বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেছেন বর্তমান সঙ্কট মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে। এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়, আদালতের বিষয় নয়। এখানে আদালতকে যুক্ত করা ঠিক হয়নি। হাইকোর্টে দায়ের করা রিট পিটিশনও আমার মতে ভুলভাবে উপস্থাপিত।
তিনি উল্লেখ করেন- নাগরিক সমাজের দায়িত্ব এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জোরালো করতে হবে; সরকার ও সংসদকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং গণভোটে জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট রক্ষা করতে হবে। যদি এই ঐকমত্য নষ্ট হয়ে যায়, তবে জাতি আবার পথ হারাবে।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন এ কথা বলেন। তার এই সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, জুলাই সনদ ও জুলাই আদেশ কেবল রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক বাস্তবতা। এর বাস্তবায়ন ব্যাহত হলে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পুরো প্রক্রিয়াই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
প্রশ্ন : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ও আইনি ভিত্তি কী?
ব্যারিস্টার বেলায়েত : জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছরের শাসন, নিপীড়ন ও সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ যখন দুর্বল ও বিপর্যস্ত, তখন ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে এক শক্তিশালী শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটে। এই পরিবর্তনের মূল ভিত্তি হলো জনগণের ইচ্ছা। বিশ্বব্যাপী দেখা যায়, বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারের বৈধতা মূলত জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা থেকেই আসে, এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্বীকৃত একটি পদ্ধতি।
প্রশ্ন : এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কি সংবিধানের বাইরের কোনো উপাদান কাজ করেছে?
ব্যারিস্টার বেলায়েত : হ্যাঁ, এটি একটি সংবিধানের বাইরের (বীঃৎধ-পড়হংঃরঃঁঃরড়হধষ) প্রক্রিয়ার ফল। জুলাই সনদ ও পরবর্তী ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এই রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারের বৈধতার জন্য আলাদা কোনো আইনি দলিল অপরিহার্য নয়; জনগণের ইচ্ছাই যথেষ্ট। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আওতায় যে মতামত নেয়া হয়েছে, তা মূল ভিত্তি নয়, বরং একটি অতিরিক্ত স্বীকৃতি।
প্রশ্ন : সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ভূমিকা কী?
ব্যারিস্টার বেলায়েত : ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কোনো গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চাইতে পারেন। তবে, আপিল বিভাগ মতামত দিতেও পারেন, নাও দিতে পারেন। এই মতামত বাধ্যতামূলক নয়। যদি প্রশ্নটি রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়, আদালত তা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। সুতরাং, এটি একটি সহায়ক প্রক্রিয়া, মূল ভিত্তি নয়।
প্রশ্ন : বর্তমানে যে সাংবিধানিক সঙ্কট দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ কী?
ব্যারিস্টার বেলায়েত : বর্তমান সঙ্কট মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে। এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়, আদালতের বিষয় নয়। এখানে আদালতকে যুক্ত করা ঠিক হয়নি। হাইকোর্টে দায়ের করা রিট পিটিশনও আমার মতে ভুলভাবে উপস্থাপিত (সরংপড়হপবরাবফ)।
প্রশ্ন : সংস্কার কমিশন ও ঐকমত্য কমিশনের বৈধতা কিভাবে প্রতিষ্ঠিত?
ব্যারিস্টার বেলায়েত : সংস্কার কমিশনগুলো গঠিত হয়েছে জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতে গঠিত সরকারের মাধ্যমে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
এই কমিশন ৩২টি রাজনৈতিক দলের সাথে ৪৪টি বৈঠক করেছে। এর বাইরে ৩০টি দলের সাথে আরো ২৩টি বৈঠক করেছে। এই দীর্ঘ সংলাপের মাধ্যমে জুলাই সনদের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করে কমিশন। ফলে এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ঐকমত্যের দলিল।
প্রশ্ন : জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি কিভাবে তৈরি হলো?
ব্যারিস্টার বেলায়েত : জুলাই সনদের রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তি আগে থেকেই ছিল। তবে অধিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য এটিকে আইনি কাঠামোয় আনা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এটি জারি করা হয় এবং সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘আদেশ’ও আইনের মর্যাদা পায়। এরপর গণভোটে অনুমোদনের মাধ্যমে এটি আরো শক্তিশালী হয়, এটি কার্যত সর্বোচ্চ আইনি ভিত্তি অর্জন করে।
প্রশ্ন : জুলাই আদেশ কি বর্তমান সরকার ও সংসদের জন্য বাধ্যতামূলক?
ব্যারিস্টার বেলায়েত : অবশ্যই। কারণ, এটি জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলন; সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি আইন আর আদালতও এর সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষা করছে। সুতরাং, এটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে এর পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত পথ হলো গণপরিষদ (ঈড়হংঃরঃঁবহঃ অংংবসনষু) গঠন।
প্রশ্ন : সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব কতটা যৌক্তিক?
ব্যারিস্টার বেলায়েত : এটি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, দীর্ঘ ১৭ মাস ধরে যে আলোচনা, সংলাপ ও ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করে নতুন করে শুরু করা বোকামি। জুলাই আদেশ নিজেই একটি শক্তিশালী আইনি ও রাজনৈতিক দলিল।
প্রশ্ন : সাম্প্রতিক অধ্যাদেশ বাতিল নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ব্যারিস্টার বেলায়েত : এটি অত্যন্ত হতাশাজনক। বিশেষ করে, বিচার বিভাগ সংস্কার সংক্রান্ত অধ্যাদেশ; মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এবং গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ। এসব বাতিলের ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আবারো অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
প্রশ্ন : নাগরিক সমাজের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
ব্যারিস্টার বেলায়েত : নাগরিক সমাজের দায়িত্ব এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জোরালো করতে হবে; সরকার ও সংসদকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং গণভোটে জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট রক্ষা করতে হবে। যদি এই ঐকমত্য নষ্ট হয়ে যায়, তবে জাতি আবার পথ হারাবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা এবং জুলাই আদেশ অনুযায়ী শপথ না নেয়া, এগুলো আইনের লঙ্ঘন এবং ভবিষ্যতে বড় সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি করতে পারে।



