চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন

শাহজালাল থার্ড টার্মিনাল

বর্তমান প্রশাসন দিয়ে থার্ড টার্মিনাল চালু করা যাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। যে প্রশাসন এডিসির সাথে আলোচনা করে ফলাফল আনতে পারেনি উল্টো আমাদেরই বিশাল অঙ্কের টাকার গচ্ছা দিতে হচ্ছে, সেই কর্মকর্তারা আবারো আলোচনায় বসে কতটুকু সফলতা আনতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition

  • আন্তর্জাতিক সালিস বোর্ডে বিচার
  • কর্মকর্তাদের অদূরদর্শিতায় দেনা ১৬৫০ কোটি টাকা

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে গেলেও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তার চরম ব্যর্থতার কারণে আলোর মুখ দেখতে পারছে না দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প। শুধু তাই নয়, তাদের অদূরদর্শিতার কারণে আন্তর্জাতিক সালিস বোর্ডের মাধ্যমে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে দেনা গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৬৫০ কোটি টাকা। এ ছাড়াও প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা গচ্ছা দিয়ে যেতে হয়েছে।

সূত্র মতে, বিগত কয়েক বছর ধরে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলা প্রশাসন এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের অন্যতম মেগা প্রজেক্ট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালুর ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বর্তমানে ওই কর্মকর্তারাই এখনো বহাল তবিয়তে। তাদের হাত ধরে থার্ড টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২২ ফেব্রুয়ারি থার্ড টার্মিনাল চালুর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে তিনি থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ কাজে অংশ নেয়া এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)-এর সাথে আলোচনায় বসার নির্দেশ দেন। যত দ্রুত সম্ভব চালুরও নির্দেশ দেন তিনি। ওই বৈঠক শেষে বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম সাংবাদিকদের জানান, থার্ড টার্মিনাল চালু করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ দিকে প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বেবিচকের এক শ্রেণীর কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এত দ্রুত প্রধানমন্ত্রী থার্ড টার্মিনাল নিয়ে ভাববেন সেটি তারা বুঝতে পারেননি।

জানা গেছে, জাপানের মিৎসুবিশি ও ফুজিতা করপোরেশন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি করপোরেশন যৌথভাবে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে অংশ নেয়। নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় যা এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) নামে রূপ নেয়। বেবিচক-এর কয়েকজন কর্মকর্তার অদূরদর্শিতার কারণে এডিসির সাথে দেনা পাওনা নিয়ে চরম ঝামেলার সৃষ্টি হয়। বিষয়টি বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক সালিস বোর্ডের দারস্থ হয়, যা ছিল দেশের অসম্মানজনক একটি বিষয়। সালিস বোর্ডের রায় চলে যায় ওই বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে। ফলে তাদের পাওনা ১৬৫০ কোটি টাকা দিতেই হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মেগা এই প্রজেক্টকে বিতর্কিত করতেও কর্মকর্তারা ছিলেন মরিয়া। এ কারণে অন্যতম এই মেগা প্রজেক্টের কাজ শেষ হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এ ছাড়াও এই কর্মকর্তারা কক্সবাজার বিমানবন্দরকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই হুট করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণা করে দেন। পরবর্তীতে সেটি চালুর আগেই আবার বন্ধও ঘোষণা করতে হয়। এতে করেও এভিয়েশন বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হয়।

অভিযোগ রয়েছে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড তদন্তে গঠিত কমিটিতেও বেবিচকের কর্মকর্তাদের চরম উদাসীনতাকে সামনে আনে। বিষয়গুলো নিয়ে দায়ী করা হয় সদস্য (অপারেশনস) মেহবুব খান ও সদস্য (নিরাপত্তা) আসিফ ইকবালকে। মন্ত্রণালয় থেকে এই দুই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের জন্য বলা হলেও এখনো সেই নির্দেশনা কার্যকর হয়নি।

জানা যায়, সদস্য অপারেশনস মেহবুব খানের একগুয়েমির কারণে বেবিচক শত শত কোটি টাকা রাজস্বও বঞ্চিত হয়েছে। বিমানবন্দরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হঠাৎ করেই লিজ বাতিল করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন। ওই উচ্ছেদ অভিযান ন্যায়সঙ্গত হয়নি অভিযোগ এনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা আদালতের দ্বারস্থ হন। বর্তমানে আদালতের রায়ের কারণে লিজ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কোটি কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানকে। অথচ এই খাত থেকে বেবিচক কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে বেবিচকের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, থার্ড টার্মিনাল চালু হলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশে মান আরো উঁচুতে উঠবে। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় বিমানবন্দরের হাব হবে। কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু গুটিকয়েক কর্মকর্তা বারবার বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন। তা ছাড়া চালুর মাঝখানে আবার তারা এমন কিছু করতে পারেন যাতে করে কক্সবাজার বিমানবন্দরের মতো মাঝপথে বন্ধ করে দিতে হয়।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, বর্তমান প্রশাসন দিয়ে থার্ড টার্মিনাল চালু করা যাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। যে প্রশাসন এডিসির সাথে আলোচনা করে ফলাফল আনতে পারেনি উল্টো আমাদেরই বিশাল অঙ্কের টাকার গচ্ছা দিতে হচ্ছে, সেই কর্মকর্তারা আবারো আলোচনায় বসে কতটুকু সফলতা আনতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তিনি বলেন, তা ছাড়া জাপান ও কোরিয়া আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। তাদের সাথে আমরা ভালো রেজাল্ট আনতে পারতাম। কিন্তু অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার কারণে আমরা পারিনি। তবে সরকার যদি আন্তঃমন্ত্রণালয় একটি কমিটি করে সেখানে দক্ষ লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে সে ক্ষেত্রে একটি পজিটিভ রেজাল্ট আসতে পারে।