গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে বাড়ছে মৃত্যু

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সিলিন্ডার সরাসরি বিস্ফোরিত হয় না; বরং নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর বা ভালভ থেকে গ্যাস লিক হয়ে ঘরে জমে থাকে এবং আগুনের সংস্পর্শে এলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এটি ব্যবহারে সচেতন না থাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়ছে।

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • ছয় বছরে অগ্নিকাণ্ড প্রায় দেড় লাখ, দুই মাসে দগ্ধ রোগী ২৭০০
  • বেড়েছে ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশের ব্যবহার

স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে রাইডশেয়ারিং চালক রুবেলের সংসার খুব ভালোভাবেই চলছিল। চাচাতো ভাই এনায়েত দুবাই থেকে দেশে ফিরে গত সোমবার গ্রামের বাড়ি থেকে সপরিবারে রুবেলের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। রাতে আত্মীয়দের সাথে চলে গল্প-উৎসবের মতো। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়। গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণে বাড়ির নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার দেয়াল ভেঙে যায়। এ ঘটনায় ঘরের ভেতর থাকা ১০ জনই দগ্ধ হয়েছেন। তাদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে দগ্ধ রুবেলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সোনিয়া আক্তার (২৫) ও প্রবাসী এনায়েত আলী (৩২) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গত মঙ্গলবার ভোরে উত্তরায় কামাড়পাড়া ১০ নম্বর সেক্টরের কবরস্থান রোডের মেম্বার বাড়ির পাশে আবুল কালামের মালিকানাধীন ভবনের দ্বিতীয় তলায় এ বিস্ফোরণ ঘটে। নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার ও সরঞ্জাম ব্যবহার এবং অসচেতনতার কারণে দেশে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও প্রাণহানির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সিলিন্ডার সরাসরি বিস্ফোরিত হয় না; বরং নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর বা ভালভ থেকে গ্যাস লিক হয়ে ঘরে জমে থাকে এবং আগুনের সংস্পর্শে এলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এটি ব্যবহারে সচেতন না থাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়ছে।

গত ছয় বছরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে প্রায় দেড় লাখ। তার মধ্যে ২০২৫ সালে সিলিন্ডার ও সিলিন্ডারের সাথে যুক্ত উপকরণের লিকেজ থেকে এক হাজার ৪১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর আগের বছর ঘটেছে ৭৪৮টি। অর্থাৎ, আগের বছরের তুলনায় ২৯৩টি দুর্ঘটনা বেশি হয়েছে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়লেও সিলিন্ডার আমদানি, বাজারজাত ও নিরাপত্তা-মান পরীক্ষার বিষয়ে সরকারের তিন তদারকি সংস্থা নির্বিকার।

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের তথ্যঅনুযায়ী ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই দুই হাজার ৭০০ দগ্ধ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের বড় অংশই সিলিন্ডার ও গ্যাস লিকেজ দুর্ঘটনার শিকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রুবেলের বাসায় নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। পোড়া-দগ্ধ শরীর নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় পড়ে আছে মাসের পর মাস। যারাই আক্রান্ত হচ্ছেন, তারা নিজেও যানেন না গ্যাস সিলিন্ডার কোনটি ভালো আর কোনটি নিম্নমানের। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে অকালে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সিলিন্ডার ব্যবহার করছে নিরীহ মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি নিছক হত্যাকাণ্ড। যারা আহত হয়েছেন তারা দগ্ধ পঙ্গুত্ব নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছে সারা জীবন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার অনেক ক্ষেত্রে ১০-১৫ বছরের পুরনো বা জীর্ণ সিলিন্ডার বাজারে প্রচলিত থাকা এবং নিয়মিত ‘হাইড্রোস্ট্যাটিক টেস্ট’ না করার কারণে এসব দুর্ঘটনা বাড়ছে। সম্প্রতি রাজধানীর কামাড়পাড়া, কুমিল্লার দাউদকান্দি, চট্টগ্রাম মহানগরী, সাভার ও ঢাকার ধামরাইয়ে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের একাধিক সদস্য দগ্ধ ও নিহতের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়াও লক্ষ্মীপুরে একটি ফিলিং স্টেশনে নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণে বাসে বিস্ফোরণ ঘটে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বা গ্যাস লিকেজের কারণে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। শুধু বাসাবাড়িতেই নয়, রেস্তোরাঁ, শিল্পকারখানা এমনকি হাসপাতালেও অনেক ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। ওই সূত্র জানায়, সারা দেশে রান্নার কাজে এলপিজি (তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডারের ব্যবহার ব্যাপক। সুবিধার কারণে দিন দিন ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বাড়ছে। তবে এই জ্বালানিটি যেমন সুবিধাজনক, তেমনি এর অপব্যবহার ও অসচেতনতা ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইনে লিকেজের কারণেও দেশে দগ্ধের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অনেকে বলে থাকেন গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, আসলে অধিকাংশ দুর্ঘটনা সিলিন্ডার লিকেজ থেকে হয়। নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজল, ভালভের কারণে লিকেজ হয়। এ ছাড়া নানা কারণে ঘরে জমে থাকা গ্যাসের গন্ধ এখন তেমন টের পাওয়া যায় না। আগুন জ্বালানো মাত্র বিপদে পড়ছেন বাসিন্দারা। তিনি বলেন, নিম্নমানের সিলিন্ডার অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে এলে গ্যাসের চাপ বেড়ে বিস্ফোরণ হয়। সিলিন্ডারের মান অনুযায়ী হাইড্রোলিক পরীক্ষা করা হচ্ছে না। দুর্ঘটনায় সিলিন্ডার আমদানি থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার দায় রয়েছে। আমরা দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যায়ক্রমে সচেতনতা বাড়িয়েছি। কেউ সঠিক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে আমরা সহায়তা করব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদফতরের বিস্ফোরক পরিদর্শক মো: তোফাজ্জল হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে মূলত জনসচেতনা না থাকার কারণে। তিনি বলেন, অনেকে বলে থাকেন সিলিন্ডার নিম্নমানের। আসলে একটি সিলিন্ডারের মেয়াদ কমপক্ষে ১০ বছর থাকে। নিম্নমানের সিলিন্ডার কেউ তৈরি করেন না। মূলত যারা এটার ব্যবহারকারী তাদের গাফিলতিতে বাড়ছে দুর্ঘটনা। সিলিন্ডার ব্যবহারকারীরা দেখেন না কিভাবে এটা ব্যবহার করতে হয়। সব নিয়ম দেয়া থাকলেও অনেকে সেটি দেখেন না। রেগুলেটর, নজল ও ভালভ এগুলো যদি লুজ থাকে তাহলে রান্নাঘরে বা সংশ্লিষ্ট স্থানে গ্যাস জমাট থেকে আগুনোর স্পর্শ পেলেই বিস্ফোরণ ঘটবে। তাই সবার আগে দেখতে হবে, যে বাসায় সিলিন্ডার রয়েছে তা সঠিকভাবে ব্যবহার করছেন কি না।

তিনি বলেন, সরকারের পক্ষে সম্ভব নয় বাসায় বাসায় গিয়ে এই বার্তা পৌঁছে দেবে। তবে গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন দেয়ালে চিকামারাসহ গ্যাস সিলিন্ডারগুলোতে সচেতনতামূলক কথা উল্লেখ করা হয়েছে।