- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব:) ইকবাল করিম ভূঁইয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্বীকার করেছেন যে, তার কার্যকালে দেশে গুমের ঘটনা ঘটছিল এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (এমআই) তাকে এ বিষয়ে অবহিত করেছিল। তবে গুম হওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা বা উদ্ধারের দায়ভার তার ছিল না বলে তিনি আদালতকে জানান। গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনালে শতাধিক গুম ও হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের আইনজীবীর জেরার মুখে তিনি এসব তথ্য দেন।
বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এদিন জেরার তৃতীয় দিন সম্পন্ন হয়। জিয়াউল আহসানের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটোর প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই সেনাপ্রধান সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিচালনা, গোপন বন্দিশালা এবং কর্মকর্তাদের অপরাধের বিষয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর দাবি করেন।
জেরায় সাবেক এই সেনাপ্রধান কর্মকর্তাদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্ফোরক তথ্য দেন। তিনি জানান, র্যাব থেকে ফেরার পর এক কনিষ্ঠ অফিসার দু’জন মানুষকে হত্যার কথা তার কাছে স্বীকার করেছিলেন এবং প্রতি হত্যার জন্য প্রাপ্ত ১০ হাজার টাকা মসজিদে দান করেছিলেন। সাক্ষী বা আলামত না থাকায় তিনি ওই অফিসারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেননি। একইভাবে লে. কর্নেল কামরুল নামে এক কর্মকর্তা ছয়জনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছিলেন। এ ছাড়া মেজর ইমরান নামে এক কর্মকর্তাকে সমাজবিরোধী ব্যক্তি বলে তিরস্কার করলেও তাকে হত্যার দায় থেকে মুক্তি দেয়া হয়। এই কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বা সুবিধাজনক পোস্টিং দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আদেশ অনুযায়ী পোস্টিং হয়েছে এবং অনেক বিষয় তার নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল না।
এর আগে জেরার শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অপারেশন চলাকালে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, সেখানে মৃত্যু ও হত্যা দুটোই বুঝানো হয়েছে। উক্ত অপারেশনের সময় শান্তি বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন উপজাতীয় ব্যক্তিরা সামরিক কাস্টডিতে থাকাকালীন মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে তিনি জিওসি থাকাকালীন এ ধরনের কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি বলে দাবি করেন। তিনি আরো জানান, ১০ জন ব্যক্তিকে ক্রসফায়ারের অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত লে. কর্নেল হাসিনুর রহমানের দুই বছর তিন মাসের সাজা তিনি মওকুফ করেছিলেন, কারণ তার মতে হাসিনুরকে একটি মিথ্যা জংগী মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তিনি জানান, র্যাব থেকে ফেরার পর এক কনিষ্ঠ অফিসার দু’জন মানুষকে হত্যার কথা তার কাছে স্বীকার করেছিলেন এবং প্রতি হত্যার জন্য প্রাপ্ত ১০ হাজার টাকা মসজিদে দান করেছিলেন। সাক্ষী বা আলামত না থাকায় তিনি ওই অফিসারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেননি। একইভাবে লে. কর্নেল কামরুল নামে এক কর্মকর্তা ছয়জনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছিলেন। এ ছাড়া মেজর ইমরান নামে এক কর্মকর্তাকে সমাজবিরোধী ব্যক্তি বলে তিরস্কার করলেও তাকে হত্যার দায় থেকে মুক্তি দেয়া হয়। এই কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বা সুবিধাজনক পোস্টিং দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আদেশ অনুযায়ী পোস্টিং হয়েছে এবং অনেক বিষয় তার নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল না।
আর্মি হাউজিং প্রজেক্ট ‘জলসিঁড়ি’ নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে সাবেক সেনাপ্রধান জানান, তিনি এই প্রকল্পের প্রধান ছিলেন। রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ও ২৪টি মৌজায় জমি ক্রয়ের সময় স্থানীয় বাসিন্দা ও হাউজিং সোসাইটিগুলোর সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এই বিরোধের জেরে স্থানীয় তিনজন ব্যক্তি সেনাবাহিনীর গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দাবি করেন, তারা সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ ও গাড়ি পুড়িয়ে দেয়ায় সেনাবাহিনী আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছিল। ঘটনার সময় জেনারেল মুবিন সেনাপ্রধান ছিলেন এবং ইকবাল করিম ভূঁইয়া আর্মি হাউজিং সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি দাবি করেন, পুরো ঘটনাটি সেনাবাহিনীর সামরিক অপারেশন পরিদফতর নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। উক্ত তিনজন হত্যার বিষয়ে কোনো ‘কোর্ট অব ইনকোয়ারি’ করা হয়নি, যদিও তিনি তা করতে চেয়েছিলেন কারণ এই ঘটনার জন্য তাকেও দায়ী করা হচ্ছিল।
জেরার একপর্যায়ে সাবেক সেনাপ্রধানের দীর্ঘ ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনাকে এত ব্যাখ্যা দিতে হবে না। আপনি উত্তরপাড়ার এক্সপার্ট আর আমরা দক্ষিণপাড়ার এক্সপার্ট।’ জমির মূল্য নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইকবাল করিম বলেন, বিঘাপ্রতি জমি ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকায় কেনা হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টি তার এখতিয়ারে ছিল না বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় কোনো ‘কোর্ট অব ইনকোয়ারি’ করা হয়নি বলেও তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান।
নারায়াণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলা প্রসঙ্গে জিয়াউল আহসানের আইনজীবীর করা প্রশ্নের জবাবে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, তিনি জানেন না যে তার সময়কালে জিয়াউল আহসান ওই মামলার তদন্ত করেছিলেন কি না। আইনজীবী দাবি করেন যে, সাত খুন মামলার তদন্ত নিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউল আহসানকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন এবং তিনি তা অমান্য করায় তাদের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে সাবেক সেনাপ্রধান এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
একইসাথে চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলার তালছড়া গ্রামে লে. কর্নেল মো: জুলফিকার আলী মজুমদারের দুই কোটি সাত হাজার টাকা লুটের ঘটনায় জিয়াউল আহসানের দেয়া অভিযোগের তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার প্রস্তাব দেয়ার বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে জিয়াউল আহসানকে ‘পিএনজি’ (পারসোনা নন গ্রেটা) করা হয়নি এবং এর আগে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি তিনি।
জেরার এক পর্যায়ে ডিজিএফআই সদর দফতরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ -এর কার্যালয় থাকা প্রসঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, তিনি তার জবানবন্দিতে এ বিষয়ে বললেও তৎমর্মে কোনো তদন্ত করতে পারেননি। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ডিজিএফআই সেনাপ্রধানের নিয়ন্ত্রণের বাইরের একটি প্রতিষ্ঠান। যদিও প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে অবস্থিত এবং এর ওপর সেনাপ্রধানের আংশিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তবুও অপারেশনাল বিষয়গুলো তার আওতার বাইরে ছিল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাসা থেকে উচ্ছেদে ভূমিকা রাখা বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। মহাখালী ডিওএইচএসের বাসায় অতিরিক্ত জমি ভোগ করার দাবিকে তিনি মিথ্যা বলেন। এ ছাড়া ‘উইনিভিশন পাওয়ার লিমিটেড’ নামক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বিষয়ে তিনি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেন যে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। পরিশেষে তিনি দাবি করেন, জিয়াউল আহসান সম্পর্কে কোনো কুরুচিপূর্ণ তথ্য ছড়ানো বা তার জবানবন্দির মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণœ হয়নি।


