অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
বিদায়ী সপ্তাহের পাঁচটি কর্মদিবসের চারটির বড় দরপতনের ফলে বাজার মূলধনের ১৭ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা হারিয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। গত রোববার ৭লাখ ৬ হাজার ৯১২ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা পুঁজিবাজারটির মূলধন গত বৃহস্পতিবার সপ্তাহ শেষে ৬ লাখ ৮৯ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকায় নেমে আসে। মোট পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চারটিতে সূচকের বড় ধরনের পতনের কারণেই এত অবনতি ঘটে ডিএসইর বাজার মূলধনের যা ছিল মোট বাজারমূলধনের ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
গত সপ্তাহের শুরুতে টানা তিন দিন নেতিবাচক প্রবণতায় ছিল পুঁজিবাজার। চতুর্থ দিনে এসে হারানো সূচকের একটি অংশ ফিরে পেলেও সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে ফের বড় পতনের শিকার হয়। মূলত মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকেই পুঁজিবাজারে এ দরপতনের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। কারণ পুরো মধ্যপ্রাচ্য আমাদের রেমিট্যান্সের একটি বড় উৎস এবং আমাদের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের বেশির ভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আর যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্সের ওপর যেমন প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে তেমনি ইতোমধ্যেই জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে গেছে প্রায় শতভাগ, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এর প্রভাবে বেড়ে যেোব পণ্যের উৎপাদন খরচ যা রফতানির ক্ষেত্রে শিল্প মালিকদের যেমন বিপদে ফেলতে পারে তেমনি অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণ হতে পারে। আর উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুঁজিবাজার।
গত সপ্তাহে ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৪৮ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট তথা ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ অবনতির শিকার হয়। রোববার ৫ হাজার ৩৬৮ দশমিক ৪০ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহ শেষে ৫ হাজার ২১৯ দশমিক ৭৪ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৮৫ দশমিক ৮৯ ও ১৯ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট। সপ্তাহের প্রথম
তিনটি কর্মদিবসে প্রধান সূচকটির যথাক্রমে ৪৪ দশমিক ১৭, ৪১ দশমিক ৩০ ও ৫২ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট পয়েন্ট হারায় বাজারটি। চতুর্থ দিন হারানো সূচকের ৯৪ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট ফিরে পেলেও শেষ দিন ফের ৫৩ দশমিক ০৫ পয়েন্ট হারায় ডিএসই।
সূচকের এ অবনতির মধ্যেও গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনে বড় ধরনের উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। এ সময় পুঁজিবাজারটির মোট লেনদেন দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৪১ কোটি ৭২ লাখ টাকা যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ২৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেশি। একইভাবে বৃদ্ধি পায় ডিএসইর গড় লেনদেনও।
আগের সপ্তাহের ৫৩১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা থেকে ২৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে গত সপ্তাহে ডিএসইর গড় লেনদেন দাঁড়ায় ৬৬৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
এ দিকে গত সপ্তাহে সার্বিক বাজার পরিস্থিতির অবনতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যেমন হতাশার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে তেমনি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নতুন করে ব্যাংক বহির্ভূত পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের ঘোষণা তাদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। এর আগে ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংককে মূলধন শূন্য ঘোষণা করে একীভূত করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের পুঁজির একটি বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। এবার তালিকাভুক্ত ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবলুপ্তি বা অবসায়ন তাদের পুঁজির বেশির ভাগই শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের একটি বড় অংশই তৃতীয় বৃহত্তম এই খাতে। ফলে এতগুলো কোম্পানি অবসায়নের ফলে তাদের পুঁজির একটি বড় অংশই শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিদায়ী সপ্তাহে ভয়াবহ দরপতনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের এ কোম্পানিগুলো।
সপ্তাহিক বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ
সময় ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স ও পিপলস লিজিং- এই তিনটি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে শীর্ষ পতনের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। সপ্তাহজুড়ে প্রতিটি কোম্পানির শেয়ার দর ৩০.৫৬ শতাংশ কমে মাত্র ২ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম ১ টাকা ১০ পয়সা করে হাস পেয়েছে। তালিকায় এর পরেই থাকা প্রিমিয়ার লিজিং ২৭.০৩ শতাংশ দর হারিয়েছে। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিং (১৮.১৮%), ফিনিক্স ফাইন্যান্স (১৮%), ফার্স্ট ফাইন্যান্স (১৫.৫২%)। যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত ঘোষণা চলে এসেছে। তাই এ কোম্পানিগুলোতে করা বিনিয়োগ শূন্যই হয়ে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতেও এসব প্রতিষ্ঠান টানা দরপতনের শিকার হবে এমনটিই আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের। কারণ এর আগে একীভূত করা ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়ে এখনো ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা শোনা যায়নি।
বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) হলেও সংস্থাটি বাংলাদেশ ব্যাংককে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে। এর আগে পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভূমিকা ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি একমি পেস্টিসাইডস। এ সময় গড়ে প্রতিদিন কোম্পানিটির ২০ কোটি ৭৫ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে কোম্পানিটির যা ছিল ডিএসইর মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। গড়ে ২০ কোটি ৭৪ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে সপ্তাহিক লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানটি দখলে রাখে একই খাতের ওরিয়ন ইনফিউশন। সাপ্তাহিক লেনদেনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ব্র্যাক ব্যাংক, টেকনোড্রাগস, সিটি ব্যাংক, ফাইন ফুডস, বিডি থাই ফুডস ও হাক্কানি পেপার অ্যান্ড পাল্প।



