ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় শিক্ষকদের তালিকা ছোট করা হয়েছে। অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে এবারের নির্বাচনে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিয়োজিত করা হচ্ছে। এ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। তারা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতা থাকার পরও এবারের নির্বাচনে শিক্ষকদের তালিকা উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাটছাঁট করা হয়েছে। যদিও প্রথম দিকে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ এবং মাদরাসার শিক্ষকদের তালিকা চেয়ে প্রশিক্ষণের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে শিক্ষকদের তালিকা বাদ দিয়ে সেখানে কিছু ব্যাংক এবং তিতাসের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিয়ে নির্বাচন পরিচালনার কর্মকর্তা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে এসব কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণও শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষকদের তালিকা সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট করা হয়েছে ঢাকা মহানগরী এলাকায়। ঢাকার বিভিন্ন আসনভেদে যেসব কর্মকর্তা চূড়ান্ত করা হয়েছে তাদের মধ্যে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। বাকি সব কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে। ঢাকার একটি কলেজের শিক্ষক গতকাল শনিবার নয়া দিগন্তকে জানান, জানুয়ারি মাসের শুরুতে শিক্ষকদের একটি তালিকা চাওয়া হয়েছিল। সেখানে সিনিয়র শিক্ষকদের নিয়ে একটি খসড়া তালিকা করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে আগের ওই তালিকার কাউকেই আর প্রশিক্ষণের জন্য ডাকা হয়নি। শিক্ষকদের পরিবর্তে ব্যাংক এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। অবশ্য ঢাকার বাইরে মফস্বল/গ্রামের দিকে শিক্ষকদের অন্তভ্র্ক্তু করেই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। কেননা সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আনুপাতিক হারে অনেক কম।
রাজধানীর মিরপুরের ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষক জানান, প্রথমে আমাদের কলেজ থেকেই ১২ জন সিনিয়র শিক্ষকের তালিকা নেয়া হয়েছিল প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল এদের মধ্যে কাউকেই আর নির্বাচনী প্রশিক্ষণের জন্য ডাকা হয়নি। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা তামিরুল মিল্লাত মাদরাসা থেকে প্রথমে ১৮ জন সিনিয়র শিক্ষকের তালিকা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেখান থেকে মাত্র চারজন শিক্ষককে নির্বাচনী দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যদিও ঐতিহ্যগতভাবে এই মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষকরা সুনাম এবং দক্ষতার সাথেই বিগত দিনে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করে আসছে। কিন্তু এবার অদৃশ্য কোনো কারণে বিভিন্ন মাদরাসা ও স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্কুল-শিক্ষক দাবি করেন, একটি রাজনৈতিক দলের অনুসারী শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের দলের প্রতি বেশি অনুগত শিক্ষকদের বাছাই করে দায়িত্ব দিয়েছে। বিপক্ষের বলে সন্দেহভাজনদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। যাতে তারা অনৈতিক কাজের বাধা না হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জানুয়ারি মাসের ১৮ তারিখে ২০২৬ -এর গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষভাবে করার লক্ষ্যে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইনের বিধান সম্পর্কে সচেতন হয়ে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষকদের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে সরকার। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ার করে জানিয়ে দেয়া হয় যে, এবারের নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অনীহা, অসহযোগিতা, শৈথিল্য বা ভুল তথ্য প্রদর্শন করলে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অবশ্য এ বিষয়ে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সব মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছে এ বিষয়ে চিঠি দিয়ে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১-এর বিধান অনুসরণসংক্রান্ত পরিপত্র সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানাতেও বলা হয়েছিল।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠির ধারাবাহিকতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ তাদের আওতাধীন সব অধিদফতর, দফতর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে পত্র পাঠিয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) মো: খালিদ হোসেন মন্ত্রণালয়ের পত্র পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে নয়া দিগন্তকে জানান, গত ৯ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো: রাজিবুল আলম স্বাক্ষরিত একটি নির্দেশনাপত্র আমাদের কাছে এসেছে। তিনি আরো বলেন, আমরা আমাদের অধস্তন মাঠপর্যায়ের সব অঞ্চল, জেলা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কাছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্র ও নির্দেশনাপত্রটি পাঠিয়ে দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ অনুসরণ করে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনী দায়িত্ব সরকারে কাকে দেবে আর কাকে দেবে না সেটা চূড়ান্ত করবে নির্বাচন কমিশন। তবে আমরা শিক্ষকদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে দিয়েছি। ইসি থেকেই তাদের সিদ্ধান্ত মতো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচন করেছে।
সূত্র আরো জানায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়েছে, নির্বাচন পরিচালনার জন্য এরই মধ্যে ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ৪৯৯ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষক এবং সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত অফিস অথবা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্য থেকে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি অফিস থেকেও প্রয়োজনীয়সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁরা সবাই ‘নির্বাচন কর্মকর্তা’ হিসেবে গণ্য হবেন। তাঁরা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কাছে দায়ী থাকবেন।



