২০২৫ সালের অক্টোবর শেষে বাংলাদেশের মুদ্রা পরিস্থিতি এক জটিল দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে অর্থনীতিতে অর্থের সরবরাহ বাড়ছে, রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরছে; অন্যদিকে ঋণের গঠন, সরকারি নির্ভরতা ও বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ কারেন্ট মনিটরি সার্ভে সেই দ্বন্দ্বকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
১. ব্রড মানি (এম২): পরিমিত প্রবৃদ্ধি, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত নয় : ২০২৫ সালের অক্টোবর শেষে ব্রড মানি দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ ৫০ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা, যা এক বছরে ৭.৯৫ শতাংশ বেড়েছে। সংখ্যাটি অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি না করলেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্যও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। অর্থাৎ অর্থনীতিতে অর্থ আছে, কিন্তু সেই অর্থ উৎপাদন ও বিনিয়োগে পর্যাপ্ত গতিশীলতা তৈরি করতে পারছে না।
২. নেট ফরেন অ্যাসেটস : কেন্দ্রীয় ব্যাংক শক্তিশালী, ব্যাংক খাত দুর্বল : নেট ফরেন অ্যাসেটস (এনএফএ) এক বছরে ২৬.৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে- যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে এর গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এনএফএ বেড়েছে ৩৩.৬৭ শতাংশ, কিন্তু ডিপোজিট মানি ব্যাংকগুলোর এনএফএ কমেছে ৪৭.২৫ শতাংশ।
এটি দেখায় যে রিজার্ভ বৃদ্ধির সুবিধা মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবেই সীমাবদ্ধ। বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখনো আমদানি দায়, বৈদেশিক ঋণ ও এলসি নিষ্পত্তির চাপে রয়েছে। ফলে বাজারে ডলারের সহজ প্রবাহ তৈরি হয়নি, বিনিয়োগ ও আমদানিনির্ভর শিল্প খাত এখনও ঝুঁকিতে।
৩. দেশীয় ঋণ : সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা উদ্বেগজনক
মোট দেশীয় ঋণ (অভ্যন্তরীণ ঋণ) এক বছরে বেড়েছে ৯.৬২ শতাংশ। কিন্তু এর কাঠামো বিশ্লেষণ করলে উদ্বেগ স্পষ্ট হয়। ব্যাংকগুলোর সরকারের প্রতি নিট দাবি বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরকারের প্রতি নিট দাবি কমেছে।
এর অর্থ, সরকার এখন সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বদলে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে এটি মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমালেও দীর্ঘমেয়াদে জনাকীর্ণতার প্রভাব তৈরি করছে- যেখানে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হচ্ছে।
৪. বেসরকারি খাতের ঋণ : বিনিয়োগ স্থবিরতার স্পষ্ট সঙ্কেত
ডিপোজিট মানি ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতে ঋণ এক বছরে মাত্র ৬.৩ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশের মতো শ্রমঘন অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত কম। এর অর্থ- নতুন শিল্প স্থাপনে আগ্রহ কম; বিদ্যমান উদ্যোক্তারা সম্প্রসারণে সতর্ক; রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত আটকে রেখেছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রবৃদ্ধি- দুটোই চাপের মুখে পড়বে।
৫. নেট আদার অ্যাসেটস : নীতিগত চাপের প্রতিফলন
নেট আদার অ্যাসেটস (এনওএ) আরো ঋণাত্মক হওয়া (৩১.৬৩%) দেখায় যে ব্যাংকিং খাতে হিসাবগত চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা ইঙ্গিত দেয়- পুনঃঅর্থায়ন স্কিম; বিশেষ তহবিল; ব্যাংক খাতের দায়ভার বহন প্রবণতার। এই অবস্থান দীর্ঘায়িত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
৬. নীতিগত বার্তা : সতর্কতার সাথে রূপান্তর
এই মনিটরি সার্ভে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়- বাংলাদেশ এখন আর কেবল তারল্য সঙ্কটের অর্থনীতি নয়; এটি বিশ্বাস ও কাঠামোগত সংস্কারের অর্থনীতি। মুদ্রানীতির মাধ্যমে তারল্য বাড়ানো সম্ভব, কিন্তু বিনিয়োগ আস্থা ফেরানো সম্ভব নয় যদি- ব্যাংকিং খাতে সুশাসন না আসে, সরকারি ঋণনির্ভরতা না কমে এবং রাজনৈতিক ও নীতিগত পূর্বানুমেয়তা তৈরি না হয়।
অক্টোবর ২০২৫-এর কারেন্ট মনিটরি সার্ভে দেখায়, অর্থনীতি আপাত দৃষ্টিতে স্থিতিশীল হলেও এর ভিত নড়বড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ শক্তিশালী, কিন্তু ব্যাংক খাত দুর্বল। তারল্য আছে, কিন্তু বিনিয়োগ নেই।
নতুন বছরে নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে- এই তারল্যকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বাস্তব প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করা। তা না হলে মুদ্রা বাড়বে, সংখ্যা বাড়বে- কিন্তু অর্থনীতি এগোবে না।



