রাষ্ট্রায়ত্ত বেশির ভাগ কোম্পানি লোকসানে থাকলেও মুনাফায় সাত প্রতিষ্ঠান

শেয়ারবাজার

বাজারে সামগ্রিক মন্দাভাব, বিনিয়োগ সঙ্কট ও উচ্চ সুদহারের চাপের মধ্যেও এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে এক হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এই সাতটি কোম্পানির মোট মুনাফা ছিল এক হাজার ৪৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অথচ একই সময়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও রাষ্ট্রীয় অংশীদারত্ব থাকা অন্যান্য ৯টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ৭৬১ কোটি টাকার লোকসান করেছে, যা আগের বছরের ৮৬৭ কোটি টাকার লোকসানের তুলনায় কিছুটা কম হলেও সার্বিক চিত্র এখনো উদ্বেগজনক।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

পুঁজিবাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগ লোকসানের ভারে জর্জরিত হলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখিয়েছে মাত্র সাতটি প্রতিষ্ঠান। বাজারে সামগ্রিক মন্দাভাব, বিনিয়োগ সঙ্কট ও উচ্চ সুদহারের চাপের মধ্যেও এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে এক হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এই সাতটি কোম্পানির মোট মুনাফা ছিল এক হাজার ৪৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অথচ একই সময়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও রাষ্ট্রীয় অংশীদারত্ব থাকা অন্যান্য ৯টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ৭৬১ কোটি টাকার লোকসান করেছে, যা আগের বছরের ৮৬৭ কোটি টাকার লোকসানের তুলনায় কিছুটা কম হলেও সার্বিক চিত্র এখনো উদ্বেগজনক।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত সরকারি মোট কোম্পানির প্রায় ৫৬ শতাংশই চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে লোকসান দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাজারে একটি ব্যতিক্রমী চিত্র তৈরি করেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মুনাফা প্রবৃদ্ধি টেকসই কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে; কারণ এর একটি বড় অংশ এসেছে অপ্রধান বা নন-অপারেটিং আয়ের ওপর নির্ভর করে।

এই সাত কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বড় মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৪৭৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ১৪১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা; অর্থাৎ এক বছরে মুনাফা বেড়েছে প্রায় ২৩৬ শতাংশ। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে মোট আয় বেড়েছে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৭১ কোটি টাকায়। একই সাথে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় নেট মুনাফা বড় আকারে বেড়েছে।

তবে পাওয়ার গ্রিডের মুনাফার এই উল্লম্ফন পুরোপুরি স্বস্তির নয়। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ওঠানামার কারণে বিদেশি ঋণের ওপর বড় ধরনের চাপ রয়েছে কোম্পানিটির ওপর। গত তিন অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট এক হাজার ২৯৪ কোটি টাকার লোকসান গুনেছে এবং টানা দুই অর্থবছর শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে, অর্থাৎ অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা আবার ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ১১৩ কোটি টাকায় নেমে আসে, যা ভবিষ্যৎ প্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে পেট্রোলিয়াম বিপণন কোম্পানিগুলোর চিত্রও মিশ্র। তিনটি তালিকাভুক্ত তেল বিপণন কোম্পানির মধ্যে পদ্মা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম মুনাফা বাড়াতে সক্ষম হলেও যমুনা অয়েল কোম্পানির মুনাফা কমেছে। পদ্মা অয়েল চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ২৯৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। অন্য দিকে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যা প্রায় ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই দুই কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে তাদের ব্যাংক আমানতের ওপর প্রাপ্ত সুদসহ নন-অপারেটিং আয়।

অন্য দিকে যমুনা অয়েল কোম্পানি একই সময়ে ২১৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের অর্থবছরের ২৬৪ কোটি ১১ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কম। কোম্পানিটি জানিয়েছে, সম্প্রতি একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে রাখা আমানতের সুদ অনিশ্চিত হওয়ায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোনো সুদ আয় হিসাবভুক্ত করা হয়নি। এমনকি প্রথম প্রান্তিকে আগে যে সুদ আয় দেখানো হয়েছিল, সেটিও পরে প্রত্যাহার করা হয়েছে। নিরীক্ষকদের তথ্যমতে, যমুনা অয়েলের ছয়টি ব্যাংকে মোট বিনিয়োগ রয়েছে প্রায় এক হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যার বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯২ কোটি ২১ লাখ টাকা। আয়ও ২৯ শতাংশ বেড়ে ২৫১ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক প্রাইভেট লিজড সার্কিট, আইপি ট্রানজিট ও কো-লোকেশন সেবার চাহিদা বাড়ায় আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি সরকারের সহায়ক নীতিমালাও এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

বিদ্যুৎ বিতরণ খাতে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড বা ডেসকো দীর্ঘদিন পর আবারও মুনাফায় ফিরেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটি ৯০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা মুনাফা করেছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে ৬ কোটি টাকার বেশি লোকসান হয়েছিল। এই সময়ে ডেসকোর আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্প ও বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বাড়া এবং বিক্রয়মূল্য বৃদ্ধির কারণে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ঘটেছে বলে কোম্পানির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্য দিকে গ্যাস খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লোকসান কমাতে সক্ষম হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৯০ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭১১ কোটি টাকা। কোম্পানির দাবি, অপারেশনাল আয় কিছুটা বাড়া এবং উৎসে কর কর্তনের হার কমে আসায় লোকসান কমেছে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি এখনো গভীর আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবির পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্বেগজনক। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আইসিবি ৩১১ কোটি টাকার লোকসান করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১১৭ কোটি টাকা।

আগের পুরো অর্থবছরেই প্রতিষ্ঠানটি এক হাজার ২১৪ কোটি টাকার লোকসান বহন করেছে। সুদ আয়ের তুলনায় আমানত ও ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধের অঙ্ক অনেক বেশি হওয়ায় আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে অস্থিরতার কারণে শেয়ার বিক্রি কমে গেছে, ফলে ক্যাপিটাল গেইন ও কমিশন আয়ে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে।

এ দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিশিল্প খাতের সঙ্কট আরো গভীর হয়েছে। তালিকাভুক্ত ঝিল বাংলা সুগার মিলসের লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ২২ কোটি টাকার কিছু বেশি। একইভাবে শ্যামপুর সুগার মিলস ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা লোকসান করেছে। শ্যামপুর মিলটি কয়েক বছর ধরেই বন্ধ রয়েছে, সরকারি সিদ্ধান্তে উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত থাকায় লোকসান কেবলই জমছে।

এ ছাড়া ইস্টার্ন কেবলস, উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি, এ্যাটলাস বাংলাদেশ, রেনউইক যজ্ঞেশ্বরসহ একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত বা রাষ্ট্রীয় অংশীদারিত্ব থাকা কোম্পানি লোকসানে রয়েছে। জাতীয় টিউবস ও ইস্টার্ন কেবলস, যেগুলো আগের বছর একই সময়ে মুনাফায় ছিল, সেগুলোও চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে লোকসানে চলে গেছে।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর একটি ক্ষুদ্র অংশ স্বল্পমেয়াদে ভালো ফল দেখালেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি দুর্বলই রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঠামোগত সংস্কার, পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই মুনাফা প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।