যুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির নীরব লড়াই

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে, টাকার ওপর চাপ বাড়ছে; অন্যদিকে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা অর্থনীতিকে ভর করে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। সামষ্টিক অর্থনীতির সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়- এগুলো একটি পরিবর্তনশীল অর্থনীতির অন্তর্গত টানাপড়েনের প্রতিচ্ছবি।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে, টাকার ওপর চাপ বাড়ছে; অন্যদিকে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা অর্থনীতিকে ভর করে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। সামষ্টিক অর্থনীতির সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়- এগুলো একটি পরিবর্তনশীল অর্থনীতির অন্তর্গত টানাপড়েনের প্রতিচ্ছবি।

গতকাল রোববার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক সূচক প্রতিবেদনে দেখা যায়- কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রতীক। এক বছর আগে সেই রিজার্ভ নেমে এসেছে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। এখন সেটি ৩০ বিলিয়নের কাছাকাছি। এ উত্থান পতন আমদানি ব্যয়, ঋণ পরিশোধ এবং বৈদেশিক চাপের সম্মিলিত ফল।

তবে পুরো চিত্রটি নেতিবাচক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভের পতন কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে- যা ইঙ্গিত দেয়, অর্থনীতি একটি নতুন ভারসাম্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। তবে ইরান যুদ্ধ এর ওপর আবারো নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়ে গেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান ১২২-১২৩ টাকার আশপাশে স্থির হয়েছে। এই উচ্চ বিনিময় হার শুধু আমদানি ব্যয় বাড়ায় না, এটি বাজারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপও তৈরি করে। ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন, বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষায় থাকেন, আর সাধারণ মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি হয়ে ওঠে নিত্যসঙ্গী।

এই চাপে সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা রেমিট্যান্স। ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্সপ্রবাহ শুধু রিজার্ভকে সমর্থনই দিচ্ছে না, এটি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করছে। প্রবাসীদের এই অর্থপ্রবাহ যেন অর্থনীতির ‘সেফটি ভালভ’-যা চাপের সময় বিস্ফোরণ ঠেকিয়ে রাখে।

রফতানি বাড়লেও আমদানির পরিমাণ বেশি থাকায় বাণিজ্য ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এর মানে হলো- বাংলাদেশ এখনো উৎপাদন ও জ্বালানিতে বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে বৈদেশিক খাতের চাপ দীর্ঘমেয়াদে থেকেই যাবে।

শেয়ারবাজারের সূচক নি¤œমুখী হওয়া কেবল বাজারের ওঠানামা নয়, এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন। একই সাথে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে পতন দেখায়- বেসরকারি খাত বড় বিনিয়োগে এখনো সতর্ক।

খেলাপি ঋণের উচ্চহার অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। যখন ব্যাংকগুলো ঝুঁকিতে থাকে, তখন নতুন ঋণ দেয়ার প্রবণতা কমে যায়- ফলে বিনিয়োগও থমকে যায়। ডোমেস্টিক ক্রেডিট প্রবাহে দেখা যায়, সরকারের ঋণ গ্রহণ দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত- সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা কমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কম এবং সঞ্চয়পত্রে নেতিবাচক প্রবণতা দেখায়- অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তিও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এটি সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও আর্থিক পরিকল্পনায় চাপ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন একটি ‘ট্রানজিশনাল ইকোনমি’- যেখানে পুরনো প্রবৃদ্ধির মডেল ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, আর নতুন কাঠামো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এই অবস্থায় অর্থনীতি সঙ্কটের মধ্যেও না আবার স্বস্তির মধ্যেও নেই। এটি অনেকটা চাপ ব্যবস্থাপনার একটি অবস্থায় রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে- রফতানি বৈচিত্র্য জরুরি; ব্যাংকিং খাতে গভীর সংস্কার প্রয়োজন; বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয় বাড়াতে হবে

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক নীরব লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে স্থিতিশীল মনে হলেও ভেতরে চলছে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন প্রচেষ্টা। এই লড়াইয়ের ফল নির্ভর করবে কত দ্রুত এবং কত কার্যকরভাবে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। যদি সঠিক পদক্ষেপ নেয়া যায়, তবে এই চাপই হতে পারে ভবিষ্যতের আরো শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি।

যুদ্ধের কী প্রভাব দেখা যেতে পারে

ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাত যদি সামনে আরো বিস্তৃত আকার নেয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না- বাংলাদেশসহ পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তা গভীরভাবে অনুভূত হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক সূচকের আলোকে সম্ভাব্য প্রভাবগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে।

এই সঙ্ঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল পরিবাহিত হয়। যদি এই রুট আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে আর তাতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং লোডশেডিং বা ভর্তুকি চাপও সে সাথে বাড়বে। মূল্যস্ফীতি এতে আবার বেড়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই রিজার্ভ সঙ্কোচনের মধ্যে আছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে- তেল আমদানির বিল বেড়ে যাবে; ডলারের চাহিদা বাড়বে; রিজার্ভ দ্রুত কমতে পারে। ফলে টাকার মান আরো দুর্বল হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী কর্মরত- বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারে। যুদ্ধের কারণে সম্ভাব্য দু’টি চিত্র দেখা যেতে পারে। স্বল্পমেয়াদে : রেমিট্যান্স বাড়তে পারে (পরিবারকে বেশি অর্থ পাঠানো)। আর দীর্ঘমেয়াদে : শ্রমবাজার সঙ্কুুচিত হলে রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে।

যুদ্ধ দীর্ঘ হলে: শিপিং খরচ বাড়বে; বীমা খরচ বাড়বে; সরবরাহ চেইন ব্যাহত হবে। আর বাংলাদেশের রফতানির (বিশেষত তৈরি পোশাক) ওপর প্রভাব হিসেবে দেখা যাবে: ডেলিভারি বিলম্ব এবং অর্ডার কমে যাওয়ার ঝুঁকি (বিশ্বব্যাপী মন্দা হলে)।

জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বাড়লে- খাদ্য, পরিবহন, উৎপাদন খরচ বাড়বে; মূল্যস্ফীতি আবার দুই অঙ্কে পৌঁছাতে পারে। এটি সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব ফেলবে।

যুদ্ধ মানেই অনিশ্চয়তা। ফলে বিদেশী বিনিয়োগ কমে যেতে পারে; দেশীয় বিনিয়োগকারীরা ‘অপেক্ষা’ অবস্থায় যাবে এবং শেয়ারবাজার আরো অস্থির হতে পারে।

সঙ্ঘাত দীর্ঘ হলে বিশ্বশক্তিগুলোর নতুন জোট তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য সুযোগ : বিকল্প বাণিজ্য রুটে অংশগ্রহণ; নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করে সুবিধা নেয়া

এই সম্ভাব্য যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য সরাসরি সামরিক হুমকি নয়, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো : জ্বালানি আমদানি কৌশল পুনর্বিন্যাস; রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা; বিকল্প বাজার ও সরবরাহ চেইন তৈরি। কারণ, যুদ্ধ যত দূরেই হোক- তার অর্থনৈতিক ঢেউ এসে বাংলাদেশের ভেতরেই আঘাত করবে।