লুটেরাদের ফেরার সুযোগে আস্থাহীনতায় ব্যাংক খাত

ব্যাংক রেজুলেশন আইনের সংশোধনী ঘিরে উদ্বেগ

দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ দিনের অনিয়ম, লুটপাট ও খেলাপি ঋণের পর যখন দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে আস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, ঠিক সেই সময় ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬-এর ধারা ১৮ক ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশোধিত এই ধারায় রেজুলেশনের আওতায় যাওয়া কোনো তফসিলি ব্যাংকের পূর্ববর্তী শেয়ারধারী, মালিকপক্ষ বা বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত মনে করলে অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পুনরায় সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ-দায় ‘পুনঃধারণ’ বা ‘ধারণ’ করতে আবেদন করতে পারবেন- এমন বিধান যুক্ত হওয়ায় অর্থনীতিবিদ, বাজার বিশ্লেষক ও আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ দিনের অনিয়ম, লুটপাট ও খেলাপি ঋণের পর যখন দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে আস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, ঠিক সেই সময় ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬-এর ধারা ১৮ক ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশোধিত এই ধারায় রেজুলেশনের আওতায় যাওয়া কোনো তফসিলি ব্যাংকের পূর্ববর্তী শেয়ারধারী, মালিকপক্ষ বা বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত মনে করলে অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পুনরায় সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ-দায় ‘পুনঃধারণ’ বা ‘ধারণ’ করতে আবেদন করতে পারবেন- এমন বিধান যুক্ত হওয়ায় অর্থনীতিবিদ, বাজার বিশ্লেষক ও আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে দেশের ব্যাংক খাতের বহুল আলোচিত নাম এস আলম গ্রুপ এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বা প্রভাবিত ব্যাংকগুলোর প্রসঙ্গ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে- এই আইন কি ব্যাংক দখল ও লুটের সাথে অভিযুক্ত পুরনো মালিকদের জন্য ‘আইনি প্রত্যাবর্তনের দরজা’ খুলে দিচ্ছে? বিশ্লেষকদের মতে, এই আশঙ্কা বাস্তব হলে তা ব্যাংকিং খাতকে নতুন করে গভীর অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

ধারা ১৮ক কী বলছে : সংশোধিত ধারা ১৮ক অনুযায়ী, রেজুলেশন বা একীভূতকরণের আওতায় যাওয়া কোনো ব্যাংকের তালিকাভুক্তির আগে থাকা শেয়ারহোল্ডাররা চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করে সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনরায় গ্রহণ করতে পারবেন। তবে এর জন্য কয়েকটি কঠোর শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া সব অর্থ ফেরত দেয়া; নতুন মূলধন যোগান; বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ; আমানতকারী ও পাওনাদারদের সব দায় নিষ্পত্তি; সরকারের কর ও অন্যান্য আর্থিক দায় পরিশোধ; ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তদারকি মেনে চলা।

এ ছাড়া, প্রাথমিকভাবে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে অর্থ দিয়েছে তার কমপক্ষে ৭.৫০ শতাংশ পে-অর্ডার হিসেবে জমা দিতে হবে এবং বাকি ৯২.৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ ফেরত দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

আইনগতভাবে এটিকে একটি ‘পুনরুদ্ধার কাঠামো’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে- কারা আবেদন করতে পারবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কাদের ‘উপযুক্ত’ হিসেবে বিবেচনা করবে।

এস আলম প্রসঙ্গ কেন সামনে : দেশের ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এস আলম গ্রুপের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত। একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব বিস্তার, বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ এবং পরবর্তীতে সেই ঋণখেলাপিতে পরিণত হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘ দিন ধরে আলোচনায় রয়েছে।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ধারা ১৮ক-এর ভাষা যদি যথেষ্ট স্পষ্ট না হয়, তা হলে পূর্বের মালিকপক্ষ বা তাদের প্রতিনিধিরা নতুন কোনো কোম্পানি, ব্যক্তি বা বিনিয়োগকারীর ছদ্মবেশে পুনরায় ব্যাংক খাতে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।

