পুরান ঢাকা-গোপালগঞ্জ-খুলনার মোংলা রুট

পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি বখরা নিচ্ছে পুলিশও

সরকার বলছে সড়কে চললে কোনো ধরনের চাঁদা লাগবে না। কিন্তু আমরা তো দেখছি, সিটি করপোরেশনের নামে, পৌরসভার নামে, শ্রমিক ইউনিয়নের নামে প্রতিদিন প্রতিটি ট্রাক থেকেই চান্দাবাজরা টাকা নিচ্ছে। এর মধ্যে পুরান ঢাকার চকবাজার ও ডাইলপট্টি এলাকায় লাইনম্যানদের চাঁদা না দিয়ে কোনো ট্রাক ঢুকতেও পারে না। বেরও হতে পারে না। তাদের ভাষায় ট্রাক চালকদের কাছ থেকে চান্দাবাজরা আনলিমিটেড চাঁদা নিচ্ছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

  • সাইনবোর্ড থেকে কাজলা মধ্যরাত পর্যন্ত ট্রাক থামিয়ে অর্থ আদায়
  • যানজটে নাকাল হাজার হাজার মানুষ, অ্যাম্বুলেন্সবাহী রোগীও জিম্মি

পুরান ঢাকার আরমানিটোলা থেকে শুরু করে গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া হয়ে খুলনার মোংলা পর্যন্ত চলাচলকারী প্রতিটি ট্রাক থেকেই মাস্তান নামক চাঁদাবাজরা ড্রাইভারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্ধারিত হারে চাঁদা আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো ট্রাক, পিকআপভ্যান চালক টাকা দিতে গড়িমসি করলে তাদেরকে লাঠি দিয়ে আঘাত করার ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। যার কারণে তাদেরকে নীরবে লাইনম্যান নামক চিহ্নিত চাঁদাবাজদের টাকা দিয়েই পণ্য ওঠানামা ও চলাচল করতে হচ্ছে। শুধু চাঁদাবাজরা নির্ধারিত হারে চাঁদা নিচ্ছে তা কিন্তু নয়, ঢাকা থেকে খুলনার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি ট্রাক থেকে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার হয়ে জুরাইন পোস্তগোলা ব্রিজের এপার ওপারে নানা উছিলায় পুলিশও নির্ধারিত হারে টাকা দাবি করছে। যদি কখনো কোনো ট্রাকচালক টাকা দিতে গড়িমসি করে তাহলে সেই ট্রাক চালকের বিরুদ্ধে ঠুকে দেয়া হচ্ছে মামলা।

এই পথে চলাচলকারী একাধিক ট্রাকচালকের সাথে কথা বলে পাওয়া গেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভুক্তভোগী ট্রাক ড্রাইভার ও হেলপাররা বলছেন, সরকার বলছে সড়কে চললে কোনো ধরনের চাঁদা লাগবে না। কিন্তু আমরা তো দেখছি, সিটি করপোরেশনের নামে, পৌরসভার নামে, শ্রমিক ইউনিয়নের নামে প্রতিদিন প্রতিটি ট্রাক থেকেই চান্দাবাজরা টাকা নিচ্ছে। এর মধ্যে পুরান ঢাকার চকবাজার ও ডাইলপট্টি এলাকায় লাইনম্যানদের চাঁদা না দিয়ে কোনো ট্রাক ঢুকতেও পারে না। বেরও হতে পারে না। তাদের ভাষায় ট্রাক চালকদের কাছ থেকে চান্দাবাজরা আনলিমিটেড চাঁদা নিচ্ছে।

পুরান ঢাকা থেকে মালামাল নিয়ে খুলনার মোংলাগামী এক ট্রাকচালক বুধবার রাতে জানান, ট্রাক নিয়ে পুরান ঢাকা থেকে বের হয়ে খুলনা পৌঁছানো পর্যন্ত পথে পথে সাড়ে পাঁচ শ’ থেকে ছয় শ’ টাকা খরচ করতে হয়। এ ছাড়া অসময়ে বের হলে ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্টকে দিতে হয় কখনো ৫০০ টাকা, আবার কখনো আরো বেশি।

