বদর যুদ্ধ : যে বিজয় উম্মাহর অবয়ব দেয়

Printed Edition
বর্তমান সময়ে বদর যুদ্ধ থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি? এই প্রশ্নটি আমাদের আরো প্রশ্ন উত্থাপনের দিকে নিয়ে যায়। সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষ কি আজ ভালো আছে? পৃথিবীতে কি দুর্বল ও অরক্ষিতরা শোষণ জুলুমে নেই? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুব বেশি গভীরে যাওয়ার দরকার নেই। ফিলিস্তিনি, রোহিঙ্গা, উইঘুর, সুদানি ও বিশ্বজুড়ে আরো অনেকের দুর্দশা দেখার জন্য কাউকে কেবল নিজের দিগন্ত খুলতে হবে। আমরা কি দুর্বলদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করছি? বদরের আলোকে আমাদের কী শিক্ষা নেয়া উচিত

নবী মুহাম্মদ সা: তাঁর বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রথম যে যুদ্ধ করেন তা ছিল বদর যুদ্ধ। এটি ঘটে ১৭ মার্চ, (কিছু সূত্র অনুসারে, ১৩ মার্চ), ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ বা ১৭ রমজান ২ হিজরিতে, মক্কা ও মদিনা শহরের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত বদর নামক একটি স্থানে।

এটি ছিল মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে প্রধান যুগান্তকারী ঘটনা এবং এটিই একমাত্র যুদ্ধ যাকে কুরআন নাম ধরে সম্বোধন করেছে (৩:১২৩)। এই ঘটনা মুসলিম সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি তৈরি করে। আমরা সংক্ষেপে এই উন্নয়নের তাৎপর্য পরীক্ষা করব।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা : নবী সা: ইয়াসরিবে তাঁর হিজরতের পরপরই উম্মাহ গঠনের ঘোষণা দেন। এই বন্দোবস্তটি তখন থেকেই মদিনাতুন-নবী বা মদিনা নামে পরিচিত হয়। উম্মাহ মক্কার কুরাইশ উপজাতি এবং এই অঞ্চলে বসবাসকারী দু’টি প্রধান উপজাতি- আওস ও খাজরাজের সব অভিবাসীদের নিয়ে গঠিত।

তবে, এটি একটি শিথিল কনফেডারেশন ছিল এবং বিশেষ করে মদিনার উপজাতিদের মধ্য থেকে সবার অবিসংবাদিত আনুগত্য পায়নি। অনেক ভণ্ড মৌখিকভাবে আনুগত্য ঘোষণা করলেও নতুন সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল।

বদর যুদ্ধের অত্যাশ্চর্য বিজয় নবীকে মদিনায় মুসলিম শক্তিকে সুসংহত করতে এবং মানবিক মর্যাদা, সমতা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার মতো মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে একটি নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম করেছিল।

মক্কা থেকে আসা অভিবাসী এবং আনসার বা সাহায্যকারী হিসেবে পরিচিত স্থানীয় মদিনাবাসীর মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য নবী সা: মুয়াখখাত বা ভ্রাতৃত্ব নামক একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। বদর যুদ্ধ এই বন্ধন আরো মজবুত করে মদিনার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে।

ইউরোপীয় ব্যাঙ্কার বেনেডিক্ট কোহেলার সম্প্রতি তার ‘Early Islam and the Birth of Capitalism’ (প্রাথমিক ইসলাম ও পুঁজিবাদের জন্ম) শীর্ষক বইয়ে ব্যাখ্যা করে দেখান যে, কিভাবে নবী মদিনায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, যা ধীরে ধীরে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

বদরের যুদ্ধ সিরিয়ায় মক্কার বাণিজ্য রুট বাধাগ্রস্ত করেছিল, যা তৎকালীন আরবের মক্কার আর্থিক নিয়ন্ত্রণের ওপর বিধ্বংসী প্রভাব ফেলে। মদিনা শিগগিরই মক্কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। এটি আরবের চারপাশে ছোট উপজাতিদের দৃষ্টিতে মক্কার অলিগারিক শক্তিকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে দেয়।

