বীমা খাতের উন্নয়ন প্রকল্প

পরামর্শক ও সম্মানিতে ১১০.৬০ কোটি টাকা

বাংলাদেশের বীমা খাতের উন্নয়নে নেয়া প্রকল্পে পরামর্শক ও সম্মানী খাতেই যাচ্ছে ১১০ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা দিয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়। যেখানে জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণে ব্যয় হবে অর্ধেকেরও কম ৫০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। পরামর্শকে যাচ্ছে ৮৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এই প্রকল্প নিজেই এখন বীমার ঝুঁকিতে। ৫ বছরে যে প্রকল্প শেষ করার কথা ছিল, সেটি এখন সাড়ে ৮ বছর অতিক্রম করতে যাচ্ছে। আর খরচ বেড়েছে ২৯৩ কোটি টাকা বলে প্রকল্প প্রস্তাবনা দলিল থেকে জানা গেছে। বছরের পর বছর চলছে বিশ^ব্যাংকের অর্থায়নের এই উন্নয়ন প্রকল্পটি।

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

  • ৫ বছরের প্রকল্প এখন সাড়ে ৮ বছরে
  • খরচ বাড়ল ২৯৩ কোটি টাকা

দেশের উন্নয়ন প্রকল্প মানেই পরামর্শক ও সম্মানী খাতের খরচ। বাংলাদেশের বীমা খাতের উন্নয়নে নেয়া প্রকল্পে পরামর্শক ও সম্মানী খাতেই যাচ্ছে ১১০ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা দিয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়। যেখানে জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণে ব্যয় হবে অর্ধেকেরও কম ৫০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। পরামর্শকে যাচ্ছে ৮৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এই প্রকল্প নিজেই এখন বীমার ঝুঁকিতে। ৫ বছরে যে প্রকল্প শেষ করার কথা ছিল, সেটি এখন সাড়ে ৮ বছর অতিক্রম করতে যাচ্ছে। আর খরচ বেড়েছে ২৯৩ কোটি টাকা বলে প্রকল্প প্রস্তাবনা দলিল থেকে জানা গেছে। বছরের পর বছর চলছে বিশ^ব্যাংকের অর্থায়নের এই উন্নয়ন প্রকল্পটি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক চিঠির তথ্য থেকে জানা গেছে, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেয়া হয় ‘বাংলাদেশের বীমা খাত উন্নয়ন (২য় সংশোধিত)’- শীর্ষক প্রকল্পটি। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন বাংলাদেশের বীমা খাত উন্নয়ন-শীর্ষক প্রকল্পটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বীমা করপোরেশনগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশের বীমার কভারেজ বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে ২০২৮ সালে অনুমোদন দেয়া হয়। এতে মোট ৬৩২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। যার মধ্যে জিওবি ১১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং বিশ^ব্যাংকের প্রকল্প সাহায্য ৫১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। জানুয়ারি ২০১৮ হতে ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদে বাস্তবায়নে গত ২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে ৩৮ কোটি ১৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয় বৃদ্ধি করে প্রকল্পের মোট খরচ বেড়ে ৬৭০ কোটি ১৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকায় প্রাক্কলন করা হয়। এখানে সরকার দিচ্ছে ৯১ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং বিশ^ব্যাকের প্রকল্প সাহায্য ৫৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত করা হয়। এই সংশোধন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ২০২২ সালের ২৮ নভেম্বর অনুমোদন করেন।

শত কোটি টাকা এক লাফে বৃদ্ধি

এর পর এক লাফে শত কোটি টাকার বেশি ব্যয় বাড়ানো হয়। প্রকল্পের খরচ ৮০৩ কোটি ৪০ লাখ ৯৪ হাজার টাকায় প্রাক্কলিত ব্যয়। যেখানে সরকার ৯১ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য ৭১১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ধরা হয়। মন্ত্রী ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে এই ব্যয় বৃদ্ধি অনুমোদন করেন। ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ আরো ১ বছর বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এ পর্যায়ে গত ২৩ মে ২০২৪ তারিখে মোট ৯৪০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদন পায়। যেখানে জিওবি ২২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য ৭১৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। একই বছর আবার মেয়াদ ৬ মাস বাড়ানো হয়। জুন ২০২৫ পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয় প্রকল্পের মেয়াদ। আর এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে মেয়াদ ও খরচ বাড়তে থাকে। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকার গত ২০২৫ সালের ২৯ জুন ব্যয় ১৫ কোটি টাকা কমিয়ে মোট ৯২৫ কোটি টাকা অনুমোদন করে। এখানে সরকার ৩৬২ কোটি ৬০ লাখ ১৯ হাজার টাকা এবং প্রকল্প ঋণ/অনুদান কমে ৫৬২ কোটি ৩৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা করা হয়। এ পর্যায়ে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ আরো ৬ মাস বাড়িয়ে বাস্তবায়নকাল জুন ২০২৬ পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করা হয়।

