দুদক সংস্কারে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি মেলেনি

অধ্যাদেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাদ দেয়া হয়েছে

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যেই গঠিত হয় দুদক সংস্কার কমিশন। রাজনীতি ও আমলানির্ভরতা কমিয়ে দুদককে শক্তিশালী করতে কমিশন মোট ৪৭টি সুপারিশ দেয়। কিন্তু এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দুদক আইন সংশোধন অধ্যাদেশে স্থান পায়নি। ফলে দুদক আদৌ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে কি না, সে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

জিলানী মিলটন
Printed Edition
  • দুদক সংস্কার কমিশন প্রণীত সুপারিশমালাকে সরকার প্রত্যাশিত গুরুত্ব দেয়নি : ড. ইফতেখারুজ্জামান
  • দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
  • কৌশলগত সুপারিশ- উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেয়া হয়েছে

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক প্রত্যাশা নিয়ে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যেই গঠিত হয় দুদক সংস্কার কমিশন। রাজনীতি ও আমলানির্ভরতা কমিয়ে দুদককে শক্তিশালী করতে কমিশন মোট ৪৭টি সুপারিশ দেয়। কিন্তু এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দুদক আইন সংশোধন অধ্যাদেশে স্থান পায়নি। ফলে দুদক আদৌ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে কি না, সে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ২৩ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি মো: শাহাবুদ্দিনের অনুমোদনক্রমে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর সংশোধিত অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।

একজন নারী এবং একজন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কমিশনারসহ অনধিক পাঁচজন কমিশনারের সমন্বয়ে কমিশন গঠিন, মানিলন্ডারিং ক্ষমতা বৃদ্ধি ও এনফোর্সমেন্ট ও গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনাসহ বেশ কিছু পরিবর্তন করে ওই সংশোধিত অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে ।

নতুন অধ্যাদেশ জানা যায়, চেয়ারম্যানসহ পাঁচ কমিশনার নিয়োগের বিষয়ে ২০০৪ সালের ৫ নং আইনের ৫ নং ধারার সংশোধন করা হয়েছে। নতুন বিধানে একজন নারী ও একজন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কমিশনারসহ অনধিক পাঁচজন কমিশনারের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। তাদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ করবেন রাষ্ট্রপতি।

তবে দুদক সংস্কার কমিশন প্রণীত সুপারিশমালাকে সরকার বা দুদক প্রত্যাশিত গুরুত্ব দেয়নি উল্লেখ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মঙ্গলবার এক প্রেস কনফারেন্সে বলেন, দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ- একটি স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি সৃষ্টির বিধান উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেয়া হয়েছে।

যদিও এ ক্ষেত্রে দুদকের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের যেমন কোনো দ্বিমত ছিল না, তেমনি জুলাই সনদ অনুযায়ী প্রায় সব রাজনৈতিক দলেরও নোট অফ ডিসেন্ট-বিহীন সম্মতি ছিল, যা সরকার বা দুদক কারোরই অজানা ছিল না।

তিনি বলেন, দুদকের অধিকতর সক্রিয়তার ফলে আমলাতান্ত্রিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতি নিয়ন্ত্রিত হবে, এটা যারা চান না তারাই মূলত এই সংস্কারটির বিরোধিতা করেছেন। তাই দুদকের ও সরকারের আমলাতান্ত্রিক শক্তির একাংশের কাছে উপদেষ্টা পরিষদ তথা অন্তর্বর্তী সরকার আত্মসমর্পণ করেছে এমন মনে হওয়া অমূলক নয়।

অন্য দিকে অধ্যাদেশে দুর্নীতি অ-আমলযোগ্য অপরাধ উল্লিখিত হলেও একই অনুচ্ছেদে স্ববিরোধী ধারা অন্তর্ভুক্ত করে দায় স্বীকারের নামে আপসের সুযোগ দিয়ে দুর্নীতি সুরক্ষার ‘ফ্লাড-গেইট’ উন্মুক্ত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

টিআইবির ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা’ শীর্ষক পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয় যে, দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার জন্য জরুরি কৌশলগত সুপারিশসমূহ সরকার বা দুদকের কাছে প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি।

বিশেষ করে, বাছাই কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি মনোনয়নের এখতিয়ার স্পিকারের হাতে ন্যস্ত করা, বাংলাদেশী নাগরিককে বাছাই এখতিয়ার বিচারপতির বদলে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা এবং কমিশনার নিয়োগে অভিজ্ঞতার শর্ত বাড়িয়ে ২০ বছর করা মূলত সুনির্দিষ্ট কোনো মহলের স্বার্থ রক্ষার ইঙ্গিত।

শর্টলিস্ট করা প্রার্থীদের নাম প্রকাশের বিধান বাদ দেয়া ও দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি মোকাবেলায় স্বতন্ত্র ইন্টিগ্রিটি ইউনিট নিশ্চিতের মতো কৌশলগত সুপারিশগুলো প্রতিফলিত না হওয়া দুদকের জবাবদিহিতা ও জন-আস্থার সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করবে বলে পর্যালোচনায় বলা হয়।

এ ছাড়া বেসরকারি খাতের দুর্নীতিকে আইনের আওতামুক্ত রাখা এবং অপরাধ স্বীকার করলে সাজা মার্জনার ঢালাও সুযোগ রাখা দুর্নীতিবিরোধী চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে মনে করছে দুদক।

গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানকে প্রধান করে আট সদস্যের দুদক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।

দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে গত বছর জানুয়ারিতে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন দাখিল করার পর গত ৮ ফেব্রুয়ারি সরকার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার মধ্যে বিভিন্ন এজেন্সির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করা এবং ‘স্বাধীন’ও ‘সাংবিধানিক’ স্বীকৃতি দেয়াসহ সংস্থাটির সংস্কারে ৪৭টি সুপারিশ করা হয়েছিল। সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে দুদককে একটি ‘কার্যকর’ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে এবং প্রতিষ্ঠানটির আমূল সংস্কারে ৩৭ সুপারিশের পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার, আইন পরিবর্তনসহ ১০টি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ করেছিল দুদক সংস্কার কমিশন। যদিও গত ২৮ নভেম্বর দুদক অধ্যাদেশ ২০২৫ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ বাদ দেয়ায় গভীর ক্ষোভ ও হতাশা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

এ দিকে জারি হওয়া দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর সংশোধিত অধ্যাদেশে আরো জানা যায়, আইনের ৭ নং ধারা সংশোধন করে কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটি গঠন ও কার্যাবলির পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন ধারায় বলা হয়েছে- কমিশন গঠনে দুদক আইনে সার্চ কমিটি পরিবর্তন করে ‘যাচাই-বাছাই কমিটি’ হবে।

দুদক কমিশন গঠনে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বাদ দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারক, যিনি কমিটির সভাপতিও হবেন। সদস্য হবেন- প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান, সরকারি দল এবং প্রধান বিরোধী দলের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার কর্তৃক মনোনীত দুইজন সংসদ সদস্য, যাহাদের মধ্যে একজন সরকার দলীয় এবং অন্যজন বিরোধী দলীয় হবেন।

তবে শর্ত থাকে যে, জাতীয় সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় বাছাই কমিটি গঠনের প্রয়োজন হলে সংসদ ছাড়াই বাছাই কমিটি গঠন করা যাবে।

অধ্যাদেশে পরিবর্তন করা হয়েছে দুদক কার্যাবলিতে। প্রথমবারের মতো এনফোর্সমেন্ট ও গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয় আইনের ৩ উপধারায় সংযুক্ত করা হয়েছে। আগে বিধিতে সংযুক্ত করে ওই কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো।

অন্য দিকে মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্তে ক্ষমতা বেড়েছে। সংশোধিত ২০০৪ সনের ৫ নং আইনের তফসিল সংশোধন করে দুদকের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আইনের তফসিলের দফা (ঘ) অনুসারে- মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (২০১২ সনের ৫ নং আইন) এর অধীন ঘুষ ও দুর্নীতি, দলিল দস্তাবেজ জালকরণ, প্রতারণা, জালিয়াতি, দেশী ও বিদেশী মুদ্রা পাচার, চোরাচালানি ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধ, কর সংক্রান্ত অপরাধ ও পুঁজি বাজার সম্পর্কিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য-জনসম্মুখে প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে তাহার কাজে লাগাইয়া শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে বাজার সুবিধা গ্রহণ ও ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার লক্ষ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা সংক্রান্ত অপরাধসমূহ দুদকের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে দুদক শুধুমাত্র ঘুষ ও দুর্নীতি সংক্রান্ত মানিলন্ডারিং অপরাধ তফসিলভুক্ত ছিল।

দুদক সংস্কার কমিশনের অন্যতম সুপারিশের মধ্যে ছিল দুদকের বিতর্কিত চাকরিবিধির ধারা বাতিল (বিধিমালার ৫৪(২), কমিশনের মেয়াদ কমিয়ে চার বছর করা, পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন, নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট প্রতিষ্ঠা, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজস্ব জনবল নিয়োগ, প্রতি জেলায় দুদকের কার্যালয় চালু এবং বিদ্যমান বাছাই কমিটির পরিবর্তে বাছাই ও পর্যবেক্ষক কমিটি গঠন।

এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ইন্টিগ্রিটি ইউনিট চালু, বাজেট অনুমোদন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরতা কমানো, অভিযোগ গ্রহণ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে আরো স্বচ্ছ ও সময়াবদ্ধ করা, কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং দুদকের কার্যক্রমে জনআস্থা ফেরানোর বিষয়েও কমিশন গুরুত্ব দেয়।

দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ছিল কেবল কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বরং একটি স্বাধীন কিন্তু জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার রূপরেখা। কিন্তু পরবর্তীতে অনুমোদিত অধ্যাদেশে সেই দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বাদ পড়ে যায় বা দুর্বল হয়ে যায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি বাদ দেয়া হয়েছে, তা হলো দুদকের জবাবদিহির স্বাধীন কাঠামো। কমিশন প্রস্তাব করেছিল, দুদকের কর্মকাণ্ড তদারকির জন্য বিচার বিভাগ, সংসদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বসহ একটি বহুপক্ষীয় ওভারসাইট মেকানিজম থাকবে। কিন্তু অধ্যাদেশে এমন কোনো কাঠামো রাখা হয়নি। একইভাবে, দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার সুপারিশও অধ্যাদেশে কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে। শক্তিশালী ও অংশগ্রহণমূলক সার্চ কমিটির বদলে আগের মতোই নির্বাহী ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণাধীন কাঠামো বহাল রাখা হয়েছে।

দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি মোকাবেলায় স্বতন্ত্র ‘ইন্টিগ্রিটি ইউনিট’, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন, ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে আইনি সুরক্ষা এবং মামলা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ মানদণ্ড নির্ধারণ এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও অধ্যাদেশে প্রতিফলিত হয়নি।

ফলে দুদক সংস্কার কার্যত এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে স্বাধীনতা আছে কিন্তু জবাবদিহি নেই, ক্ষমতা আছে কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।