আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে শুক্রবার শাহবাগ মোড় ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকার আশপাশ ভয়াবহ সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এ দিন বিকেলে ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন ছাত্র-যুব ও নাগরিক সংগঠনের অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ ও নির্বিচার লাঠিচার্জে শতাধিক আহত হয়েছে।
জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে হাদী হত্যার বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠন শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিল। গত শুক্রবার সেই আন্দোলন সবচেয়ে উত্তপ্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। বিকেলে পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে বল প্রয়োগ শুরু করলে পরিস্থিতি দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সবশেষ তথ্য অনুসারে, সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে ১০৯ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে রয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল-জাবের, ডাকসু নেত্রী ফাতেমা তাসনিম জুমা এবং রাকসুর জি এস সালাহউদ্দিন আম্মার। এ ছাড়া গুরুতর আহত মহিউদ্দিন রনিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের বাইরে প্রথম দফা সংঘর্ষের পর বিকেলে আন্দোলনকারীরা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। তাদের প্রধান দাবি ছিল- জাতিসঙ্ঘের অধীনে হাদি হত্যার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। কর্মসূচি শুরুর পরপরই শাহবাগের মূল চত্বরে শত শত মানুষ জড়ো হলে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
পুলিশ প্রথমে কোনো বল প্রয়োগ ছাড়াই আন্দোলনকারীদের সরে যেতে নির্দেশ দেয়। আন্দোলনকারীরা সরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ ধীরে ধীরে কঠোর অবস্থান নেয়। সন্ধ্যার আগে থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জলকামান, টিয়ার গ্যাস শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
আন্দোলনকারীরা কিছুটা পিছু হটলেও পুরোপুরি সরে না যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কোনো মৌখিক সতর্কবার্তা ছাড়াই লাঠিচার্জ করা হয়। এতে অন্তত ৩০ থেকে ৫০ জন গুরুতর আহতসহ মোট ১১৩ জন আহত হন।
সংঘর্ষ চলাকালে সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকদের ওপরও পুলিশ চড়াও হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একাধিক সাংবাদিক আহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে শহীদ ওসমান হাদি চত্বরে ঢাকায় কর্মরত সাংবাদিকরা সংবাদ সম্মেলন করে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তির দাবি জানান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সংঘর্ষের সময় নারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরাও পুলিশের হামলার শিকার হন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের লাঠিচার্জ করতে করতে একটি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতেও দেখা যায়, যা জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এ ছাড়া শাহবাগ এলাকায় চলাচলরত পথচারী ও বাসযাত্রীদের মোবাইল ফোন তল্লাশি করে শিক্ষার্থী শনাক্ত হলে তাদের ওপর হামলা চালানোর বেশ কিছু ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এ দিকে পুলিশের হামলার প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুই দফা সংঘর্ষের পর আন্দোলনকারীদের পেটাতে পেটাতে কাঁটাবন হয়ে শাহবাগ থানার সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় কয়েকজন সাংবাদিকের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগও ওঠে।
এ ছাড়া সংঘর্ষের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে ‘বুনো উল্লাস’ প্রকাশ করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে এক পুলিশ সদস্যকে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অশোভন ভাষায় গালিগালাজ করতে এবং ‘আয়, হাদির লাশ নিয়ে যা’- বলে চিৎকার করতে শোনা যায়। ভিডিওটি নিয়ে ব্যাপক নিন্দা শুরু হয়েছে।
ঘটনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) পুলিশি বল প্রয়োগের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর এমন আচরণ রাজনৈতিক অধিকারের লঙ্ঘন। তারা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “জাবেরের মতো একজন আইনিভাবে নিরাপত্তা দাবিদার ব্যক্তির সাথে এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।” তিনি অবিলম্বে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান।
অন্য দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার সাজ্জাত আলী বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের লোকজন পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে যমুনা ঘেরাওয়ের চেষ্টা করে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ জলকামানের ওপর উঠে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করে। জনস্বার্থ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।
ডিএমপি কমিশনার জানান, সংঘর্ষে ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিটের অন্তত ১৬ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একজন অতিরিক্ত ডিআইজি, একজন পরিদর্শক, একজন সার্জেন্ট এবং একাধিক কনস্টেবল রয়েছেন। কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে, একজনের মাথায় সেলাই দিতে হয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল-জাবের বলেন, “আমরা আমাদের এক ভাই হাদিকে হারিয়েছি। এরপর আর কোনো ভাই হারালেও ১২ তারিখে নির্বাচন হতেই হবে।” তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নির্বাচনের পর যে দলই ক্ষমতায় আসুক, যদি হাদি হত্যার সুষ্ঠু বিচার না হয়, তাহলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জাতিসঙ্ঘে চিঠি পাঠানোর আশ্বাস দেয়া হয়েছে। সে পর্যন্ত জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হয়। একই সাথে চিঠির বিষয়বস্তু পাঠানোর আগেই প্রকাশ করার দাবি জানান তিনি। এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। নাগরিক অধিকার, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন এবং পুলিশের শক্তি প্রয়োগের সীমা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, নিরপেক্ষ বিচার ছাড়া তাদের আন্দোলন থামবে না।



