জিয়াউল গুম-খুনের মহাকাব্যিক নায়ক : চিফ প্রসিকিউটর

সালমান-আনিসুলের ভয়েস রেকর্ড পরীক্ষার আবেদন খারিজ

শীতলক্ষ্যা নদীতে যখন ‘সেভেন মার্ডার’-এর পর লাশ ভেসে ওঠে, তখন জিয়াউল আহসান আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যে ভবিষ্যতে লাশ ভেসে উঠে সব ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তখন তিনি লাশ গুমের কৌশল ও স্থান পরিবর্তন করেন। এরপর থেকে বরগুনার চরদোয়ানি ঘাট ব্যবহার করে ট্রলারে করে বন্দীদের বলেশ্বর নদী হয়ে সুন্দরবনের গভীর মোহনায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে বন্দীদের হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মাথায় যমটুপি পরিয়ে এবং বুকের সামনে বালিশ রেখে গুলি করে হত্যা করা হতো। লাশ যাতে কখনোই ভেসে না ওঠে, সে জন্য কমান্ডো নাইফ দিয়ে বন্দীদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি ফেলে দেয়া হতো এবং সিমেন্টের ব্লক বা ইটের বস্তা বেঁধে সাগরের অতল গভীরে ডুবিয়ে দেওয়া হতো।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিতাড়িত আওয়ামী লীগ সরকারের মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের ভূমিকা ছিল ‘মহাকাব্যিক’ ও ‘নিষ্ঠুরতম’। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম গতকাল রোববার আদালতকে জানিয়েছেন, জিয়াউল আহসান কেবল একজন কর্মকর্তাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে পরিচালিত গুম-খুন ও পৈশাচিক দমন-পীড়নের প্রধান নকশাকার বা ‘মাস্টারমাইন্ড’।

রোববার বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জিয়াউলের অপরাধ কল্পনার চেয়েও বেশি। তার সব অপরাধের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি, তবে যা পাওয়া গেছে শাস্তির জন্য এটাই যথেষ্ট।’

রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় গুম যখন ‘সংস্কৃতি’ শুনানিতে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে এবং বাহিনীগুলোর মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত পদ্ধতিতে বাংলাদেশে গুমকে একটি কালচারে পরিণত করা হয়েছে। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি ‘ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি’ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ। ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক কর্মী এবং যারা সরকারের জন্য হুমকি ছিল, তাদের টার্গেট করে এই গুম-খুনের নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই বিচার না হলে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হবে এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি হবে।’ পৈশাচিক হত্যা ও লাশ গুমের বর্ণনা দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আদালতের সামনে জিয়াউল আহসানের পরিচালিত কিলিং মিশনের রোমহর্ষক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে তিনটি কাউন্টে শতাধিক মানুষকে গুম ও হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এই বিচার শুরু হয়েছে। বন্দীদের গুম করার পর তাদের গোপন বন্দিশালায় রাখা হতো। এরপর অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাদের হত্যা করে লাশ গুম করা হতো।

তাজুল ইসলাম জানান, শীতলক্ষ্যা নদীতে যখন ‘সেভেন মার্ডার’-এর পর লাশ ভেসে ওঠে, তখন জিয়াউল আহসান আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যে ভবিষ্যতে লাশ ভেসে উঠে সব ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তখন তিনি লাশ গুমের কৌশল ও স্থান পরিবর্তন করেন। এরপর থেকে বরগুনার চরদোয়ানি ঘাট ব্যবহার করে ট্রলারে করে বন্দীদের বলেশ্বর নদী হয়ে সুন্দরবনের গভীর মোহনায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে বন্দীদের হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মাথায় যমটুপি পরিয়ে এবং বুকের সামনে বালিশ রেখে গুলি করে হত্যা করা হতো। লাশ যাতে কখনোই ভেসে না ওঠে, সে জন্য কমান্ডো নাইফ দিয়ে বন্দীদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি ফেলে দেয়া হতো এবং সিমেন্টের ব্লক বা ইটের বস্তা বেঁধে সাগরের অতল গভীরে ডুবিয়ে দেওয়া হতো।

এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো চিহ্ন রাখতে চাইতেন না জিয়াউল আহসান। এ প্রসঙ্গে আলকাজ মাজি নামে এক ট্রলার মাঝির উদাহরণ দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ওই মাঝির ট্রলারে করেই লাশগুলো সাগরে নেয়া হতো। এই পৈশাচিক দৃশ্য দেখে আলকাজ মাঝি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। তার পরিবার র‌্যাব-৮ এর কাছে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে বিষয়টি জিয়াউল আহসানকে জানানো হয়। তখন জিয়াউল নির্দেশ দেন, ‘ওকে ফিনিশ করে দাও’। এরপর ওই মাঝিকে ধরে এনে একইভাবে হত্যা করা হয়। যারা তার অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী ছিল, তাদেরও তিনি নির্মমভাবে নির্মূল করেছেন। মিডিয়া ট্রায়াল ও ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক তাজুল ইসলাম জানান, জিয়াউল আহসান পরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত করতেন। তিনি প্রায়ই সাংবাদিকদের হেলিকপ্টারে করে সুন্দরবনে নিয়ে যেতেন ‘বন্দুকযুদ্ধ’ দেখানোর জন্য। অথচ মাচায় রাখা সেই বন্দীদের অনেক আগেই আটক করা হয়েছিল। সাংবাদিকদের বাইরে রেখে ভেতরে সৈন্যরা গুলি ছুড়ত এবং পরে সাংবাদিকদের ভেতরে নিয়ে মৃতদেহ দেখিয়ে সেটিকে এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে চালিয়ে দেয়া হতো। প্রসিকিউশনের কাছে এমন অনেক সাংবাদিকের সাক্ষ্য রয়েছে যারা এই নাটকের অংশ হতে বাধ্য হয়েছিলেন।

আইনি ব্যাখ্যা ও অন্যান্য তথ্য আসামিপক্ষ থেকে লাশের পরিচয় ও ‘অজ্ঞাত’ হওয়ার যে আইনি ঢাল ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছে, তার জবাবে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘একাত্তরে ৩০ লক্ষ শহীদের সবার পরিচয় জানা না থাকলেও যেমন বিচার হয়েছে, এখানেও অপরাধের প্রকৃতি বিচার্য বিষয়। চাক্ষুষ সাক্ষী, রক্ত পরিষ্কার করা কর্মী এবং ট্রলার মাঝিদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই এই অপরাধ অকাট্যভাবে প্রমাণিত।’

রোববার প্রসিকিউশনের শুনানি শেষে আদালত আগামী ৮ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন। ওইদিন আসামিপক্ষের শুনানি শেষে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ দেবেন আদালত। এর আগে ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল।

সালমান-আনিসুলের ভয়েস রেকর্ড পরীক্ষার আবেদন খারিজ

এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ভয়েস রেকর্ড বিদেশী বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

জুলাই অভ্যুত্থানে কারফিউ দিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যায় উসকানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় অভিযোগ গঠন নিয়ে সালমান-আনিসুলের পক্ষে শুনানির দিন ধার্য ছিল রোববার। তাদের হয়ে আইনি লড়াই করছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।

শুনানির সময় আসামিদের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের ভয়েস রেকর্ড পরীক্ষা করার জন্য বিদেশী বিশেষজ্ঞের সাহায্য চাওয়ার আবেদন করা হয়। কারফিউ দিয়ে গুলি চালানোর পরিকল্পনা নেয়ার দিন ফোনে তাদের কোনো কথা হয়নি।

শুনানি শেষে আবেদনটি খারিজ করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। তাই এমন কোনো কারণে সময় বাড়ানো হবে না। যদিও আসামিপক্ষের আবেদনটি নথিভুক্ত রাখার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। একইসাথে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) দিন নির্ধারণ করা হয়।

গত ২২ ডিসেম্বর সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ওই দিন শুনানিতে তাদের ব্যক্তিগত দায় পড়ে শোনান তিনি। একপর্যায়ে দু’জনের একটি ফোনালাপ বাজিয়ে শোনানো হয়। এরপর সুনির্দিষ্ট পাঁচটি অভিযোগ আলাদা আলাদা পড়া হয়। গত ৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরে প্রসিকিউশনের শুনানি শেষে অভিযোগ আমলে নেন আদালত।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ফোনালাপ করেন আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান। ফোনালাপের একপর্যায়ে কারফিউ চলাকালে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দিতে হবে বলে জানান তারা। তাদের এ বক্তব্যের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। সালমান-আনিসুলের ওই বক্তব্যটি হত্যাকাণ্ডে উসকানি হিসেবে কাজ করেছে বলে অভিযোগ প্রসিকিউশনের।

২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট পালাতে গিয়ে গ্রেফতার হন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। এরপর থেকে হত্যাসহ বেশ কয়েকটি মামলা কাঁধে নিয়ে কারাগারে রয়েছেন তারা।