একজন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আইনের ভাষা যদি অস্পষ্ট থাকে, তা হলে যাদের কারণে ব্যাংক দুর্বল হয়েছে, তারাই আবার নতুন প্যাকেজে ফিরে আসতে পারে। এটিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।’

আস্থার সঙ্কট আরো বাড়বে : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে- খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে; একাধিক ব্যাংক একীভূত হয়েছে; শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এই অবস্থায় যদি বিতর্কিত পুরনো মালিকদের পুনরায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়, তা হলে তা আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে ভয় ও অনাস্থা সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতে আস্থার ভিত্তি হলো সুশাসন ও জবাবদিহি। যে মালিক পক্ষের আমলে ব্যাংক দুর্বল হয়েছে, তারা যদি পুনরায় ফিরে আসে, তা হলে জনমনে বার্তা যাবে- লুটপাটের পরও ফিরে আসা সম্ভব। এটি শুধু ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই নেতিবাচক সঙ্কেত।

শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব : এই ধারার প্রভাব শুধু ব্যাংকিং খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং শেয়ারবাজারেও তার প্রতিফলন পড়তে পারে।

তালিকাভুক্ত ব্যাংকের শেয়ারধারীরা ইতোমধ্যেই একীভূতকরণ ও রেজুলেশন প্রক্রিয়ায় বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে শেয়ারের মূল্য কার্যত শূন্যের কাছাকাছি নেমে গেছে।

এখন যদি বিতর্কিত পুরনো মালিকরা পুনরায় শেয়ার ধারণের সুযোগ পান, তা হলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা আরো বাড়বে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি ক্যাপিটাল মার্কেটে দীর্ঘমেয়াদি আস্থাহীনতা তৈরি করতে পারে।

রাজনৈতিক ও সংসদীয় প্রতিক্রিয়া : সংসদে বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়। বিভিন্ন সংসদীয় আলোচনায় আইনটির কয়েকটি ধারা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল- এই আইনের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের দুর্নীতির জন্য দায়ীদের দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না।

যদি আইনটি এমন বার্তা দেয় যে ‘ব্যাংক ধ্বংস করলেও পরে অর্থ ফেরত দিয়ে আবার মালিক হওয়া যাবে’, তা হলে তা নৈতিক ঝুঁকি বহু গুণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিপর্যয়ের আশঙ্কা কতটা বাস্তব : ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকির মাত্রা পুরোপুরি আইনের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করছে।

যদি বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর যাচাই-বাছাই করে- যেমন উৎসের অর্থ যাচাই, বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ নির্ধারণ, পূর্বের দায় বিশ্লেষণ এবং ফৌজদারি তদন্ত বিবেচনায় নেয়- তা হলে ঝুঁকি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

কিন্তু বাস্তবে যদি প্রভাবশালী গোষ্ঠী পুনরায় ব্যাংক খাতে প্রবেশ করে, তা হলে- দুর্বল ব্যাংক আরো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে; আমানতকারীদের মধ্যে অর্থ উত্তোলনের প্রবণতা বাড়তে পারে; আন্তঃব্যাংক বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে এবং নতুন তারল্য সঙ্কট দেখা দিতে পারে।

এমনকি কিছু বিশ্লেষকের মতে, এটি ব্যাংকিং খাতে ‘দ্বিতীয় দফা বিপর্যয়ের সূচনা’ ঘটাতে পারে।

শেষ কথা : ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬-এর ধারা ১৮ক এখন দেশের আর্থিক খাতে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি।

আইনের উদ্দেশ্য যদি হয় দুর্বল ব্যাংককে পুনরুজ্জীবিত করা, তবে তা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ যদি ব্যাংক লুটের অভিযোগে অভিযুক্ত পুরনো গোষ্ঠীর পুনঃপ্রবেশের পথ খুলে দেয়, তা হলে তা পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- আইনের প্রয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কঠোর যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা চালু রাখা এবং বিতর্কিত মালিকদের পুনরায় ফিরে আসার পথ স্পষ্টভাবে বন্ধ করা।

নইলে ব্যাংকিং খাতে যে আস্থার সঙ্কট ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে, তা আরো গভীর হয়ে সম্ভাব্য বড় আর্থিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।