ছোট উপজাতিরা এখন মদিনায় নতুন শক্তির সাথে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক চুক্তি স্থাপন করতে পারে, যা আগে শুধুমাত্র মক্কাবাসীই দিতে পারত। প্রকৃতপক্ষে, এই বিজয় মুসলমানদের জন্য উম্মাহর সমৃদ্ধিতে আরেকটি যুগান্তকারী বিজয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল, যেটি ৬২৮ সালের হুদায়বিয়ার চুক্তির পথ ধরে আসে।

বদর মক্কার নেতৃত্বশৈলীরও পরিবর্তন করেছে- আমর ইবনে হিশামের (আবু জাহাল) নেতৃত্বে কট্টর শত্রুতা থেকে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে আরো বাস্তববাদী শৈলীতে পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তন অবশেষে কয়েক বছর পরে মক্কাকে সম্পূর্ণ মুক্তির দিকে চালিত করে।

বদরের সামরিক বিজয়ের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য : বদর যুদ্ধে নবীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে মুসলমানদের সামরিক বিজয়ের কাহিনী সুনিপুণভাবে নথিভুক্ত। ইতিহাসবিদরা সাধারণত তাদের প্রতিপক্ষের বিপরীতে তাদের অস্ত্রের অভাবকে তুলে ধরেন; সেই সাথে তাদের শৃঙ্খলা, দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় সবই স্বীকৃত।

মজার ব্যাপার হলো- ইতিহাসে এটিই একমাত্র অলৌকিক বিজয় নয়; বাইবেলের নবী ডেভিড (দাউদ) ও গলিয়াথের (১ স্যামুয়েল ১৭) মধ্যে মুখোমুখি হওয়ার গল্পটির এর সাথে বেশ মিল রয়েছে। এই গল্পটি বাস্তব শক্তি বা অস্ত্রের পরিবর্তে হজরত দাউদের আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং তার সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে।

কুরআনও সাক্ষ্য দিয়ে এই গল্পটি বর্ণনা করে, ‘এবং তারপরে, আল্লাহর আদেশে, তারা তাদের পরাজিত করেছিল এবং দাউদ গলিয়াথকে হত্যা করেছিল। আর আল্লাহ তাকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন এবং তাকে জ্ঞান প্রদান করেছিলেন ... (২:২৫১)।’

আমরা সবাই জানি যে বদরে নবী মুহাম্মদ সা: এবং গলিয়াথের বিরুদ্ধে নবী দাউদ ন্যায়ের জন্য এবং একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিলেন। আধুনিক ইতিহাসবিদরা ব্যাখ্যা করতে পারেন না যে, কতটা সুসজ্জিত ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেছিল সংখ্যাগতভাবে খুব কমসংখ্যক যোদ্ধা। আমাদের দৃষ্টিতে, এই সমস্যাটি আরো গভীর চিন্তার দাবি রাখে।

কুরআন উভয় দ্বন্দ্বের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য তুলে ধরেছে, কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদরা এ ধরনের ধর্মীয় উৎসকে ঐতিহাসিক গবেষণার অভিজ্ঞতামূলক প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেন না। আমরা এ বিষয়ে আমাদের আগের নিবন্ধে এই সমস্যাটি নির্দেশ করেছি। উভয় ক্ষেত্রেই, কুরআন আমাদের ন্যায়সঙ্গত কারণের পক্ষে আল্লাহর হস্তক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত করে। এ ধরনের ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ কি শুধুমাত্র নবীর আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ?