চালক লালবাগ থেকে বের হওয়ার সময় ডাইলপট্টি এলাকায় একজন মুরব্বি ১০০ টাকা দাবি করেন। চকবাজারে লাইনম্যানকে দিতে হয় ১০০ টাকা। তারা কোনো স্লিপ দেয় না। কখনো মালামাল লোড করতে দেরি হলে সকাল ৭টা বেজে যায়। সে ক্ষেত্রে পোস্তগোলা ব্রিজের এপাশে পুলিশকে দিতে হয় ২০০ টাকা। কেরানীগঞ্জের সাইটে নামার সময় আবার সার্জেন্ট আটক করলে তাদের দিতে হয় ৩০০ টাকা। কেউ টাকা দিতে না চাইলে তখন গাড়ির কাগজ নাই উল্লেখ করে মামলা দিয়ে দেয়। এরপর ট্রাক খুলনার উদ্দেশে যাত্রা করার পথে গোপালগঞ্জে ১০০ টাকা, কোটালীপাড়ায় ৫০ টাকা, পাটগাতি ৫০ টাকা, পিরোজপুর ৫০ টাকা ও মোংলায় পৌরসভা ও শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ২০০ টাকা আদায় করা হয়। এভাবে প্রতিদিন শত শত ট্রাক থেকে চাঁদাবাজরা নির্ধারিত হারে চাঁদা আদায় করছে।

শুধু পুরান ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় চাঁদা নিচ্ছে না, ট্রাক থেকে মিটফোর্ড বিসমিল্লাহ টাওয়ারের সামনে মালামাল নামাতে গেলেও চাঁদা দিতে হয়। লাইনম্যান নেয় ১০০ টাকা। তারা বলে ইউনিয়নের নামে এই টাকা নিচ্ছে। কিন্তু কোনো স্লিপ দিচ্ছে না।

আপনারা কেন চাঁদা দিচ্ছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই চালক বলেন, আমরা যখন ট্রাকের স্টিয়ারিংয়ে থাকি তখন অসহায় থাকি। তাদের কিছু বলতে পারি না। তাই সব সহ্য করেই তাদের রেট অনুযায়ী মাস্তানদের চাঁদা দিয়ে দিচ্ছি। এ সময় পুলিশকেও তাদের চাহিদা অনুযায়ী বখরা দিয়েই গাড়ি চালাচ্ছি।

গতকাল পুরান ঢাকার একজন ব্যবসায়ী নয়া দিগন্তকে নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, আমরা সন্ধ্যার পর মালামাল ট্রাকে লোড করতে গেলেই পুলিশকে টাকা দিতে হয়। চানখাঁরপুল মোড়ে প্রতিটি ট্রাকের চালক থেকেই পুলিশ অন্যায়ভাবে টাকা দাবি করছে। টাকা না দিলেই ওই ট্রাকের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিচ্ছে। আর এই অবৈধভাবে টাকা আদায়ের সাথে ট্রাফিক সার্জেন্ট আজিজ ও শিপলুর নাম উঠে আসছে বলে অভিযোগ করে ভুক্তভোগী ট্রান্সপোর্ট মালিকদের প্রতিনিধিরা। এমনিতেই ব্যবসায়ীরা নানাভাবে বিপর্যস্ত। তারা আওয়ামী লীগের আমলে যেভাবে চাঁদা দিতেন এখনো সেভাবেই চাঁদা দিচ্ছেন। এ থেকে তারা পরিত্রাণ পেতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।

এ দিকে গতকাল সাইনবোর্ড এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী ও ট্রাকচালক নিজেদের পরিচয় না জানিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যার পরই ঢাকার বাইরে থেকে আসা প্রতিটি ট্রাক থেকেই আসমা আলী প্রেট্রলপাম্পের সামনের ইউ টার্নে ট্রাক থামিয়ে ট্রাকের চালকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন। এ ক্ষেত্রে ডিউটিরত পুলিশের পক্ষ থেকে ট্রাফিক কনস্টেবলরা ট্রাকচালকদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা আদায় করছেন। যারা দিচ্ছে তাদেরকে রাত ১০টার আগেই ঢাকায় ট্রাক প্রবেশ করার জন্য অনুমতি দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন ট্রাক আটকানোর কারণে সাইনবোর্ড, মহিলা মাদরাসা, রায়েরবাগ, শনিরআখড়া কাজলা থেকে শুরু করে হানিফ ফ্লাইওভারের ওপরও ট্রাকের জটলা লেগে যাচ্ছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রতিদিন মধ্যরাত পর্যন্ত হাজার হাজার ট্রাক, বাস, রিকশা, সিএনজি আটকে যানজট তৈরি হচ্ছে। অপরদিকে এসব গাড়িতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এ সময় অনেক রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স যানজটে নাকাল হচ্ছে। এই যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কোনো ভূমিকাই থাকে না বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন। তবে কোনো ট্রাকচালক টাকা দিতে গড়িমসি করলে কাগজপত্র আনফিট উল্লেখ করে মামলা দিয়ে দেয়া হচ্ছে। এসব ঘটনা দেখে এলাকার মানুষ খুবই ক্ষুব্ধ বিরক্ত। তারা দ্রুত এই অত্যাচার থেকে পরিত্রাণ চান।