সাড়ে ৭ বছরে অগ্রগতি ৮১.০৯ শতাংশ

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে ৭ বছরে প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জীভূত অগ্রগতি অর্থাৎ টাকা খরচ হয়েছে ৭৫০ কোটি ১১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। যা মোট ব্যয়ের ৮১.০৯ শতাংশ। এখানে সরকার দিচ্ছে ১৮৭ কোটি ৭১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা এবং আরপিএ-৫৬২ কোটি ৩৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপি’তে আলোচ্য প্রকল্পের অনুকূলে ৩০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। যেহেতু প্রকল্পটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত, সে অনুযায়ী বিভাজন এবং এককালীন অর্থ অবমুক্ত করা হয়েছে।

বরাদ্দ পুনর্নির্ধারণ

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ বিভাগের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ কর্তৃক এ প্রকল্পের অনুকূলে অবশিষ্ট প্রাপ্য ১৪০ কোটি ৬৯ লাখ বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আরএডিপি’তে আলোচ্য প্রকল্পের অনুকূলে পুনর্নির্ধারিত বরাদ্দ হয়েছে ১৭১ কোটি ৬ লাখ টাকা। যেখানে রাজস্ব খাত থেকে ৩৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং মূলধন খাত থেকে ১৩৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা। তবে অবশিষ্ট প্রাপ্য হিসেবে ৩ কোটি ৮২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে।

পরামর্শক-সম্মানীতে ১১০.৬০ কোটি টাকা

খরচের তথ্য থেকে জানা গেছে, পরামর্শক খাতেই খরচ হচ্ছে ৮৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এক হাজার ৪১৬ জন মাস পরামর্শকের পেছনে এই ব্যয়। এখানে প্রতি মাসে প্রতিজনে যাচ্ছে ৫ লাখ ৯১ হাজার টাকা। আর সম্মানী ভাতাতে যাবে ২৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। যা থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। প্রকল্পে চার হাজার ৪২৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০ কোটি ৯৭ লাখ আট হাজার টাকা। প্রতিজনে ব্যয় হবে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। প্রায় ২০ কোটি টাকা যাবে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে।

ব্যয়ের হিসাব

খরচের মধ্যে আইটি অবকাঠামো নির্মাণে ৯০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, শ্রেণিকক্ষ আধুনিকায়ন ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনে ৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা, সার্বিক অটোমেশনের জন্য ৭৯ কোটি টাকা, ডিস্ট্যান্স লার্নিং সেন্টার স্থাপনে ৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ইন্টার এ্যাক্টিভ পোর্টাল বাস্তবায়নে ৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, বীমা এজেন্টদের এনলাইন অনুমোদন ব্যবস্থা ৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এ ছাড়া কোর ইন্স্যুরেন্স অ্যাপ্লিকেশন ৬টি খাতে ৫৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ৮টি ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের জন্য ৩৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, বিজনেস ইন্টেলিজেন্স ও তথা বিশ্লেষণ ৬টি ব্যবস্থায় ৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, জালিয়াতি উদঘাটন ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্থাপনের ৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, কেন্দ্রীয়ভাবে রেটিং ব্যবস্থা স্থাপনে ৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, সড়ক দুর্ঘটনার ডেটাবেস প্রস্তুতকরণে ৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, কল সেন্টার ও গ্রাহক সেবা ব্যবস্থাপনার জন্য ৩১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

প্রকল্পের ব্যাপারে অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পভুক্ত কিছু প্যাকেজের ক্ষেত্রে প্রকল্পের নির্দিষ্ট মেয়াদের অতিরিক্ত সময় দিয়ে চুক্তি সম্পাদন, প্রকল্পভুক্ত ৩টি প্যাকেজ যথা জি-৪২, জি-৪৩ ও এস-১০.১ এর জন্য সম্প্রতি দরপত্র আহ্বান মূল্যায়নে অতিরিক্ত সময় ক্ষেপণ প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা প্রকাশ করে। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশের বীমা অটোমেশনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। আইএমইডি কর্তৃক প্রদত্ত এ সংশ্লিষ্ট পরিদর্শন প্রতিবেদনের আলোকে গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে আইএমইডি, পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে অবহিত করতে হবে।