নোয়াখালীর মেঘনায় জেগে ওঠা চরের আয়তন হবে কয়েকটি উপজেলার সমান

নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চলীয় মেঘনায় যেভাবে একের পর এক চর জাগছে তাতে আগামী চার-পাঁচ বছরে আরো বিশাল চর জেগে উঠায় উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মেঘনায় জেগে উঠা চরের আয়তন হবে কয়েকটি উপজেলার সমান। জেলা সদর মূল ভূখণ্ড থেকে দক্ষিণে বিশাল বয়ারচর, পূর্ব ও পূর্ব-দক্ষিণে মাইলের পর মাইল ধু-ধু চর আর চর। নলের চরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সন্দীপের কাছাকাছি সাগরের বুক চিরে আরো অনেকগুলো চর জাগছে।

মুহাম্মদ হানিফ ভুঁইয়া, নোয়াখালী অফিস
Printed Edition

নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চলীয় মেঘনায় নতুন নতুন বিশাল চর জাগছে। দেখলে মনে হয় বাংলাদেশের ভেতর আরেকটি বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে জেগে উঠা অন্তত দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার চরাঞ্চলে মানব বসতি গড়ে উঠেছে। এতে এক দিকে দেশের হাজার হাজার নদী ভাঙা অসহায় ভূমিহীন মানুষের জেগে উঠা চর আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। অন্য দিকে এ সব চরে পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ বৃক্ষ রোপণ মৎস্য প্রজেক্টসহ বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিলে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির দ্বার উন্মোচিত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চলীয় মেঘনায় যেভাবে একের পর এক চর জাগছে তাতে আগামী চার-পাঁচ বছরে আরো বিশাল চর জেগে উঠায় উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মেঘনায় জেগে উঠা চরের আয়তন হবে কয়েকটি উপজেলার সমান। জেলা সদর মূল ভূখণ্ড থেকে দক্ষিণে বিশাল বয়ারচর, পূর্ব ও পূর্ব-দক্ষিণে মাইলের পর মাইল ধু-ধু চর আর চর। নলের চরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সন্দীপের কাছাকাছি সাগরের বুক চিরে আরো অনেকগুলো চর জাগছে। হাতিয়া-নোয়াখালী সদরের সি-ট্রাক চলাচল করতো চর মজিদ ৪ নম্বর স্টিমারঘাট থেকে। চর জাগায় মেঘনা নদী একটি ছোট খালে পরিণত হয়। এতে এক পর্যায়ে নোয়াখালী সদর-হাতিয়া যাতায়াতের সি-ট্রাক চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। পরে এ ঘাট বন্ধ করে দিয়ে তিন কিলোমিটার দূর চেয়ারম্যান ঘাট দিয়ে সি-ট্রাক চলাচল শুরু করে হাতিয়া-নোয়াখালী সদর।

এ দিকে হাতিয়ার মূল ভূখণ্ডের সুখুচর ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে মেঘনায় বিশাল চর জাগছে। এ চরের নাম দেয়া হয় জাগলার চর। এ চর সরকার কাউকে বন্দোবস্ত দেয়নি। সম্প্রতি এ চর দখল নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ছয়জন নিহত ও অনেক আহত হয়। হাতিয়ার তমরুদ্দির পশ্চিমে বিশাল নতুন চর জাগছে, চরের নাম দেয়া হয় চর ওসমান। এ চরে আবাদ শুরু হয়। নিঝুম দ্বীপের পশ্চিমে চর কমলা, বদনার চর, চর কালাম, দমার চরের পাশে চর মিজান নামে বিশাল নতুন চর। কিন্তু সেখানে খুব একটা মানব বসতি স্থাপন শুরু হয়নি।

হাতিয়া যাওয়া ও আসার পথে মেঘনায় অসংখ্য ডুবো চর দেখা দেয়। এতে সি-ট্রাক চলাচলে বিঘœ ঘটে। ডুবো চরের কারণে সি-ট্রাক ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় বেশি প্রয়োজন হয়। এ দিকে সোনাদিয়া গ্যাস ফিল্ড থেকে কক্সবাজার হাতিয়ার সাথে যুক্ত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। সদরের চর ক্লার্ক পূর্ব পাশে সন্দীপের উড়ির চরের সাথে জেলা সদরের ভূখণ্ডের দূরত্ব মাত্র আধা কিলোমিটার। এ ছাড়া চর মজিদ স্টিমার ঘাট থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে হাতিয়া দ্বীপের মধ্যবর্তী নদী পথে ডুবো চর সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো অচিরে মূল চরে রূপান্তরিত হবে। নলের চর থেকে চেয়ারম্যান ঘাট পর্যন্ত ৭০০-৮০০ একর মানব বসতি, বৃক্ষ রোপণ শুরু হয়ে গেছে।

