেন। সুতরাং সংবিধান নয়, জনগণই চূড়ান্ত শক্তির উৎস।’

তিনি বিএনপি নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনাদের চোখের ওপর ক্ষমতার যে ছানি পড়েছে, তা দ্রুত সার্জারি করুন। তবে মনে রাখবেন, এই অপারেশন কোনো ‘নাপিত’ দিয়ে করাবেন না, দক্ষ ডাক্তার দিয়ে করান।

বিজয় ধরে রাখতে না পারা আমাদের ব্যর্থতা : মেজর আক্তারুজ্জামান

সেমিনারে সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব:) আক্তারুজ্জামান তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠোর বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা স্রোতের উল্টো দিকে চলেন, তারা ভাঙেন এবং গড়েন। আমি কোনো জ্ঞানী-গুণী বা আইন বিশেষজ্ঞ নই, আমি একজন মাঠের রাজনীতিবিদ। আমাদের বাস্তবতা হলো জনমত তৈরি করা, যা কেবল রাজপথেই সম্ভব।’

তিনি মনে করেন, সংবিধানে যাই থাকুক না কেন, সংসদে যার ‘টু-থার্ড’ মেজরিটি থাকবে, সংবিধান তার কাছে কোনো বড় বিষয় নয়। তিনি সোজাসাপ্টা ভাষায় বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন হবে কি হবে না, তা আমি সেদিনই ডিসাইড করব যেদিন সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে যাব। সেদিন প্রয়োজনে এই সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিয়ে নতুন সংবিধান লিখব। ৫ আগস্টের প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, সেদিন আমরা বিপ্লবে হেরে গেছি। বিপ্লব বা অভ্যুত্থান হলে ক্ষমতা রাজপথের যোদ্ধাদের হাতে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমরা ক্ষমতা একজনের হাতে তুলে দিলাম, আর তিনি যাদের প্ল্যানে আসলেন, তারা পরে পেছন থেকে সরে গেল। ৫ আগস্টের পর কেন আমাদের ৮ আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো? কেন সেদিন কেউ দাঁড়িয়ে বলতে পারল না যে আমিই সরকার?

তিনি অভিযোগ করেন যে, একটি নির্দিষ্ট মহল ড. ইউনূসকে সামনে রেখে সংস্কারের নামে সময়ক্ষেপণ করতে চেয়েছিল যাতে তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা তাদের চেয়েও বেশি চতুর হওয়ায় সেই ছক সবসময় সফল হয় না।

উচ্চ আদালতের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, এক সময় সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সমাজ ও বিচার ব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ভাগ করে নিয়েছিল। তিনি রূপকভাবে বলেন, ‘ডক্টর কামাল হোসেনরা যাতে সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্ট দুই জায়গার মামলাই ‘খাতে’ পারেন, সে জন্য আদালতের সময়সূচিও সেভাবে সমন্বয় করা হতো।’

সিআইপিজি আয়োজিত ‘জুলাই পরিবর্তনোত্তর প্রতিশ্রুতি সংস্কারের পথরেখা বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ : নাগরিক সমাজের দায়’ শীর্ষক এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও সিআইপিজির চেয়ারম্যান ড. মোজাম্মেল হক। সাবেক সচিব (অব:) মু. আবদুল কাইয়ূমের সঞ্চালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন।