মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা মানুষের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। কয়েকটি ক্লিকেই টাকা লেনদেন, বিল পরিশোধ, বাজারজাতকরণ- সবই এখন সম্ভব। কিন্তু এই সুবিধার সাথে এসেছে নতুন ধরনের ঝুঁকি। দেশের বিভিন্ন সাইবার ইউনিট ও ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণা এক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। বিশেষ করে ওটিপি চুরি ও ফিশিং কল ব্যবহার করে প্রতারকরা মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদ হাতিয়ে নিচ্ছে। একটি ফোনকলেই খোয়া যাচ্ছে সারা জীবনের সঞ্চয়- বলেন একটি ভুক্তভোগী। তার মতে, প্রতারণার শিকার হওয়ার পর মানসিক ও আর্থিক ক্ষতি কখনো পূরণ হয় না।
প্রতারণার ধরন : সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার প্রধান ধরনগুলো হলো :
ওটিপি চুরি : প্রতারকরা ভুক্তভোগীর নাম ও ফোন নম্বর ব্যবহার করে একটি ওটিপি প্রেরণ করে, যা ভুক্তভোগী কোনো প্রকার সন্দেহ ছাড়াই প্রদান করলে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরানো যায়।
ফিশিং কল বা মেসেজ : প্রতারকরা ব্যাংক বা মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডারের নাম ব্যবহার করে ফোন বা এসএমএসে কল বা মেসেজ পাঠায়। তারা ভুক্তভোগীকে একটি লিংকে ক্লিক করতে বা ব্যক্তিগত তথ্য দিতে প্রলুব্ধ করে।
নকল অ্যাপ ও ওয়েবসাইট : কিছু প্রতারক নকল মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ বা ওয়েবসাইট বানিয়ে ব্যবহারকারীর লগইন তথ্য চুরি করে।
সাইবার ইউনিটের তথ্যানুযায়ী, শুধু গত বছরে এক হাজার ৫০০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি।
ক্ষতির পরিমাণ : এই প্রতারণার কারণে দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। শুধু গত বছরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক বছরে এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর সাথে টাকার পরিমাণ অন্তত ২৫ কোটি টাকা। ভুক্তভোগীদের মধ্যে অনেকেই একবার হারানো টাকা আর ফিরে পায়নি। কিছু ক্ষেত্রে, পুরো জীবনের সঞ্চয় এক ফোনকলেই শেষ হয়ে গেছে।
আইনগত ব্যবস্থা : বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ইউনিট ও সাইবার ক্রাইম বিভাগ এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে জোর দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ অপরাধীর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, তবে প্রযুক্তির জটিলতা ও দ্রুততার কারণে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আইনগত প্রক্রিয়ায় প্রতারকরা সাধারণত সাইবার ক্রাইম আইনে মামলার সম্মুখীন হয়। যদিও আইনিব্যবস্থার আওতায় আসছে অনেক অপরাধী, কিন্তু প্রতারণার ধরন দিন দিন পরিবর্তিত হওয়ায় আইন ও প্রযুক্তির সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
সতর্কবার্তা ও প্রতিরোধ : সাইবার ইউনিট ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একাধিকবার সতর্ক করেছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, সচেতন থাকলেই অনেক প্রতারণা এড়ানো সম্ভব। খাত সংশ্লিষ্টরা সবধরনের গ্রাহককে কখনো নিজের ওটিপি বা পিন কাউকে না জানাতে পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি ব্যাংক বা সার্ভিস প্রোভাইডার কোনো ওয়েবসাইটের নকল লিংকে ক্লিক করতে বারণ করেছেন। একই সাথে ফোনকল বা মেসেজে কেউ ব্যক্তিগত তথ্য চাইলে তা উপেক্ষা করতে পরামর্শ দিয়েছেন। অন্য দিকে সন্দেহজনক লিংক বা অ্যাপ ডাউনলোড করা থেকে বিরত থাকতে ও নিয়মিতভাবে অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা : একজন ব্যবসায়ী জানান, তিনি একটি কল পান, যা ‘আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সমস্যা’ সন্দেহ হচ্ছিল। তিনি ওটিপি দিয়ে তথ্য প্রদান করলে, তার অ্যাকাউন্ট থেকে পাঁচ লাখ টাকা চলে যায়। আমি বিশ্বাস করিনি, একটি সাধারণ ফোনকলই আমাকে এত বড় ক্ষতির মুখে ফেলবে, তিনি অভিযোগ করেন।
অন্য একজন ছাত্রও বলেছেন, আমি নতুন অ্যাপ ডাউনলোড করেছিলাম, কিন্তু সেটি নকল ছিল। আমার সকল সঞ্চয় খোয়া গেেেছ। এখন আমি আরো সতর্ক। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা কখনো ভুলব না।
ব্যাংকের দিক থেকে উদ্যোগ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন ব্যাংক এখন অ্যাপ ও ওয়েবসাইট নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে। নতুন ফিচার যোগ করা হয়েছে। এ জন্য দুই স্তরীয় প্রমাণীকরণ (২এফএ), সন্দেহজনক লেনদেনে অ্যালার্ট ও নিরাপদ লগইন প্রযুক্তির ওপর জোর দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তি উন্নত হলেও ব্যবহারকারীর সচেতনতা সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
সাইবার ইউনিটের ভূমিকা : সাইবার ইউনিট নিয়মিতভাবে নাগরিকদের সচেতন করতে বিভিন্ন কর্মশালা ও ক্যাম্পেইন করছে। তারা ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথভাবে কাজ করছে। তারা সতর্ক করেছেন, যেকোনো ফোনকল বা মেসেজে ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হলে তা দিয়ে প্রতারণার শিকার হবেন না। সচেতন থাকলেই প্রতারণা এড়ানো সম্ভব।