হাতিয়া দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে জেগে উঠা ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মৌলভী চরে চাষাবাদ চলছে। এ ছাড়া তার আশপাশে অনেকগুলো নতুন চর জাগছে। এগুলোতে চাষাবাদ ও মানব বসতি চলছে পুরোদমে। হাতিয়ার তমরউদ্দিনের পশ্চিমে যে হারে চর জাগছে, তাতে করে আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে ভোলার মনপুরার সাথে হাতিয়া দ্বীপের মূল ভূখণ্ড মিশে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বুড়ির চর ইউনিয়নের লালচরসহ নিমতলী হয়ে বিশাল চর জাগছে। হাতিয়া দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে রহমত বাজারের পূর্বে ২০-২৫ বর্গকিলোমিটার ডুবোচর আগামী ৮-১০ বছরের মধ্যে গোচারণ ভূমিতে পরিণত হবে।

এ দিকে হাতিয়ার রহমত বাজারের বেড়িবাঁধ থেকে ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে জাহাজ মারা বাজার পর্যন্ত বেড়িবাঁধের বাইরে আবার বিশাল চর জেগে উঠেছে। তার মধ্যে অন্তত ১৫ কিলোমিটার মনবাগান, ২০ বর্গকিলোমিটার বানব বসতি, ৩০ কিলোমিটার আবাদি জমি ও ২৫ কিলোমিটার গোচারণ ভূমি রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণে প্রায় প্রতি বছর ২০-২৫ কিলোমিটার আয়তনের চর জাগছে। এ ছাড়া জাহাজমারা নিঝুম দ্বীপের পাশে অনেকগুলো চর জাগছে, যে সব চরে মানব বসতি শুরু না হলেও কবিরার চরসহ বিভিন্ন চরে বন বিভাগ গাছ লাগাচ্ছে।

অন্য দিকে নিঝুম দ্বীপের দক্ষিণে গভীর সমুদ্রে মৎস্য শিকারি জেলেদের থেকে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জানায় হাতিয়া মূল ভূখণ্ড থেকে দক্ষিণে ৮-১০ ঘণ্ডা ট্রলারে যাওয়ার পরও নদীর গভীরতা দুই থেকে আড়াই মিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ হাতিয়া জাহাজ মারা থেকে দক্ষিণে আরো ৬০-৭০ মাইল নদী পথের গভীরতা দুই থেকে তিন মিটার।

হাতিয়া চরাঞ্চলের অধিবাসীরা জানান, জেগে ওঠা চরগুলোতে পলি মাটির কারণে ফসলে সার ও কীটনাশকের তেমন প্রয়োজন হয় না। শুধু তাই নয়, ফসলের তেমন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। ভূমিহীনরা আরো জানান, তারা জল ও বন দস্যুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তাদের কষ্টে অর্জিত ফসলের উপর চাঁদা দিতে হয়। হাতিয়া এলাকায় যে হারে চর জাগছে এবং মেঘনা নদী ও সাগরের পলি মাটির যে উর্বরতা এখানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পরিকল্পিতভাবে কৃষি প্রজেক্ট করা হলে এখানে যে ফসল হবে তা পুরো জেলায় খাদ্যের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার পাশাপাশি নদী ভাঙাদের পুনর্বাসন, কৃষি প্রজেক্ট মৎস্য প্রকল্প, বনায়ন, পর্যটক শিল্প গড়ে সমৃদ্ধির বাস্তবমুখী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হলে সরকারের যে পরিমাণ আয় হবে তাতে জাতীয় বাজেটের উল্লেখ্যযোগ্য একটি অংশ নোয়াখালী থেকে জোগান দেয়া সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নোয়াখালী জেলা প্রশাসক সফিকুল ইসলামকে গত ২ দিনে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু ফোন রিসিভ না হওয়ায় কথা বলা যায়নি।

হাতিয়ায় একের পর এক চর যে জাগছে এতে সরকারের কী পরিকল্পনা আছে জানতে চাইলে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, আমি মাত্র তিন দিন আগে এখানে যোগদান করেছি। এ বিষয়গুলো খোঁজ খবর নিয়ে জানাতে হবে।