না, একেশ্বরবাদী ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে, নবীরা অন্যদের অনুসরণ করার জন্য উদাহরণ স্থাপন করতে কাজ করেন। ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে অপ্রস্তুত এবং সংখ্যাহীন বাহিনী তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির কারণে অত্যন্ত পরিশীলিত ও সংখ্যাগতভাবে বৃহত্তর শক্তির ওপর বিজয়ী হয়েছে।

সেই যুদ্ধগুলোর মধ্যে কয়েকটিকে চিহ্নিত করার জন্য থার্মোপাইলির যুদ্ধ (৪৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) ও ম্যাকাবিয়ান বিদ্রোহের (১৬৭-১৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে অল্পসংখ্যক স্পার্টানরা পরাক্রমশালী পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল আর জেরুসালেম পুনরুদ্ধারকারী ধর্মীয়ভাবে নির্যাতিত ইহুদিরা সেলিউসিড সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। ইতিহাসে এরকম আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে যা দুর্বল ও ছিন্নমূলদের তাদের মর্যাদা ও অধিকারের জন্য লড়াই করতে অনুপ্রাণিত করেছে।

বদর যুদ্ধের সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা : বর্তমান সময়ে বদর যুদ্ধ থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি? এই প্রশ্নটি আমাদের আরো প্রশ্ন উত্থাপনের দিকে নিয়ে যায়। সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষ কি আজ ভালো আছে? পৃথিবীতে কি দুর্বল ও অরক্ষিতরা শোষণ জুলুমে নেই? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুব বেশি গভীরে যাওয়ার দরকার নেই। ফিলিস্তিনি, রোহিঙ্গা, উইঘুর, সুদানি ও বিশ্বজুড়ে আরো অনেকের দুর্দশা দেখার জন্য কাউকে কেবল নিজের দিগন্ত খুলতে হবে। আমরা কি দুর্বলদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করছি? বদরের আলোকে আমাদের কী শিক্ষা নেয়া উচিত?

নবী সা: মক্কায় অরক্ষিত ছিলেন এবং তাঁকে তাঁর মাতৃভূমি থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। এরপর তিনি তার অনুসারীদের সংগঠিত করেন পাল্টা লড়াই করার জন্য। আজ আমরা নবীর মক্কার অবস্থার চেয়ে ভালো অবস্থায় আছি; আমাদের উম্মাহ নামে একটি সংগঠিত সম্প্রদায় রয়েছে এবং আমাদের প্রচুর সংখ্যক অনুসারী ও অনেক জাতি রয়েছে। তবে সবাই সামরিক ও আর্থিক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে বলে মনে হয়।

মুসলমানরা হামান ও কারুনের ফেরাউন বাহিনীর অধীন হয়ে গেছে। যদিও কুরআন তাদের স্পষ্টভাবে বলে- ‘তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য উপাস্য গ্রহণ করেছে, তাদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশায় কিন্তু তারা তাদের সাহায্য করতে পারে না।’ (৩৬ : ৭৪-৭৫) তবুও তারা কুরআন থেকে শিক্ষা নিতে অস্বীকার করে।

বিশেষ করে রমজানের দিনগুলোতে ফিলিস্তিনিদের সাথে যেভাবে আচরণ করা হচ্ছে তা প্রত্যক্ষ করা বেদনাদায়ক। ১৫ মাস যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিরা ইতোমধ্যে তাদের স্থিতিস্থাপকতা প্রদর্শন করেছে; তারা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে, আল্লাহর সাহায্যে তারা সবচেয়ে অত্যাধুনিক সামরিক ও অর্থনৈতিক আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারে।

তবে বাকি বিশ্ব এটিকে আমলে নেবে বলে মনে হয় না। অমুসলিম বিশ্বের বিপরীতে মুসলিম বিশ্ব গভীর ঘুমে রয়েছে। আজ কি আমাদের চারপাশে যা ঘটছে তা সবার চিন্তা করার সময় নয়? এটি কি কাজের সময় নয়, নাকি শুধু কথা বলার সময়?

মুসলমানরা ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ালেই কেবল তাদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারবে এমন নয়, একই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য তারা বাকি মানবজাতিকেও সহায়তা করতে পারে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী স্কলার। তিনি মালয়েশিয়া তুরস্ক ও পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, তুলনামূলক সভ্যতা ও ইতিহাস বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন