যুদ্ধের কারণে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, টাকা ছাপানোর ওপর নির্ভর করবে না সরকার

বড় শিল্প গ্রুপের কর ফাঁকি পর্যালোচনা করা হচ্ছে : অর্থমন্ত্রী

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ঢালাওভাবে টাকা ছাপানোর যে প্রবণতা, তা থেকে সরকার বেরিয়ে আসতে চায় বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অর্থনীতিকে চাঙা করতে না পারলে দিন শেষে কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানো খুব কঠিন। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতিতে যাওয়া। আমরা টাকা ছাপাতে চাচ্ছি না; বরং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ইরান যুদ্ধকে একটা বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এ কারণে আমাদের অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত দামে আমাদের জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছে। কিন্তু এর পরও টাকা ছাপানোর ওপর নির্ভর না করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তিনি জানিয়েছেন, বড় শিল্প গ্রুপগুলোর সম্ভাব্য কর ফাঁকি পুনরায় পর্যালোচনা করছে সরকার।

গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যালয়ে আসন্ন বাজেট ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

আগের সরকার দেশের অর্থনীতিকে খুবই খারাপ অবস্থা রেখে গেছে উল্লেখ করে তিনি নির্বাচিত সরকারের সামনে বর্তমানে তিন ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানান। তিনি বলেন, এই চ্যালেঞ্জের প্রথমটি হচ্ছে, নতুন সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশের রাজস্ব আদায় তথা কর-জিডিপি খুবই কম। তৃতীয়ত, এর সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। কীভাবে সম্পদ আহরণ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারি, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ঢালাওভাবে টাকা ছাপানোর যে প্রবণতা, তা থেকে সরকার বেরিয়ে আসতে চায় বলে জানান অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতিকে চাঙা করতে না পারলে দিন শেষে কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানো খুব কঠিন। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতিতে যাওয়া। আমরা টাকা ছাপাতে চাচ্ছি না; বরং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নীতিমালার ঘন ঘন পরিবর্তন বন্ধ করার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা যেন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন, সে জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত নীতি অপরিবর্তিত রাখা হবে। তার মতে, বিনিয়োগের পথ সুগম করতে বড় ধরনের ‘ডিরেগুলেশন’ বা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এখন মূল লক্ষ্য।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি নিয়ে অনুসন্ধান হয়েছিল। নতুন সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে কি না, তা জানতে চান উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিক। জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, এ ধরনের অনুসন্ধান চালু রাখার বিষয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু একটা বিষয় নিয়ে নয়। এমন অনেক (অনুসন্ধানের) বিষয় আছে। সব কিছু পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল বেক্সিমকো, সামিট ও এস আলমসহ কয়েকটি শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ তদন্ত শুরু করে। সে সময় কিছু বকেয়া কর আদায়ও করা হয়েছিল।

আগামী বাজেট প্রসঙ্গে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো, সমাজের বঞ্চিত ও সাধারণ মানুষকে অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসা। ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো চালু থাকবে। সেই টাকার সংস্থান আগে রেখে বাজেট সাজানো হবে।

অর্থমন্ত্রী জানান, বাজেটের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষকে উন্নয়নের সুবিধার বাইরে রাখা হবে না। তাদের পাওনা নিশ্চিত করেই সামগ্রিক বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে।

নতুন সরকারের সামনে বাজেট প্রস্তুতির চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে আমীর খসরু বলেন, আমরা যে অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, তা খুব ভালো অবস্থায় নেই। সেখান থেকে অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে হবে। একই সাথে নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, এক দিকে অর্থনীতিকে স্যালভেজ করতে হবে, অপর দিকে মেনিফেস্টোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে এটি ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ।’

এই পরিস্থিতিতে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে রিসোর্স মোবিলাইজেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, রিসোর্স মোবিলাইজেশন করতে না পারলে এসব লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হবে না।

চলতি বছর বাংলাদেশের সম্ভাব্য এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি বর্তমানে জাতিসঙ্ঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) বিবেচনার জন্য যাবে এবং সেখান থেকে অনুমোদন পেলে তা জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে উপস্থাপন করা হবে।’

রফতানি খাতে কেবল গার্মেন্টসের ওপর নির্ভর না থেকে অন্যান্য সেক্টরকেও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মতো সুবিধা দেয়ার কথা ভাবছে সরকার এমন তথ্য দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় জাপান ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছে। এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পেছানোর প্রক্রিয়াটিও চলমান রয়েছে।

বৈঠকে এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানসহ আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।