রানীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) সংবাদদাতা
‘এলাকায় যত দোকান আছে, সব বন্ধ। শহরেও গিয়ে কোনো ব্যবস্থা করতে পারিনি। দেখেন, ড্রাম খালি পড়ে আছে। আমার নিজের ধানও যাচ্ছে, অন্যদেরটাও নষ্ট হচ্ছে। গাড়িরা তেল পাচ্ছে, আমরা কৃষকরা পাচ্ছি না। আমরা তো আর তেল অপচয় করি না’- কথাগুলো বলছিলেন রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ এলাকার কৃষক আফজাল হোসেন।
সকাল থেকে বাইসাইকেলে এক ফিলিং স্টেশন থেকে আরেকটিতে ঘুরেও ডিজেল পাননি তিনি। তার বোরো ধানের জমিতে জরুরি ভিত্তিতে সেচ না দিলে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে, এই দুর্ভোগ শুধু আফজাল হোসেনের এলাকার নয়; একই চিত্র দেখা যাচ্ছে পুরো রানীশংকৈল উপজেলায়।
বর্তমানে বোরো ধানের ভরা মৌসুম চলছে। এ ধান পুরোপুরি সেচনির্ভর হওয়ায় ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত জমিতে নিয়মিত সেচ দিতে হয়। কিন্তু চলমান জ্বালানি তেলের সঙ্কটে কৃষকরা সময়মতো সেচ দিতে পারছেন না। এতে করে সম্ভাব্য উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৯ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। এসব জমিতে সেচের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার ১৭২টি ডিজেলচালিত সেচপাম্প, ২১৭টি বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপ এবং এক হাজার ৫৫৩টি অগভীর নলকূপ। তবে পেট্রলচালিত সেচপাম্পের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নেই, জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
জ্বালানি সঙ্কটের কারণে উপজেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে সেচপাম্প নিয়ে কৃষকদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও প্রয়োজনীয় পরিমাণ জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষকদের অভিযোগ, মোটরসাইকেলের জন্য ‘জ্বালানি কার্ড’ চালু থাকলেও কৃষকদের জন্য এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বোতল বা আলাদাভাবে জ্বালানি সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাধ্য হয়ে অনেকেই সেচপাম্প নিয়ে ফিলিং স্টেশনে আসছেন। ফিলিং স্টেশনে আসা একাধিক চাষি জানান, ‘সব কাজ ফেলে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। মোটরসাইকেলের জন্য ব্যবস্থা থাকলেও কৃষকদের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। এতে করে তাদের ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’ তারা আরো জানান, কোথাও কোথাও দেড় শ’ টাকার জ্বালানি দেয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। একজন কৃষকের দৈনিক ১০ থেকে ১৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এ অবস্থায় কৃষকদের জন্য বিশেষ জ্বালানি কার্ড চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
ধর্মগড় ইউনিয়নের কৃষক আবু তাহের বলেন, ‘দেশে আসলেই জ্বালানি সঙ্কট আছে, নাকি কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে রাখা হচ্ছে- তা বুঝতে পারছি না। সরকার বলছে সঙ্কট নেই; কিন্তু পাম্পে গেলে তেল পাওয়া যায় না।’
রানীশংকৈল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানি সঙ্কটের কারণে সেচ ব্যাহত হলে কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কোনো কৃষক আবেদন করলে আমরা তাকে প্রত্যয়নপত্র দেব, যার মাধ্যমে তিনি জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবেন।’
তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অনেকেই জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রত্যয়নপত্রের বিষয়ে তারা এখনো অবগত নন। তাদের অভিযোগ, এ বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন বা মাইকিং করে কৃষকদের জানানো হয়নি। রাতোর এলাকার কৃষক আমির হোসেন বলেন, ‘প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে তেল পাওয়া গেলে আমাদের পাম্প নিয়ে কষ্ট করে লাইনে দাঁড়াতে হতো না। এ বিষয়ে আমাদের জানানো হচ্ছে না কেন?’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা বেগম বলেন, ‘কৃষকদের সমস্যার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। দ্রুতই প্রত্যয়নপত্র সংক্রান্ত বিষয়টি কৃষকদের মধ্যে প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হবে।’
জেলা জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ে বর্তমানে মোট ৩৮টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ২৪টি, বালিয়াডাঙ্গীতে ২টি, হরিপুরে ২টি, রানীশংকৈলে ৬টি এবং পীরগঞ্জে ৪টি ফিলিং স্টেশন চালু আছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং কৃষকদের জন্য আলাদা কোনো নীতিমালা চালু করা না হলে চলতি বোরো মৌসুমে উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।



